ক্যান্সার: ১০টি লক্ষণ অবহেলা নয়
ডা. নওসাবাহ নূর
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো শারীরিক অসুস্থতা বা পরিবর্তনকে আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে এড়িয়ে চলি। অনেক সময় ভাবি সাধারণ ক্লান্তি, জ্বর বা সামান্য ব্যথায় চিন্তার কিছু নেই। অথচ অবহেলা করা এই ছোট উপসর্গগুলো অনেক সময় শরীরে বাসা বাঁধা ভয়ংকর কোনো রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ক্যান্সার একটি অত্যন্ত জটিল ও ভয়ংকর রোগ হলেও যদি এটি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তবে সঠিক চিকিৎসায় রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব। রোগটি যখন অনেক দেরিতে ধরা পড়ে, তখন তা শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে ওঠে।
তাই নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সামান্য পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে একটি বিষয় শুরুতে স্পষ্ট করে রাখা প্রয়োজন, শরীরে এই লক্ষণগুলোর উপস্থিতি মানে যে নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার, বিষয়টি এমন নয়। অনেক সাধারণ ইনফেকশন, পুষ্টির অভাব বা অন্য কোনো মামুলি শারীরিক জটিলতার কারণে এই উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে। তবে লক্ষণগুলো যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় বা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, তবে কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকি না নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
নিচে ক্যান্সারের ১০টি প্রধান সতর্কবার্তা আলোচনা করা হলো, যেগুলোর দেখা মিললে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
১. কারণ ছাড়া দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
lকোনো ধরনের ডায়েট বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া হঠাৎ করে দ্রুত ওজন কমতে শুরু করা ক্যান্সারের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
l যদি কোনো কারণ ছাড়া ৫ কেজি বা তার বেশি ওজন কমে যায়, তবে তা নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত।
l অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, খাদ্যনালি বা ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই লক্ষণটি বেশি দেখা যায়।
২. দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
lক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি বা বারবার জ্বর আসার প্রবণতা দেখা যায়।
l যখন ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে, তখন এই উপসর্গটি বেশি প্রকাশ পায়।
l বিশেষ করে লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার মতো ক্যান্সারের ক্ষেত্রে জ্বর একটি প্রাথমিক উপসর্গ হতে পারে।
৩. চরম ক্লান্তি ও অবসাদ
পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুমানোর পরও যদি শরীর থেকে চরম ক্লান্তি বা দুর্বলতা দূর না হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়।
l লিউকেমিয়ার মতো কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে শুরু থেকে অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
l মলাশয় বা পাকস্থলীর ক্যান্সারের কারণে রক্তপাত হলে তার ফলে শরীরে রক্তশূন্যতা ও তীব্র ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
৪. ত্বকের দৃশ্যমান পরিবর্তন
শুধু ত্বকের ক্যান্সারই নয়, শরীরের ভেতরের অন্যান্য ক্যান্সারও ত্বকে নানা পরিবর্তন আনতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
lত্বক অস্বাভাবিকভাবে কালো হয়ে যাওয়া।
lত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া।
lত্বক অতিরিক্ত লাল হওয়া, চুলকানি বা মাত্রাতিরিক্ত পশম বা চুলের বৃদ্ধি।
৫. অন্ত্র বা মূত্রাশয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন
l দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া বা মলের আকার ও অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন মলাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
l প্রস্রাবের সময় ব্যথা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত কিংবা ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া মূত্রাশয় বা প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইঙ্গিত দিতে পারে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি ও না সারানো ক্ষত
l শরীরে যদি কোনো ক্ষত থাকে; যা চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরেও ভালো হয় না, তবে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
l মুখে বা জিহ্বায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থাকলে তা মুখের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসক বা ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
l জরায়ু বা সংবেদনশীল স্থানে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত ইনফেকশন বা ক্যান্সারের প্রাথমিক রূপ হতে পারে।
৭. অস্বাভাবিক রক্তপাত
শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত রক্তপাত ক্যান্সারের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে। যেমন:
l কাশির সঙ্গে রক্ত: ফুসফুসের ক্যান্সার।
l মলের সঙ্গে রক্ত: মলাশয় বা মলদ্বারের ক্যান্সার।
l যোনিপথে অস্বাভাবিক রক্তপাত: জরায়ু বা সার্ভিক্যাল ক্যান্সার।
l প্রস্রাবে রক্ত: মূত্রাশয় বা কিডনি ক্যান্সার।
l ব্রেস্ট থেকে তরল বা রক্ত: স্তন ক্যান্সার।
৮. শরীরের কোথাও শক্তভাব বা পিণ্ড অনুভূত হওয়া
lস্তনের টিস্যু, অণ্ডকোষ বা শরীরের যেকোনো নরম অংশে যদি হঠাৎ কোনো শক্ত পিণ্ড বা মাংস জমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। অনেক ক্যান্সার শুরুতে বাহ্যিকভাবে এভাবে ধরা পড়ে।
৯. গিলতে সমস্যা বা বদহজম
lক্রমাগত বদহজম, বুকজ্বালা বা খাবার গিলতে গিয়ে গলায় আটকে যাওয়ার মতো সমস্যা হলে তা পাকস্থলী বা গলার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
১০. টানা কাশি বা কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন
l তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে টানা কাশি থাকলে তা ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
l কোনো কারণ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন এলে তা স্বরযন্ত্র বা থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ওপরে উল্লিখিত প্রতিটি উপসর্গ ক্যান্সার ছাড়াও সাধারণ অন্য অনেক কারণে হতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন এবং শরীরে কোনো অস্বাভাবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন লক্ষ্য করলে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
[ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
- বিষয় :
- ডাক্তার