ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান বিপাকে

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান বিপাকে
×

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ মে ২০২২ | ০৪:৪৬

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) তালিকাভুক্ত একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বরে ১০ কাঠার একটি প্লটে ভবন নির্মাণের জন্য জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। মোট ফ্লোরের অর্ধেক পাবেন জমির মালিক। বাকি অর্ধেক পাবে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে সব ফ্ল্যাট তৈরির পর কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নয়তলা ভবনের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়; কিন্তু গত মার্চে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটির মালিক কাজ বন্ধ করে দেন। কীভাবে ভবনটির কাজ শেষ করবেন, এ নিয়ে তিনি দিশেহারা।

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সমকালকে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যেই তিনি সব ফ্ল্যাট বিক্রির বুকিং নেন। তখন প্রতি বর্গফুটের দাম নেন সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। রডের দাম প্রতি টন ৬৫ হাজার টাকা ধরে ওই দামে ফ্ল্যাট বুকিং নেন। বর্তমানে রডের দাম ৯২ হাজার টাকা। ১ কোটি সাইনিং মানিসহ বাকি কাজ শেষ করতে গেলে এখন তাঁর প্রতি বর্গফুটের দাম পড়বে অন্তত ৭ হাজার টাকা। এই কাজ শেষ করতে হলে তাঁকে অন্তত ২ কোটি টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। কারণ যাঁরা বুকিং করেছিলেন তাঁরা রড-সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধির কথা মানছেন না। তাঁদের কোনোভাবেই বোঝাতে পারছেন না।

ক্রেতারা কেবলই বলছেন, চুক্তির দামেই তাঁদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বনানীতে তাঁর অফিসে গিয়ে ক্রেতারা ঝগড়াঝাটি করছেন। আরও কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে তিনি একই ঝামেলায় পড়েছেন। এখন তাঁর কোম্পানির দেউলিয়া হওয়ার অবস্থা। এ অবস্থায় তিনি কী করবেন, কিছুই বুঝতে পারছেন না। এ অবস্থা কেবল একটি ডেভেলপার কোম্পানিরই নয়; রাজধানীতে প্রায় তিনশ ডেভেলপার কোম্পানি নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির এই জাঁতাকলে পড়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন। এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের ১ নম্বর সিনিয়র সহসভাপতি কামাল মাহমুদ সমকালকে বলেন, গত এক বছরের ব্যবধানে কিছু নির্মাণসামগ্রীর দাম শতভাগেরও বেশি বেড়েছে। অথচ যখন একজন ডেভেলপার কোনো ল্যান্ড ওনারের সঙ্গে চুক্তি করেন তখন বছরে ৫-১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির চিন্তা করে প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করেন। সেভাবেই তাঁরা ফ্ল্যাটের বুকিং নেন। যখন শতভাগেরও বেশি নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বেড়ে যায়, তখন কী যে অবস্থা হয়, তা ডেভেলপাররাই বুঝতে পারেন। তিনি বলেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা বিপাকে আছেন। এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখন সরকারের সুদৃষ্টি ছাড়া কোনো উপায় নেই।

কেবল রিয়েল এস্টেট খাতই নয়, এর সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে পড়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। দু'বছর আগে যে রেট শিডিউল অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজের ঠিকাদারির কাজ পেয়েছিলেন, তাঁরাও পড়েছেন একই যন্ত্রণায়। সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে কিছু ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নকাজও থেমে আছে অনেক জায়গায়। অন্য কাজগুলোতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। তাঁরা বলছেন, ঠিকাদারদের যে চুক্তিতে কাজ দেওয়া হয়, সরকারের তৈরি সেই ধারাগুলো সংশোধন করতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসে প্রাইস এডজাস্টমেন্ট ধারা যুক্ত করতে হবে। যাতে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেলে ঠিকাদারের বিলও যেন সে অনুযায়ী রিভাইজড করা হয়। এটা না করলে ঠিকাদারদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এরই মধ্যে অনেক ঠিকাদার ব্যাংক ঋণের কারণে পথে বসে গেছেন।

সারাদেশের ঠিকাদারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বাছি) পরিচালক (প্রশাসন) ইঞ্জিনিয়ার হাসান মাহমুদ বাবু সমকালকে বলেন, বাছির পক্ষ থেকে আমরা সরকারের কাছে ১০টি দাবি দিয়েছি। এগুলো আমলে না নিলে ঠিকাদারদের বাঁচানো যাবে না। তিনি বলেন, এ নিয়ে আমরা রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছি। এক মাসজুড়ে দেশের জেলা-উপজেলাগুলোতেও মিছিল-সমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তার পরও দেখা যাচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বাড়ছেই।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড :গত এক বছরের ব্যবধানে যে হারে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। রিহ্যাবের পর্যবেক্ষণে প্রধান ১১টি নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা শিগগিরই সরকারের কাছে রিহ্যাবের পক্ষ থেকে তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে। সেই তালিকায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে প্রতি টন রডের দাম ছিল ৬৪ হাজার টাকা। সেটা ২০২১ সালে হয় ৭০ হাজার টাকা। বর্তমানে সেটার মূল্য ৯২ হাজার টাকা।

একইভাবে ২০২০ সালে কোম্পানিভেদে সিমেন্টের দাম ছিল প্রতি ব্যাগ ৩৭৫ থেকে ৪০৫ টাকা। ২০২১ সালে হয় ৩৯০ থেকে ৪২৫ টাকা। বর্তমানে তা ৪৭৫ থেকে ৫৬০ টাকা। প্রতি ঘনফুট বালুর দাম ছিল ৮ টাকা থেকে ১৫ টাকা। বর্তমানে ৩০ টাকা হয়েছে। মোটা বালুর দাম ছিল ২৫ টাকা থেকে ৩৫ টাকা। বর্তমানে হয়েছে ৫৫ টাকা। প্রতি ঘনফুট পাথরের দাম ১৬০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা ছিল। বর্তমানে ২৪০ টাকা হয়েছে।

একইভাবে বেড়েছে ইট, থাই অ্যালুমিনিয়াম, গ্রিল ও রেলিং, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, স্যানিটারি সামগ্রী ও শ্রমের মজুরি। ২০২০ সালে প্রতি বর্গফুটের জন্য শ্রমিকের মজুরি পড়ত ১৪০ টাকা। ২০২১ সালে হয় ১৬০ টাকা। বর্তমানে তা ২২০ টাকা।

নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানান, উন্নয়নশীল দেশে জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ অর্থ উন্নয়নের কাজে ব্যয় হয়। বাংলাদেশের জিডিপিতে নির্মাণশিল্পের অবদান ১৪ শতাংশের অধিক। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১ কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু এ অবস্থা চলতে থাকলে বাস্তবে দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

×