নীতিমালা 'মাটিচাপা' নির্বিচারে সড়ক খনন
×
রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় এখন চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। তেজগাঁও শিল্প এলাকার ছবি- মাহবুব হোসেন নবীন
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২১ | ১৩:৪৩
২০০৩ সালে প্রণীত সড়ক খনন ও পুনর্নির্মাণ নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রতিবছরের ১ মে থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কোনো সড়ক মেরামত, কাটাকাটি বা খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। নীতিমালাটি সংশোধন করে ২০১৯ সালে প্রণীত হয় 'ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯'। সেখানেও সুস্পষ্টভাবে একই কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজধানীর সেবা সংস্থার কোনোটিই সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও কাটাকুটির ক্ষেত্রে এই নীতিমালা মানছে না।
নীতিমালাটি সেবা সংস্থা ও ঠিকাদাররা ঠিকমতো অনুসরণ করছে কিনা, তার তদারকি করতে দুই সিটি করপোরেশন গঠন করেছিল ওয়ান স্টপ সেল। কিন্তু সেই সেলও দায়িত্ব পালন করছে না। প্রতিটি সেবা সংস্থা এই নীতিমালাকে থোড়াই কেয়ার করে ইচ্ছামতো যখন-তখন যেখানে-সেখানে বছরজুড়ে রাস্তা কাটাকুটি করে চলছে। ফলে নগরজীবনে নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে ভোগান্তি।
নীতিমালা থাকলেও কেউ কেন তা অনুসরণ করছে না? এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, নীতিমালা তদারকির জন্য লোক থাকতে হয়। যে কোনো প্রকল্পে একজন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকে, তার দায়িত্ব সেটা দেখা। ওয়ান স্টপ সেলের দায়িত্বও এটা দেখা। তারা দেখলে নগরবাসীর এত ভোগান্তি হতো না। পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও এসব বিষয়ে খুব একটা তদারকি করেন না। এসব কারণে ঠিকাদারদের নীতিমালা মানার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখা দেয়। এই দায় জনপ্রতিনিধিদেরই নিতে হবে। যারা এই নিয়মকানুন অনুসরণ করছেন না, তাদের দু-একজনকে শাস্তি দেওয়া গেলে উদাহরণ সৃষ্টি হতো। উদাহরণ সৃষ্টি না হওয়ায় নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ছে এবং নগরবাসীরও ভোগান্তি বাড়ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. তারিক বিন ইউসুফ বলেন, আমরা নীতিমালা করি, কিন্তু মানি না। আবার মানার মতো নীতিমালাও করি না। তারপরও কোনো সাইটে কাজ করতে গেলে কাজ শুরু ও শেষ করার তারিখসংবলিত সাইনবোর্ড নিশ্চিত করেছি। কোথাও রাস্তা কাটলে সবাই সচরাচর সিটি করপোরেশনকেই অভিযুক্ত করে থাকেন। বর্তমানে সিটি করপোরেশন যেসব রাস্তা করে ফেলেছে, সেখানে আবার কিছু সংস্থা রাস্তা কাটার অনুমতি চাইছে। ঢাকা ওয়াসা, ডেসকো ও ডিপিডিসির সঙ্গে এ নিয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। উত্তরার একটি ঘটনায় তো সিটি করপোরেশন ওয়াসার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুন্সি আবুল হাশেম বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংক্ষেপে বলা মুশকিল। রাজধানীতে অনেক সেবা সংস্থা কাজ করে। কিন্তু কেন যে এটা হচ্ছে, এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা না করলে হবে না।
নীতিমালায় কী আছে :রাজধানীতে দিনের বেলায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। বর্ষা মৌসুমে (মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) কোনো সড়ক মেরামত করা যাবে না। জরুরি প্রয়োজনে খনন করতে হলে খননকারী কর্তৃপক্ষকে মূল ক্ষতিপূরণসহ অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ফি গুনতে হবে। আর কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে খননকাজ শুরু করলে মূল খরচের পাঁচ গুণ জরিমানা গুনতে হবে। এমনকি যে এলাকায় সড়ক খনন করা হবে, সেখানে কমপক্ষে সাত দিন আগেই মাইকিং করাসহ নানাবিধ প্রচার চালাতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, রাস্তার যে এলাকায় সড়ক খনন করা হবে, সেই এলাকায় নাগরিকের সুবিধার্থে কমপক্ষে সাত দিন আগেই সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি মাইকিং করাসহ স্থানীয়দের সহায়তা চেয়ে প্রচারপত্র বিলি করতে হবে। এ ছাড়া কেবল অপারেটরের মাধ্যমে প্রচার এবং কাজ শুরুর কমপক্ষে তিন দিন আগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের এ নিয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ বা পরামর্শ দিতে সিটি করপোরেশন বা খননকারী সংস্থার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর সাইনবোর্ড আকারে কাজ শুরুর স্থানে টানিয়ে দিতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে অভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে খননকাজ করতে হবে। অনুমতি প্রদান, খনন ও রাস্তা পুনর্বাসনের কাজ সর্বোচ্চ তদারকি করতে ওয়ান স্টপ সমন্বয় সেল গঠন করতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়, খননকারী সংস্থাকে খনন শুরুর তারিখ ও শেষের তারিখ সাইনবোর্ড দিয়ে সাইটে জানাতে হবে। খননকাজে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেলকে সহায়তার জন্য একাধিক মনিটরিং সেল কাজ করবে। রাস্তা খোঁড়ার নামে মাসের পর মাস কাজ ফেলে রাখা যাবে না। রাতের বেলায় খননের পর ওই রাতের মধ্যেই আধুনিক খনন-সংশ্নিষ্ট যন্ত্রপাতি দিয়ে পুনর্বাসন কাজ শেষ করে রাতের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। খননের আগে রাস্তাটি যে অবস্থায় ছিল, খননের পর সম্পূর্ণ আগের মতোই উপযুক্ত, ঝকঝকে-তকতকে করে তৈরি করে দিতে হবে; যাতে কোনোক্রমেই বোঝার উপায় না থাকে যে রাস্তাটি খনন করা হয়েছিল।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাস্তা খোঁড়ার কাজ শেষ না হলে আইন অনুযায়ী জরিমানা দিতে হবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এ ছাড়া যে কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে চাইলেই যে কোনো রাস্তা খননের অনুমতি দেওয়া যাবে না। রাস্তার নকশা, স্পেসিফিকেশন, প্রয়োজনে এসব রাস্তার দলিলসহ যাবতীয় তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খননের অনুমতি দেবে সিটি করপোরেশন। এ জন্য করপোরেশনকে তার সীমানার সব সেবাদানকারী সংস্থাকে হস্তান্তর করে সড়কের নকশা সংরক্ষণ করতে হবে। আবেদনের ২০ কর্মদিবসের মধ্যেই রাস্তা খননের অনুমতি দেওয়া হবে। খনন-সংক্রান্ত সব তথ্য রাস্তার ওপর সাইনবোর্ড দিয়ে প্রকাশ করতে হবে।
যুক্তিসংগত কোনো কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হলে কমপক্ষে পাঁচ দিন আগে সিটি করপোরেশনকে অবহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম সাত দিনের জন্য কোনো জরিমানা করা হবে না। তবে এর বেশি দেরি হলে এক ভাগ হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। নীতিমালার শর্ত পূরণ না করলে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কোনো সংস্থার অতি জরুরি মেইনটেন্যান্সের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী খননকাজ করা যাবে।
কোনো প্রতিষ্ঠান রাস্তা খননের পর ওই রাস্তার গর্তের মধ্যে বালু দিতে হবে। খনন করা স্থানটি ভালোভাবে ভরাট করতে হবে। ব্রিকসলিং ও হেরিংবন্ড যথাযথভাবে যান চলাচলের উপযোগী করতে হবে। এ ছাড়া খননকাজ শেষে আশপাশের সারফেজ ড্রেন ধুয়েমুছে পরিস্কার করে দিতে হবে। এমনভাবে পরিস্কার করতে হবে, যাতে কাজটি শুরু করার আগের অবস্থায় দেখা যায়। খননের সময় সংস্থা বা সাইটে অনুমতিপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। চাহিবামাত্রই এটি ট্রাফিক বিভাগকে দেখাতে হবে। অতিরিক্ত কোনো খননকাজ হচ্ছে কিনা, তা ট্রাফিক বিভাগ নজরদারি করবে।
বাস্তব চিত্র :নগরবাসীর অভিযোগ, বছরজুড়ে যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাজধানীবাসীকে ভয়াবহ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তায় যানজটের অন্যতম কারণও এই খোঁড়াখুঁড়ি। রাতের পরিবর্তে সারাদিনই কাজ করা হয়। অনেক স্থানে কাজ শুরু-শেষের সাইনবোর্ড রাখা হয় না। কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাও অনেক সময় কেউ জানতে পারে না। রাস্তা কেটে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। রাস্তা খোঁড়ার পর মেরামত করে আগের মতো সুন্দর করে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। রাস্তা কাটার আগে কোথাও কোনো মাইকিং, কেবল টিভির মাধ্যমে প্রচারণা, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন- এসবের কিছুই মানা হয় না। বর্ষাকালে রাস্তা কাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে রাস্তা কাটা হয়। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় গত বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা কাটাকুটি করা হয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গত বর্ষা মৌসুমে তেজগাঁওয়ের এমন কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, এবার কাটা হয়নি। ফার্মগেটের হলি ক্রস স্কুল থেকে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কটি দুই মাস ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এর মধ্যে এক মাস ধরে রাস্তাটি বন্ধই ছিল। রোকেয়া সরণি ও কামাল সরণির (৬০ ফুট) সংযোগকারী পীরেরবাগ রোডটিতে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে। সেই রাস্তাটিও এত দিনে সম্পূর্ণ মেরামত করা হয়নি। বৃষ্টি হলেই এ পথ দিয়ে যাতায়াত করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
নীতিমালাটি সেবা সংস্থা ও ঠিকাদাররা ঠিকমতো অনুসরণ করছে কিনা, তার তদারকি করতে দুই সিটি করপোরেশন গঠন করেছিল ওয়ান স্টপ সেল। কিন্তু সেই সেলও দায়িত্ব পালন করছে না। প্রতিটি সেবা সংস্থা এই নীতিমালাকে থোড়াই কেয়ার করে ইচ্ছামতো যখন-তখন যেখানে-সেখানে বছরজুড়ে রাস্তা কাটাকুটি করে চলছে। ফলে নগরজীবনে নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে ভোগান্তি।
নীতিমালা থাকলেও কেউ কেন তা অনুসরণ করছে না? এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, নীতিমালা তদারকির জন্য লোক থাকতে হয়। যে কোনো প্রকল্পে একজন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকে, তার দায়িত্ব সেটা দেখা। ওয়ান স্টপ সেলের দায়িত্বও এটা দেখা। তারা দেখলে নগরবাসীর এত ভোগান্তি হতো না। পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও এসব বিষয়ে খুব একটা তদারকি করেন না। এসব কারণে ঠিকাদারদের নীতিমালা মানার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখা দেয়। এই দায় জনপ্রতিনিধিদেরই নিতে হবে। যারা এই নিয়মকানুন অনুসরণ করছেন না, তাদের দু-একজনকে শাস্তি দেওয়া গেলে উদাহরণ সৃষ্টি হতো। উদাহরণ সৃষ্টি না হওয়ায় নিয়ম না মানার প্রবণতা বাড়ছে এবং নগরবাসীরও ভোগান্তি বাড়ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. তারিক বিন ইউসুফ বলেন, আমরা নীতিমালা করি, কিন্তু মানি না। আবার মানার মতো নীতিমালাও করি না। তারপরও কোনো সাইটে কাজ করতে গেলে কাজ শুরু ও শেষ করার তারিখসংবলিত সাইনবোর্ড নিশ্চিত করেছি। কোথাও রাস্তা কাটলে সবাই সচরাচর সিটি করপোরেশনকেই অভিযুক্ত করে থাকেন। বর্তমানে সিটি করপোরেশন যেসব রাস্তা করে ফেলেছে, সেখানে আবার কিছু সংস্থা রাস্তা কাটার অনুমতি চাইছে। ঢাকা ওয়াসা, ডেসকো ও ডিপিডিসির সঙ্গে এ নিয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। উত্তরার একটি ঘটনায় তো সিটি করপোরেশন ওয়াসার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুন্সি আবুল হাশেম বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংক্ষেপে বলা মুশকিল। রাজধানীতে অনেক সেবা সংস্থা কাজ করে। কিন্তু কেন যে এটা হচ্ছে, এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা না করলে হবে না।
নীতিমালায় কী আছে :রাজধানীতে দিনের বেলায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। বর্ষা মৌসুমে (মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) কোনো সড়ক মেরামত করা যাবে না। জরুরি প্রয়োজনে খনন করতে হলে খননকারী কর্তৃপক্ষকে মূল ক্ষতিপূরণসহ অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ফি গুনতে হবে। আর কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে খননকাজ শুরু করলে মূল খরচের পাঁচ গুণ জরিমানা গুনতে হবে। এমনকি যে এলাকায় সড়ক খনন করা হবে, সেখানে কমপক্ষে সাত দিন আগেই মাইকিং করাসহ নানাবিধ প্রচার চালাতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, রাস্তার যে এলাকায় সড়ক খনন করা হবে, সেই এলাকায় নাগরিকের সুবিধার্থে কমপক্ষে সাত দিন আগেই সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি মাইকিং করাসহ স্থানীয়দের সহায়তা চেয়ে প্রচারপত্র বিলি করতে হবে। এ ছাড়া কেবল অপারেটরের মাধ্যমে প্রচার এবং কাজ শুরুর কমপক্ষে তিন দিন আগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের এ নিয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ বা পরামর্শ দিতে সিটি করপোরেশন বা খননকারী সংস্থার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর সাইনবোর্ড আকারে কাজ শুরুর স্থানে টানিয়ে দিতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে অভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে খননকাজ করতে হবে। অনুমতি প্রদান, খনন ও রাস্তা পুনর্বাসনের কাজ সর্বোচ্চ তদারকি করতে ওয়ান স্টপ সমন্বয় সেল গঠন করতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়, খননকারী সংস্থাকে খনন শুরুর তারিখ ও শেষের তারিখ সাইনবোর্ড দিয়ে সাইটে জানাতে হবে। খননকাজে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেলকে সহায়তার জন্য একাধিক মনিটরিং সেল কাজ করবে। রাস্তা খোঁড়ার নামে মাসের পর মাস কাজ ফেলে রাখা যাবে না। রাতের বেলায় খননের পর ওই রাতের মধ্যেই আধুনিক খনন-সংশ্নিষ্ট যন্ত্রপাতি দিয়ে পুনর্বাসন কাজ শেষ করে রাতের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। খননের আগে রাস্তাটি যে অবস্থায় ছিল, খননের পর সম্পূর্ণ আগের মতোই উপযুক্ত, ঝকঝকে-তকতকে করে তৈরি করে দিতে হবে; যাতে কোনোক্রমেই বোঝার উপায় না থাকে যে রাস্তাটি খনন করা হয়েছিল।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাস্তা খোঁড়ার কাজ শেষ না হলে আইন অনুযায়ী জরিমানা দিতে হবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এ ছাড়া যে কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে চাইলেই যে কোনো রাস্তা খননের অনুমতি দেওয়া যাবে না। রাস্তার নকশা, স্পেসিফিকেশন, প্রয়োজনে এসব রাস্তার দলিলসহ যাবতীয় তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খননের অনুমতি দেবে সিটি করপোরেশন। এ জন্য করপোরেশনকে তার সীমানার সব সেবাদানকারী সংস্থাকে হস্তান্তর করে সড়কের নকশা সংরক্ষণ করতে হবে। আবেদনের ২০ কর্মদিবসের মধ্যেই রাস্তা খননের অনুমতি দেওয়া হবে। খনন-সংক্রান্ত সব তথ্য রাস্তার ওপর সাইনবোর্ড দিয়ে প্রকাশ করতে হবে।
যুক্তিসংগত কোনো কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হলে কমপক্ষে পাঁচ দিন আগে সিটি করপোরেশনকে অবহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম সাত দিনের জন্য কোনো জরিমানা করা হবে না। তবে এর বেশি দেরি হলে এক ভাগ হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। নীতিমালার শর্ত পূরণ না করলে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কোনো সংস্থার অতি জরুরি মেইনটেন্যান্সের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী খননকাজ করা যাবে।
কোনো প্রতিষ্ঠান রাস্তা খননের পর ওই রাস্তার গর্তের মধ্যে বালু দিতে হবে। খনন করা স্থানটি ভালোভাবে ভরাট করতে হবে। ব্রিকসলিং ও হেরিংবন্ড যথাযথভাবে যান চলাচলের উপযোগী করতে হবে। এ ছাড়া খননকাজ শেষে আশপাশের সারফেজ ড্রেন ধুয়েমুছে পরিস্কার করে দিতে হবে। এমনভাবে পরিস্কার করতে হবে, যাতে কাজটি শুরু করার আগের অবস্থায় দেখা যায়। খননের সময় সংস্থা বা সাইটে অনুমতিপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। চাহিবামাত্রই এটি ট্রাফিক বিভাগকে দেখাতে হবে। অতিরিক্ত কোনো খননকাজ হচ্ছে কিনা, তা ট্রাফিক বিভাগ নজরদারি করবে।
বাস্তব চিত্র :নগরবাসীর অভিযোগ, বছরজুড়ে যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাজধানীবাসীকে ভয়াবহ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তায় যানজটের অন্যতম কারণও এই খোঁড়াখুঁড়ি। রাতের পরিবর্তে সারাদিনই কাজ করা হয়। অনেক স্থানে কাজ শুরু-শেষের সাইনবোর্ড রাখা হয় না। কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাও অনেক সময় কেউ জানতে পারে না। রাস্তা কেটে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। রাস্তা খোঁড়ার পর মেরামত করে আগের মতো সুন্দর করে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। রাস্তা কাটার আগে কোথাও কোনো মাইকিং, কেবল টিভির মাধ্যমে প্রচারণা, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন- এসবের কিছুই মানা হয় না। বর্ষাকালে রাস্তা কাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে রাস্তা কাটা হয়। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় গত বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা কাটাকুটি করা হয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, গত বর্ষা মৌসুমে তেজগাঁওয়ের এমন কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না, এবার কাটা হয়নি। ফার্মগেটের হলি ক্রস স্কুল থেকে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কটি দুই মাস ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এর মধ্যে এক মাস ধরে রাস্তাটি বন্ধই ছিল। রোকেয়া সরণি ও কামাল সরণির (৬০ ফুট) সংযোগকারী পীরেরবাগ রোডটিতে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে। সেই রাস্তাটিও এত দিনে সম্পূর্ণ মেরামত করা হয়নি। বৃষ্টি হলেই এ পথ দিয়ে যাতায়াত করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
- বিষয় :
- বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি