লকডাউন শেষেও রুখতে হবে জনসমাগম
ডা. শাহরিয়ার রোজেন ও ডা. নাজিফ মাহবুব
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২১ | ০২:৩৩
বর্তমানে করোনা মহামারির এই চরম পরিস্থিতিতে সরকারের গৃহীত কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে একটি হলো 'লকডাউন'। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় লকডাউন দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে, বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে এবং ঈদুল ফিতরের আগে দুই-তিন সপ্তাহের বেশি লকডাউন আরোপ করা কিংবা পূর্ণাঙ্গ লকডাউন কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। নাজুক এই পরিস্থিতিতে লকডাউন শেষে সংক্রমণ কমাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লকডাউন তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময়ের জনসমাগম নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। অপর পক্ষে ভারতসহ কয়েকটি দেশে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে। এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার কমে আসা এবং ভ্যাকসিনের আবির্ভাবের কারণে মানুষ অনেকটা নিশ্চিত বোধ করে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু করে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য জনসমাগম আয়োজন করতে দেখা যায়। পাশাপাশি, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত জমায়েত সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, জনসমাগম থেকেই কভিড-১৯ ভাইরাস বেশি ছড়ায়। সেই জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং দৈনিক সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসার আগ পর্যন্ত সব সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, পিকনিক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম, রাজনৈতিক জনসভাসহ সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। নিয়ম অমান্য করে কেউ জনসমাগম করলে অথবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করতে হবে, তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যেতে পারে। অনধিক ৫০ শতাংশ মানুষ দিয়ে একাধিক শিডিউলে রোটেশনের ভিত্তিতে অফিস-আদালত, কল-কারখানা সীমিত আকারে চালু রাখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পরিবহন সমস্যাও কিছুটা কমতে পারে। ব্যাংক বা শপিংমল সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে খোলা না রেখে নিয়মিত বিরতি দিয়ে সীমিত আকারে খোলা রাখা যেতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্নেষণ করে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধাপভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে হঠাৎ করে লকডাউন, আবার লকডাউন থেকে অনিয়ন্ত্রিত স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরত গিয়ে পুনরায় 'লকডাউন'- এমন পদ্ধতি অবলম্বন করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবপর হবে না এবং লকডাউনও ফলপ্রসূ হবে না। অধিকাংশ দেশ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি ডিসিশন-ম্যাট্রিপ তৈরি করেছে, যা সংক্রমণের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকরী সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখে। এর জন্য সংক্রমণের মাত্রা পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলো দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়। করোনা আক্রান্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রহণ করা পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য নিল্ফেম্নর 'ধাপভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা' অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথম ধাপ (রেস্ট্রিকশন- দৈনিক শনাক্তের হার ৫-১০ শতাংশ) : ঘরের বাইরে জনসমাগম ১০০ জন এবং অভ্যন্তরীণ জমায়েত ৫০ জনের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অফিস-আদালত পরিচালনা করা।
দ্বিতীয় ধাপ (নিয়ন্ত্রণ- দৈনিক শনাক্তের হার ১০-২০ শতাংশ অথবা কভিড রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত আইসিইউ ৬০ শতাংশের চেয়ে অধিক পূর্ণ) : সব ধরনের পাবলিক সমাবেশ, সামাজিক এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রম নিষিদ্ধ; আন্তঃজেলা চলাচল সীমিত করা; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিধিনিষেধের আওতায় পরিচালিত করার অনুমতি দেওয়া। সংক্রমণের মাত্রা বিবেচনা করে বিভিন্ন জেলায় অঞ্চলভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করা।
তৃতীয় ধাপ (লকডাউন- দৈনিক শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি এবং ঊর্ধ্বমুখী এবং কভিড রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত আইসিইউ ৮০ শতাংশের চেয়ে অধিক পূর্ণ) :জরুরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ভ্রমণ, ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড এবং জনসাধারণের চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কমপক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য দেশজুড়ে লকডাউন।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে লকডাউন আরোপ করা কিংবা পূর্ণাঙ্গ লকডাউন কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, পিকনিক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম, রাজনৈতিক জনসভাসহ সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ