ইউএনও-ওসির সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি
সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে ভুয়া সনদে নামজারি খতিয়ান
প্রতীকী ছবি
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৮
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সরকারি পোর্টালের আদলে ভুয়া (ক্লোন) ওয়েবসাইট বানিয়ে ডিজিটাল ওয়ারিশ ও নাগরিক সনদ জালিয়াতির এক অভিনব ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওই ভুয়া সনদে ভূমি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নামজারি খতিয়ান বানিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নিচ্ছে। জাল সনদে করা এমনই একটি আড়াই কোটি টাকা মূল্যের জমির নামজারি খতিয়ান সম্প্রতি বাতিল ঘোষণা করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট সরোয়ার হোসাইন লাবলু জানান, ইউএনও ও ওসির ভুয়া সিল-স্বাক্ষর দেওয়া ওয়ারিশ সনদে যে জমির নামজারি খতিয়ান করা হয়েছে, তার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে সীতাকুণ্ড সাব-রেজিস্ট্রারি অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১৯৬২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল পুড়ে যায়। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি জালিয়াতি চক্র ভুয়া দলিল তৈরি করে অসৎ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে। সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া ‘ক্লোন’ ডোমেইন তৈরি করে এবং প্রশাসনিক পদে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর স্ক্যান ও জাল করে ভুয়া নামজারি খতিয়ান বানিয়ে নামমাত্র মূল্যে তা বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে।
দৈনিক সমকালের হাতে আসা তথ্যে জানা যায়, ভুয়া সনদ ও জাল দলিলে গত দেড় বছরে অন্তত ৭টি নামজারি খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে। উপজেলার সোনাইছড়ি মৌজায় আমেরিকা প্রবাসী জীবিত মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সনদে নামজারি খতিয়ান করার পর তা খারিজ করে দেওয়া হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড পৌরসভার অনুমোদিত ও সুরক্ষিত ডিজিটাল সনদ পোর্টালটি হলো (sitakunda.prottoyon.net)। তবে প্রতারক চক্রটি হুবহু সরকারি সাইটের আদলে sitakunda.prottoyon.com-web নামে একটি অননুমোদিত ডোমেইন খোলে।
জানা গেছে, হাছিনা বেগম নামে এক নারী সংঘবদ্ধ কম্পিউটার অপারেটর চক্রের সহায়তায় ওই ভুয়া সাইট থেকে বিগত ১৪ এপ্রিল (২০২৪/২০২৬) তারিখ দেখিয়ে ১০৪৪৪৬ নম্বরযুক্ত একটি ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করেন। ওই দিন ‘পহেলা বৈশাখ’ উপলক্ষে সরকারি সাধারণ ছুটি থাকা সত্ত্বেও সনদে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের স্ক্যান করা ভুয়া স্বাক্ষর ও সিল বসানো হয়। এতে আরও ব্যবহার করা হয় পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলামের (যিনি ওয়ার্ডের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন) ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর।
এই অস্তিত্বহীন ওয়ারিশ সনদকে খাঁটি হিসেবে দেখিয়ে হাছিনা বেগম উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শিবপুর মৌজার ১০টি দাগের ৫৭.৪৫ শতক জমির নামজারি খতিয়ান (নং ২০২৬-১০০০৩৩, মিউটেশন কেস নং- ২২৫(IX-I)/২০২৬-২৭) করিয়ে নেন। গত ১০ আগস্ট নামজারির অনুমোদন পান ভূমি কর্মকর্তা। পরবর্তী সময়ে জমির প্রকৃত ওয়ারিশ হাছিনা বানুকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালালে জালিয়াতির ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
ভুক্তভোগী হাছিনা বানুর পুত্র মো. আলী আজম পৌর প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিন ও সার্ভার অডিট চালান। তদন্তে দেখা যায়, নির্দেশিত তারিখে পৌরসভা থেকে কোনো সনদ ইস্যু করা হয়নি এবং সরকারি পোর্টালে এর কোনো ডেটাও নেই। ওসি মো. মহিনুল ইসলাম ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, সনদে থাকা স্বাক্ষরগুলো জালিয়াতি করে তৈরি করা।
পরবর্তী সময়ে পৌরসভার এক অফিস আদেশে ১০৪৪৪৬ নম্বর যুক্ত ওয়ারিশ সনদটিকে অবৈধ ও অস্তিত্বহীন ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। পাশাপাশি ওই সনদের ভিত্তিতে যাতে কোনো জমি রেজিস্ট্রি বা নামজারি না হয়, সে বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সাইটের ক্লোন তৈরির সত্যতা পেয়ে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছেন পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, চক্রটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এসিল্যান্ড, সাব-রেজিস্ট্রার ও ওসিকে অনুরোধ জানিয়ে পৃথক দুই নোটিশ জারি করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মূল সনদ ও এনআইডিসহ হাজির হতে ৩ কার্যদিবসের নোটিশ দেওয়া হলেও হাছিনা বেগম হাজির না হয়ে আত্মগোপন করেছেন।
সীতাকুণ্ড পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ফখরুল ইসলাম বলেন, ভুয়া ওয়েবসাইট বানিয়ে ওয়ারিশ সনদ তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর স্ক্যান করে ডিজিটাল জালিয়াতি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের কাউকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা গেছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম