ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাম্পের সারি ছড়িয়ে পড়ছে সড়কে, বাড়ছে যানজট

পাম্পের সারি ছড়িয়ে পড়ছে সড়কে, বাড়ছে যানজট
×

রাজধানীর একটি তেলের পাম্পের চিত্র

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৫৪ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:২৩

রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়া স্টেশনে দুপুরবেলা। প্রধান সড়কে গাড়ির স্বাভাবিক গতি নেই। সামনে-পেছনে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল। কেউ হর্ন দিচ্ছেন, কেউ ফাঁক গলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। একটু সামনে যেতেই দেখা গেল, যানজটের বড় একটি কারণ তেলের পাম্পের সামনে জ্বালানি নিতে অপেক্ষমাণ গাড়ির দীর্ঘ সারি।

একই চিত্র হাজীপাড়ায়ও। প্রাইভেট কারের পাশাপাশি মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল—এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে অপেক্ষমাণ সারিতে; যে সারি রামপুরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছেছে। পাম্পে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা গাড়ির সারি কোথাও কোথাও প্রধান সড়কের কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে জ্বালানি নিতে আসা মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদেরও গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগছে বাড়তি সময়।

এরই মধ্যে গত রোববার থেকে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫৫ টাকা।

পাম্পের লাইন থেকে সড়কে জট
সরেজমিনে দেখা যায়, ফিলিং স্টেশনে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা গাড়ির সারি প্রধান সড়কের কাছাকাছি চলে এলে পাশ দিয়ে চলাচলকারী গাড়িগুলোর গতি কমে যাচ্ছে। একটি গাড়ি পাম্পে ঢোকার সুযোগের অপেক্ষায়, তার পেছনে আরও কয়েকটি গাড়ি। ফলে এক জায়গায় তৈরি হওয়া চাপ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের সড়কে।

বেসরকারি চাকরিজীবী শর্মি জামান বলেন, ‘অফিস ছুটির পর এমনিতেই জ্যাম থাকে। তার ওপর পাম্পের সামনে গাড়ির সারি হলে একই জায়গায় আরও বেশি সময় আটকে থাকতে হয়। বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক সময় পুরো সন্ধ্যাটা রাস্তায় চলে গেল। নিজেদের জীবন থেকে অবসর সময় কমে যাচ্ছে।’ 

গাড়ি আছে, ব্যবহার কমেছে
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের ওপরও স্পষ্ট। শামসুল হক নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তার নিয়মিত ব্যবহারের গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, ‘আগে প্রয়োজন হলে গাড়ি নিয়ে বের হতাম। এখন বের হওয়ার আগে তেলের খরচ হিসাব করি। গাড়ি গ্যারেজেই রাখা একধরনের পার্মানেন্টলি। খুব দরকার না হলে রিকশা বা অন্য যানবাহনে চলে যাই।’ 

তরুণ রাকিব হাসান মোটরসাইকেলে নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করেন। বেশ বিরক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো পরিবর্তন তো হচ্ছে না। আরও তো তলিয়ে যাচ্ছি। জমা হচ্ছে না কোনো সঞ্চয়। আগে বাইক ব্যবহার করতাম সময় বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন অপ্রয়োজনীয় কোথাও যাই না। আগে যেকোনো কাজের জন্য বাইক বের করতাম, এখন অনেক সময় হেঁটে বা বাসে যাওয়ার চেষ্টা করি।’ 

রাইড শেয়ারিংয়েও বাড়তি ভোগান্তি
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমলেও রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তি নেই। উবার-পাঠাওয়ের মতো সেবায় জ্বালানি খরচের চাপ চালকদের ওপর পড়ছে; যাত্রীরাও ব্যস্ত সময়ে বাড়তি ভাড়া ও দীর্ঘ যাত্রার মুখোমুখি হচ্ছেন।

প্রায় দুই বছর নিয়মিত রাইড শেয়ার ব্যবহার করা ফারজানা রহমান জানান, ‘রাইড শেয়ার নিলে সময় বাঁচবে—এই কারণেই নিতাম। কিন্তু এখন ভাড়া বেশি হলে প্রতিদিন নেওয়া কঠিন। আবার বাসে গেলে জ্যামে সময় বেশি লাগে। এখন তো বাসভাড়াও বাড়ল। তাই প্রতিদিন যাতায়াতের হিসাব নতুন করে করতে হচ্ছে।’ 

অ্যাম্বুলেন্সও অপেক্ষায়
পাম্পের সারিতে অ্যাম্বুলেন্স থাকাটাও চোখে পড়ে। রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা চালকদের বাড়তি চাপের মধ্যে ফেলছে। অ্যাম্বুলেন্সচালক কামাল হোসেন বলেন, ‘রোগী থাকলে এক মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ। তাই চেষ্টা করি আগে থেকেই জ্বালানি রাখতে। কিন্তু হঠাৎ প্রয়োজন হলে লাইনে দাঁড়ানো খুব চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।’ 

জ্বালানির দামে বদলে যাচ্ছে অভ্যাস
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন শুধু পাম্পে বেশি টাকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চালকের জন্য বাড়তি ব্যয় ও আয় হারানো, যাত্রীর জন্য বাড়তি ভাড়া ও সময়ের অপচয় এবং ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকের জন্য গাড়ি কম ব্যবহার—সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে নগরজীবনের চলাচলের অভ্যাস।

মালিবাগ ও হাজীপাড়ার ব্যস্ত সড়কে সেই মূল্যবৃদ্ধির হিসাব এখন কাগজে-কলমে নয়—দেখা যাচ্ছে পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারিতে, যানজটে আটকে থাকা গাড়িতে এবং যাত্রীদের বাড়তি যাতায়াত ব্যয়ের চাপে।

হাজীপাড়া পেট্রলপাম্পের পাশে চায়ের দোকানদার তাইজুল বলেন, ‘খাবার জিনিসের দাম বাড়ছে, তেলের দাম বাড়ছে, ঘরে কারেন্ট থাকে না, রান্নার গ্যাস পাই না—এত কিছু সামলায়া আর কত দিন টিকতে পারবো, সেটা ভাবতাছি। হয়তো আবার ঢাকা থেকে গ্রামেই ফিরতে হবে।’ 

আরও পড়ুন

×