গত দুই বছরে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণে অন্তত ৩০ জন মারা গেছেন
রান্নাঘর যেন মৃত্যুকূপ
সবুজ ইউনুস ও সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ | ১৪:২৮ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ | ২২:০৫
সামান্য সতর্কতার অভাবে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। রাজধানীর উত্তরায় শুক্রবার সে রকমই একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল। একটু সাবধানতার অভাবে একটা পরিবারের সবাই গ্যাসের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। রান্নাঘর যেন মৃত্যুকূপ।
পাইপলাইনের বাইরে দেশে হাজার হাজার পরিবারে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসও ব্যবহৃত হয়। অবশ্য সিলিন্ডারে দুর্ঘটনা কম। রান্নার গ্যাস ব্যবহারে সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নতুবা রান্নাঘরই হতে পারে মৃত্যুকূপ।
গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের ভাড়া বাসায় রান্নাঘরে গ্যাসের লাইন ও চুলা বিস্ফোরণের আগুনে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য মারাত্মক দগ্ধ হন। তারা হলেন- ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা শাহীন শাহনেওয়াজ, তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার এবং তিন ছেলে সারলিন বিন নেওয়াজ, জারিফ বিন নেওয়াজ ও ১৪ মাসের জায়ান বিন নেওয়াজ। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন প্রকৌশলী নেওয়াজ ও তার দুই সন্তান সারলিন বিন নেওয়াজ এবং জায়ান বিন নেওয়াজ। হাসপাতালে সংকটাপন্ন নেওয়াজের স্ত্রী সুমাইয়া। কেবল আশঙ্কামুক্ত এই দম্পতির মেজো ছেলে জারিফ। গ্যাসের আগুনের এই মর্মান্তিক ঘটনা গতকাল ছিল সবার মুখে মুখে।
সারাদেশে জ্বালানি গ্যাসের তত্ত্বাবধানকারী সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ সমকালকে বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক। সামান্য ভুলে এত বড় ক্ষতি- এটা মেনে নেওয়া কঠিন। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রায়ই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় গণমাধ্যমে। কিন্তু এটি তেমন কাজে আসছে না। তিনি গ্রাহকদের সচেতন করতে গণমাধ্যমেরও সক্রিয় ভূমিকা আশা করেন।
তিতাসের ঘটনাস্থল পরিদর্শন :তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (তিতাস গ্যাস) উচ্চ পর্যায়ের এক প্রতিনিধি দল গতকাল উত্তরায় ওই বাড়িতে সরেজমিন পরিদর্শন করে। তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরার অগি্নদগ্ধ বাসভবনে রাতে গ্যাসের চুলা বন্ধ করা হয়নি অথবা আংশিক বন্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় গ্যাস বের হয়ে পুরো ঘর ভরে যায়। পরে দেশলাইয়ের আগুন জ্বালানো হলে আগুন ধরে যায়। তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চমহল থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। শিগগিরই এটা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
দুর্ঘটনা এড়াতে করণীয়: গতকাল তিতাস কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। এগুলো হলো- এক. রান্না শেষে গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখা। দুই. গ্যাসের চুলা বা গ্যাস পাইপলাইনের পাশে কোনো দাহ্য পদার্থ ও বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন না করা। তিন. অকারণে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে না রাখা। চার. গ্যাস লিকেজ থাকলে আগুন জ্বালানো থেকে বিরত থাকা। পাঁচ. লাইনে লিকেজের ক্ষেত্রে রাইজারের চাবি বন্ধ করে দেওয়া। ছয়. গ্যাস লাইন লিকেজের বিষয়টি নিশ্চিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোম্পানির জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে (৯৫৬৩৬৬৭-৬৮) খবর দেওয়া। সাত. বাসাবাড়িতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস লাইনে ভালো সরঞ্জাম ব্যবহার করা। আট. গ্যাসের চুলার ওপর জামা-কাপড় শুকানো বন্ধ করা। নয়. অবৈধভাবে বাসাবাড়িতে গ্যাসলাইন না নেওয়া। দশ. চুলার নবটি ঠিকমতো বন্ধ হয়েছে কি-না নিশ্চিত করা। এগারো. নিয়মিত গ্যাসের অভ্যন্তরীণ লিকেজ পরীক্ষা করে দেখা। বারো. আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস ও লিকেজ হলে তিতাস কর্তৃপক্ষকে জানানো। তেরো. প্রত্যেক পরিবারের প্রধানের উচিত গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহার কীভাবে করতে হবে, সে সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।
বাসাবাড়িতে গ্যাস স্পর্শকাতর পণ্য হওয়া সত্ত্বেও কেন সাবধানতা অবলম্বন করা হয় না- জানতে চাইলে হাতিরপুলের গৃহিণী শারমিন জানান, সকাল ৮টায় বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। ঘুম থেকে উঠতে হয় ভোরে। তখন সতর্কতার কথা আর মনে থাকে না। রান্নাঘরে ঢুকেই চুলা জ্বালাতে হয়। তবে তিনি স্বীকার করলেন, অবশ্যই সাবধান হওয়া উচিত। যদি গ্যাসের গন্ধ থাকে তাহলে চুলা জ্বালানো ঠিক নয়। রান্নাঘরের জানালা খোলা রাখা দরকার। এমনকি কাজের লোকদেরও সচেতন করা উচিত। নতুবা যে কোনো মুহূর্তে রান্নাঘরেই ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোর বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করে থাকে সরকারি সংস্থা তিতাস। এই সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. নওশাদ ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়, উত্তরার এই দুর্ঘটনায় তাদের কোনো দায়দায়িত্ব আছে কি-না। জবাবে তিনি বলেন, তিতাসের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন এবং বিভিন্ন বাসার নিচে স্থাপিত রাইজার পর্যন্ত। কিন্তু কোনো বাসার মধ্যে যদি অগি্নদুর্ঘটনা ঘটে সে দায়িত্ব তিতাসের নয়। কারণ কোনো বাসার মধ্যে প্রবেশের অনুমতি তাদের নেই। গ্যাস গ্রাহকদের সচেতন করতে তারা নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রচার করে থাকেন বলে জানালেন। তার মতে, সাবধানতা ছাড়া এ রকম দুর্ঘটনা মোকাবেলা সম্ভব নয়।
শত সাবধানতার পরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তখন তাৎক্ষণিকভাবে কী করা উচিত- জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন অ্যান্ড সার্জারি ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল সমকালকে বলেন, আগুনে পোড়া রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে ১৫-২০ মিনিট ধরে বিশুদ্ধ পানি ঢালতে হবে। তারপর দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে আনতে হবে।
তিতাসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিজ খান বলেন, বদ্ধ একটি ঘরে জমে থাকা গ্যাস বোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর। গ্যাস জমে ধীরে ধীরে চাপ তৈরি করে। এরপর ওই স্থানে কোনো আগুন জ্বালানো বা শর্টসার্কিট হলে সঙ্গে সঙ্গে তা বিস্ফোরিত হতে পারে। বাসাবাড়িতে এ বিষয়ে সবার সচেতনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
কিছু দুর্ঘটনা: হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে বাসাবাড়ি ও অফিসে গ্যাসের লাইনে বিস্ফোরণ হয়ে অন্তত ৩০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। ২০১৪ সালের অক্টোবর বনানীর বাসায় গ্যাসের আগুনের বিস্ফোরণে প্রকৌশলী শাহানা ও কলাবাগানের ডলফিন গলিতে মেট্রোসেম গ্রুপের পরিচালক আসমতউল্লাহ মারা যান। ২০১৩ সালে মুগদার একটি বাসায় আগুনে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালে সি-ব্লকে মোতাহারের বাড়ির অগি্নকাণ্ডে দেড় বছরের শিশু মারুফ মারা যায়।
২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি রামপুরার হাইস্কুল রোডের একটি ফ্ল্যাটে আগুন ধরে। ভোরে রান্নার জন্য চুলা ধরাতে দেশলাই জ্বালালে বিস্ফোরণ ঘটে রান্নাঘরে আগুন ধরে যায়। পরে তা দ্রুত অন্যান্য ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শোবার ঘরে থাকা দুই শিশুসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য অগি্নদগ্ধ হন। অগি্নদগ্ধরা হলেন- গৃহকর্তা পিংকন কুমার বণিক, তার মা গীতা রানী, পিংকন কুমারের স্ত্রী পিংকি বণিক, ছেলে পিকু বণিক ও পিন্নু বণিক। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও গীতা রানী ও পিংকনকে বাঁচানো যায়নি। পিংকন কুমার আমেরিকান দূতাবাসের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কাফরুলে গ্যাসলাইন লিকেজ হয়ে আগুন ধরে একই পরিবারের ছয় সদস্য দগ্ধ হন। ওই বাসায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় ভূগর্ভস্থ গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের সাতজন দগ্ধ হন।