ঢাবির মৈত্রী হলে ভোগান্তির আবাসিক জীবন, স্বস্তি ফিরবে কবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। ফাইল ছবি
সাফা খাতুন
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:০১
প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন দেশের অনেক শিক্ষার্থী। ভর্তি হওয়ার পর তাদের একটি বড় অংশের সেই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় আবাসিক জীবনের নতুন বাস্তবতা। কোথাও সিট নেই, কোথাও চারজনের কক্ষে থাকতে হচ্ছে সাতজনকে। পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই, ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বৃষ্টি হলে হলসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, রাতে হলে ফেরার পথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আবাসিক জীবনই হয়ে উঠেছে ভোগান্তির।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এসব সমস্যার অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ডাকসু আসার পর পরিবহন, রিডিংরুম ও কিছু অবকাঠামোগত সমস্যায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সংকটের অনেকটাই এখনো রয়ে গেছে।
সিটের চেয়ে কয়েক গুণ শিক্ষার্থী
মৈত্রী হলের সবচেয়ে বড় সংকট আবাসন। শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর এলটমেন্ট থাকলেও হলটির সিটসংখ্যা ৭০০-এর কিছু বেশি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সিট ছাড়াই থাকতে হয়। আবার যারা হলে থাকেন, তাদের অনেককেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া পারভীন বলেন, চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের এক বিছানা ভাগ করে থাকতে হয়। টেবিলও ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। তার ভাষ্য, প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর এলটমেন্ট থাকলেও সিট রয়েছে ৭০০-এর কিছু বেশি। ফলে আবাসিক শিক্ষার্থীদের ভীষণ ভোগান্তি পোহাতে হয়।
হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, চারজনের কক্ষে সাতজন পর্যন্ত থাকতে হয়। তিন ফুট প্রস্থের খাটে দুজনকে ঘুমাতে হয়। এতদিন সিলিং ফ্যানও দেওয়া হয়নি। ‘আত্মহত্যা করবে’—এমন কথা বলে ফ্যান দেওয়া হয়নি। তবে বর্তমানে ফ্যান দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
ক্যাম্পাসে যাতায়াতেও ভোগান্তি
মূল ক্যাম্পাস থেকে মৈত্রী হলের দূরত্বের কারণে প্রতিদিন ক্লাসে যাতায়াতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে নিউমার্কেট এলাকার যানজটের কারণে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি অর্থও ব্যয় হয়।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল তোবা বলেন, হলটি ক্যাম্পাস থেকে দূরে হওয়ায় যানজটে প্রতিদিনই সময় নষ্ট হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি আর্থিক চাপ।
তবে তার মতে, গ্রিন ফাউন্ডেশনের শাটল বাস চালুর পর যাতায়াতের সমস্যা কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, আগে ভোগান্তি আরও বেশি ছিল। তবে শাটল বাসগুলো মূলত ক্লাস চলাকালে চালু থাকে। রাতে টিউশন শেষে হলে ফেরার সময় পর্যাপ্ত যাতায়াতব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা হয়। হলটি মূল ক্যাম্পাসের বাইরে হওয়ায় রাতে ফেরার সময় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকে।
শিক্ষার্থী মাইশা আক্তার বলেন, ডাকসু আসার পর পরিবহনব্যবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। শাটল থাকায় খুব বেশি সমস্যা হয় না। তবে হলটি ক্যাম্পাসের বাইরে হওয়ায় কিছুটা সমস্যা থেকেই যায়। নিউমার্কেটের জ্যামে বেশ সময় চলে যায়।
দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা
মৈত্রী হলের আবাসিক জীবনের আরেকটি বড় দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভারী বৃষ্টি হলে হল ও নিউমার্কেটসংলগ্ন এলাকায় পানি জমে যায়। এতে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্লাসে যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, দুই ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই হল ও আশপাশের এলাকায় পানি জমে যায়। এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি।
তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা। তিনি বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে একটি পরিকল্পনা দিয়েছেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।
‘বেঁচে থাকা লাগে, তাই এই অখাদ্য খাই’
ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তাদের ভাষ্য, ক্যান্টিনের মালিকানা পরিবর্তন হলেও খাবারের মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শর্মিলা খাতুন বলেন, ‘ক্যান্টিনের খাবারের মান ও তদারকি প্রায় নেই বললেই চলে। ‘বেঁচে থাকা লাগে, তাই এই অখাদ্য আমরা খাই।’
একই শিক্ষাবর্ষের ফারিয়া ইসলাম বলেন, ক্যান্টিনের খাবারের মানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরাবরই খাবার খারাপ। ক্যান্টিনে নিয়মিত তদারকি বাড়িয়ে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা দরকার।
খাবার পানি ও স্যানিটেশনে সমস্যা
হলের খাবার পানির মান নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, কিছুদিন আগে খাবার পানির সমস্যায় হলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পানি পরীক্ষা করা হয়। পরে নতুন ফিল্টার বসানো হয়েছে।
শিক্ষার্থী আসমা খাতুন বলেন, হলে পানির সংকটের পাশাপাশি বাথরুমের অপর্যাপ্ততা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমস্যাও রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীর তুলনায় স্যানিটেশন সুবিধা পর্যাপ্ত নয় বলেও অভিযোগ তার।
পড়ার জায়গাও অপ্রতুল
আবাসিক শিক্ষার্থীর তুলনায় রিডিংরুমের আসনও কম। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ৭০০-এর বেশি আবাসিক শিক্ষার্থীর জন্য দুটি রিডিংরুম মিলিয়ে আসন রয়েছে প্রায় ২০০টি। পর্যাপ্ত রিডিংরুম, পড়ার জায়গা ও শব্দদূষণের সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।
তবে শিক্ষার্থী জান্নাতুল তোবা বলেন, রুমে অনেক মানুষ থাকায় তেমন পড়ার পরিবেশ নেই। তবে রিডিংরুম থাকায় বেশি সমস্যা হয় না। ডাকসু আসার পর রিডিংরুমে এসি দেওয়াকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তিনি।
রুমে বানর, নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
মৈত্রী হলের শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি অস্বস্তির কারণ বানরের উৎপাত। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বানর প্রায়ই কক্ষে ঢুকে পড়ে। এতে খাবার ও জামাকাপড় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, আগে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তবে বর্তমানে হল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন জায়গায় গ্রিল লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তা নিয়ে অন্য উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের একজন বলেন, রাতে হলের ছাদেও সব সময় নিরাপদ বোধ করেন না তারা। পাশের একটি ভবন থেকে নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে লেজার লাইট ফেলার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে হল প্রশাসনের দৃশ্যমান ব্যবস্থা তারা দেখতে পাননি।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে আতঙ্ক
মৈত্রী হলের সিকদার মনোয়ারা ভবন নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, ভবনটিকে আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে সেই চিহ্ন তুলে দিয়ে রং ও কিছু সংস্কারকাজ করা হয়েছে। তবে ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। ছোট মাত্রার ভূমিকম্প হলেও অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা চান তারা।
চিকিৎসাসেবাতেও সীমাবদ্ধতা
অসুস্থ হলে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈমা সুলতানা বলেন, অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‘একদিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়’
হলের ব্লক টিউটর তাসনিমা খান বলেন, হলে অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে একদিনে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একজন ব্লক টিউটরকে বিভিন্ন কমিটি ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। ফলে সবকিছু একসঙ্গে দেখভাল করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও ধীরে ধীরে বাকি সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ধাপে ধাপে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে গ্রিল লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। বানরের উপদ্রব কমাতে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায় কি না, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে একটি পরিকল্পনা দিয়েছেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে। অন্যান্য সমস্যাও পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
- বিষয় :
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- ভোগান্তি
- হল