রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা আশকোনা। এখানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হজক্যাম্প, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাড়াও অর্ধশত আবাসিক হোটেল ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়ায় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাজারো মানুষকে ব্যবহার করতে হয় বিমানবন্দর রেলস্টেশন সংলগ্ন আশকোনা লেভেলক্রসিং।

আন্তঃনগরের সব ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশনে থামায় অসংখ্য যাত্রীও এই ক্রসিং ব্যবহার করেন। কিন্তু স্টেশন ও এ লেভেলক্রসিং ঘিরে বসানো হয়েছে শতাধিক অবৈধ টং দোকান। সেখানে সারাক্ষণ জটলা থাকে। এসব দোকানের ওপর বড় বড় ছাতা বসানোয় ট্রেন এলেও অধিকাংশ সময় বোঝা যায় না। তা ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধক (ব্যারিয়ার) ফেলেন হকাররা। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন পথচারীরা।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ে প্রতিবন্ধক না থাকার সুযোগে একটি মাইক্রোবাস উঠে গেলে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান ১১ কিশোর-তরুণ। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলার চিত্র উঠে আসছে।

আশকোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ লেভেলক্রসিংয়ের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, ঢাকার বুকে এমন লেভেলক্রসিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে। এখানে অনিয়মই নিয়ম। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল টনক নড়বে কর্তৃপক্ষের।

বুধবার সরেজমিন বিমানবন্দর রেলস্টেশনে দেখা যায়, আশকোনা লেভেলক্রসিং ঘিরে শতাধিক ভ্রাম্যমাণ হকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। রয়েছে ছাতার শতাধিক টং দোকান ও চিরচেনা জটলা। আলাপকালে আমজাদ, ময়েন, কালামসহ কয়েকজন হকার জানান, স্টেশনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে মাসোহারা দিয়ে তাঁরা ব্যবসা করছেন। এক দিন টাকা দিতে দেরি হলেই উচ্ছেদ অভিযান চালান স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মীরা।

হকার আবদুল করিম ও ওয়াজেদ মিয়া বলেন, এই রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান থাকলেও তাঁদের খুব একটা দেখা যায় না। ট্রেন এলে প্রতিবন্ধক নামানো থেকে সব দায়িত্ব হকাররাই পালন করেন। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়ের মধ্যেও হকাররাই থাকেন। গেটম্যানরা দায়িত্ব পালন না করে স্টেশন এলাকায় বিভিন্ন 'ধান্দা' করে বেড়ান।

বিমানবন্দর স্টেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, গেটম্যানরা ঠিকমতো ক্রসিংয়ে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন হকাররা। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি নেই।

অবশ্য এই লেভেলক্রসিংয়ের গেটম্যান সোহেল রানা দাবি করেন, তিন শিফটে তাঁদের ১২ গেটম্যান রয়েছেন। সবাই পালাক্রমে আট ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করেন। বেশিরভাগ নাইট ডিউটি তিনি করেন বলেও দাবি সোহেল রানার।

তবে হকারদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মীরা। এ বিষয়ে বিমানবন্দর জিআরপি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই কামরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে জিআরপি পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার নিরাপত্তাকর্মীরা। টাকা নিয়ে দোকান বসতে দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। বরং প্রায়ই আমরা হকারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই। অভিযানের পর কয়েক দিন ঠিক থাকলেও আবারও তাঁরা এসে বসে যান।

টং দোকান ও বড় বড় ছাড়ার কারণে আশকোনা লেভেলক্রসিংয়ে ঝুঁকির কথা স্বীকার করে বিমানবন্দর স্টেশনের মাস্টার মো. হালিমুজ্জামান সমকালকে বলেন, আশকোনা লেভেলক্রসিংয়ে চারটি গেট রয়েছে। এসব গেটে তিন শিফটে ১২ কর্মীর দায়িত্ব পালন করার কথা। তাঁদের পরিবর্তে হকারদের প্রতিবন্ধক নামানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিগগরিই অবৈধ দোকান উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।

তবে লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যানদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পিডব্লিউআই মোজাম্মেল হকের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ হয়নি।