দামের ঢেউয়ে বাজারে ভেজালের জাল
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২২ | ১৩:৪৮
রাজধানীর বনেদি মাছের বাজার হাতিরপুল। সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা বলেই হয়তো বিক্রেতার সেই রকম হাঁকডাক। লাল রঙের কাগজে মোড়ানো বাতি, যেন রঙিন রোশনাই। থরে থরে সাজানো রুই-কাতলা। বিক্রেতা গফুর নিচে রাখা বালতি থেকে কিছুক্ষণ পরপর দিচ্ছে রং মেশানো পানির ঝাপটা। মাছের ফুলকায় লেপ্টে দিচ্ছে কাটা মাছের রক্ত। আর তাতেই মনে হচ্ছে, মাছগুলো তরতাজা।
গাড়ি থেকে নেমে সোজা মাছের বাজারে ঢুকলেন ব্যাংক কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম। বড় রুই মাছটির কানকো তুলে 'লাল' ফুলকা খুঁজতে লাগলেন। ফুলকা দেখে বেজায় খুশি ব্যাংকার ফরিদুল। জোড়া রুই কিনে দাম মিটিয়ে খুশিমনে ফরিদুল ধরলেন বাড়ির পথ। তাজা মাছের নাটক সাজিয়ে বেশি দাম পকেটে পুরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল বিক্রেতা গফুর। মাছে মেশানো হয় ক্ষতিকর রং- এ তথ্য সবারই জানা। তবে বেশি লাভের আশায় এখন বেড়েছে সেই অপতৎপরতার মাত্রা। শুধু মাছ নয়, সব ধরনের পণ্যে ভেজালের মিশ্রণ এখন বাড়বাড়ন্ত। গেল এক মাস রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে সমকাল।
বাজারে সব সামগ্রীর দাম একযোগে বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকছেন তুলনামূলক কম দামের পণ্যে। আর এ সুযোগ লুফে নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তাদের কেউ আসল পণ্যের মোড়কে নকল পণ্য উৎপাদন করে তা বাজারজাত করছে। আবার কেউ পচাবাসি মাছ-মাংসে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে গছিয়ে দিচ্ছে ক্রেতাকে। এভাবে খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে ক্রেতার পকেট কাটার পাশাপাশি ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে। এসব নকল বা ভেজাল পণ্য জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক আগে থেকেই এসব অপরাধ করে আসছে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী। তবে এখন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভেজাল নতুন মাত্রা পেয়েছে। দাম বাড়ার এই জাঁতাকলে ভেজাল পণ্য ভোক্তাদের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
সরকারি তিন সংস্থার পর্যবেক্ষণ :জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, এক বছরের ব্যবধানে পণ্যে নকল ও ভেজালের মাত্রা অনেকখানি বেড়েছে। সংস্থাটি অভিযানে গিয়ে গেল বছরের চেয়ে এখন ভেজাল অপতৎপরতায় অসাধু ব্যবসায়ীদের বেশি যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াসহ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কাজ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটি বলছে, এ খাতের অপরাধীদের বিরুদ্ধে এক বছরে মামলা এবং জরিমানা আদায় বেড়েছে। আর পণ্যের মান নিশ্চিতের বিষয়ে কাজ করা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) এক বছরে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৩৫। এই তিন সরকারি সংস্থার বিশ্নেষণই প্রমাণ দেয়, পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগে নকল ও ভেজালের জালের বিস্তার কতখানি বেড়েছে।
সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে সরকার সোচ্চার। প্রতিনিয়ত তদারকি, আইন অনুযায়ী মামলা, জেল-জরিমানা, প্রতিষ্ঠন সিলগালাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানও চলছে।
নগর থেকে শহরে :বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত নকল পণ্য ও ভেজাল খাদ্য বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর অভিজাত এলাকার পাশাপাশি সাধারণ মানের মার্কেটেও। ঢাকার কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, নিউমার্কেট, গুলশান, বনানী, উত্তরা, চকবাজার, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি মার্কেটে এসব পণ্য বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো। উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায়ে সব স্তরের ব্যবসায়ী কমবেশি জড়িত এসব অপরাধে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্য জেলায়ও ছড়িয়ে পড়েছে এ ধরনের জনবিরোধী অপরাধ।
মাছ-মাংসে ক্ষতিকর রং :দাম বেড়ে বাজারে এখন ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। তবে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাড্ডাসহ কয়েকটি স্থানে এখনও ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় মেলে গরুর মাংস। চড়া বাজারে কীভাবে কমদামে গরুর মাংস বিক্রি সম্ভব- সে কথা জানিয়েছেন কারওয়ান বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা। তিনি জানান, ভারত থেকে আমদানি করা এ ধরনের ভেজাল মাংস রয়েছে। এই মাংসের মূল ক্রেতা রেস্তোরাঁর মালিকরা। অন্যদিকে ফ্রিজে রাখা পচাবাসি মাংসে কাপড় তৈরির রং মিশিয়ে (রক্তের মতো) একটু কম দামে ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। এই রং মেশালে মাংস চকচকে লাল দেখায়, তাজা মাংস মনে হয়। অনেকে আবার মহিষের মাংস গরু বলে বেশি দামে বিক্রি করেন।
কয়েকটি মাছবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছের দোকানে বালতিতে পানির সঙ্গে লাল রং মিশ্রণ করে রাখে অসাধু বিক্রেতারা। মাছকে তাজা দেখানোর জন্য কিছুক্ষণ পরপর ওই পানি দেওয়া হয় মাছের ফুলকা ও শরীরে। কেউ কেউ ওজন বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করছে জেলি।
মিনিকেট প্রতারণা :বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা বিআর-২৮ ও ২৯ জাতীয় চালের। এ জাতীয় চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬২ টাকায়। আর মিনিকেট চালের কেজি ৭২ থেকে ৭৮ টাকা। চাল ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ মিনিকেট চালের সঙ্গে বিআর-২৮ ও ২৯ জাতের চাল মিশিয়ে তা মিনিকেটের দামে বিক্রি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চাল ব্যবসায়ী সমকালকে বলেন, বেশি মুনাফার আশায় মূলত বস্তা খুলে কম দামি ও বেশি দামি চালকে এক করা হয়। এরপর মিনিকেট চাল লেখা বস্তায় ওই চালগুলো ঢুকিয়ে নতুনভাবে বস্তার মুখ লাগানো হয়। যদিও মিশ্রণের পর চালের আকার ও বর্ণে ফারাক টের পাওয়া যায় না। তবে চাল রান্নার পর ভেজালের কিছুটা প্রমাণ মেলে। এ ছাড়া কোনো কোনো ব্যবসায়ী ভালো মানের বিআর-২৮ চালকে মিনিকেট বলে বিক্রি করেন। চালের বাজারে এভাবে প্রতিনিয়ত ঠকানো হয় ভোক্তাকে। সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মিরপুরের শাহআলী মার্কেটের চালের দোকানে অভিযান চালিয়ে মিনিকেট প্রতারণা হাতেনাতে ধরে। দেশের অন্য জেলাতেও এ ধরনের প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।
মানহীন প্রক্রিয়াজাত ও শিশুখাদ্য :নুডলস, বিস্কুটসহ ফাস্টফুড জাতীয় খাদ্য তৈরি হচ্ছে বারবার ব্যবহূত পোড়া তেল দিয়ে। এ ছাড়া চকলেট, ললিপপ, জুসসহ শিশুখাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়াই। নামিদামি ফাস্টফুডের দোকান ও রেস্তোরাঁয়ও পচাবাসি খাবার বিক্রির অহরহ প্রমাণ মিলছে।
রং, চুন, ফিটকিরি দিয়ে গুড় :চকচকে যে পাটালি আর ঝোলা গুড় বাজারে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশই ভেজাল। যেসব এলাকায় খেজুর উৎপাদন হয়, সেসব এলাকায় ভেজালের মাত্রা বেশি। বিশেষ করে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় ভেজাল গুড় তৈরি হয়। খেজুর গুড়ে মেশানো হয় চিনি, রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকিরি, গো-খাদ্য, আটা-ময়দা ও পাথুরে চুন। এ বছর বেশ কয়েকটি জেলার গুড় সংগ্রহ করে এ ধরনের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব গুড় খেলে পাকস্থলী, খাদ্যনালি, কিডনি, লিভারের ক্ষতিসহ নানা রোগ হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কাপড়ের রং দিয়ে কেক :ঢাকাসহ সারাদেশে নামিদামি বেকারিতে যেসব কেক মেলে, সেগুলোর অধিকাংশই ফুড গ্রেডের রঙে তৈরি নয়। শুধু কেক নয়- বিস্কুট, পাউরুটিসহ নানা খাদ্যে ব্যবহার হচ্ছে কাপড়ের রং। এ ছাড়া পটাশিয়াম ব্রোমেটসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ক্ষতিকর এসব উপাদানের কারণে নানা রোগও হতে পারে। বিএফএসএ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সংস্থাটির এক অভিযানে দেশের একটি ব্র্যান্ডের রুটিতে অত্যধিক ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি মেলে। যে তারিখে উৎপাদিত রুটিতে এ ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায়, সারাদেশ থেকে সেসব রুটি তুলে নেওয়া হয়।
বিদেশি মোড়কে মানহীন প্রসাধনী :বাজারে হরদম বিক্রি হচ্ছে নকল প্রসাধনসামগ্রী। বিএসটিআইর অনুমোদনহীন এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম, ভ্যাসলিন, লোশন, শ্যাম্পু, সাবান, টুথপেস্ট, নারকেল, সরিষার তেল ইত্যাদি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করা এসব নকল পণ্য আমদানি করা বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়ক লাগিয়ে বাজারজাত করা হয়, এরপর বেচাকেনা হয় চড়া দামে। নকল বারকোডও যুক্ত থাকে এসব পণ্যের মোড়কে। এসব প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতে যে ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ত্বকের জন্য শুধু ক্ষতিকরই নয়; এ থেকে গুরুতর রোগও হতে পারে।
এ ছাড়া নিম্নমানের ও নকল আচার, সস, মধু, জেলি, ঘি, হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনিয়া ও কারি পাউডার এবং বিভিন্ন মসলাজাতীয় পণ্য তৈরি করা হচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। যদিও এগুলো বিক্রি হচ্ছে আসল পণ্যের দামে।
অভিযানেও থেমে নেই অপতৎপরতা :পণ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রমাণ উঠে এসেছে সরকারের তদারকিতেও। সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থা বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে খাদ্যে ভেজাল, নকল পণ্য উৎপাদন, আসল পণ্যের মোড়কে ভেজাল পণ্য, আমদানি করা পণ্যে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বসানোসহ নানা অনিয়ম পেয়েছে। এসব অভিযানে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও বাস্তবে এই অপতৎপরতা থামানো যাচ্ছে না।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকার নিউমার্কেট, গুলশান, বনানী, চকবাজার, কেরানীগঞ্জ, উত্তরা, টঙ্গী, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি বাজারে অভিযান চালিয়ে নকল পণ্য উৎপাদন, ভেজাল ওষুধ বিক্রয় ও খাদ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণকারীদের হাতেনাতে ধরছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নকল ও ভেজালের অপরাধে ২৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৭ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১৮৯টি প্রতিষ্ঠানকে ২৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। অর্থাৎ গত এক বছরের ব্যবধানে অপরাধী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৭০টি। একই সঙ্গে জরিমানা আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে ৪৯ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা।
ঢাকায় নকল ও ভেজালবিরোধী বেশি অভিযান করেছেন ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল। সমকালকে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে হুবহু পণ্য তৈরি করছে কিছু ব্যবসায়ী। এ ক্ষেত্রে তারা কৌশলে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর পণ্যের নাম ও লোগোতে এমন সূক্ষ্ণ ফারাক রাখে, যাতে গ্রাহকের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়।
ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, নকল ও ভেজাল পণ্য তৈরি আগে থেকেই হতো। তবে দাম বাড়ার কারণে কিছু ব্যবসায়ীর তৎপরতা আরও বেড়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অধিদপ্তর অভিযান করছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, বাড্ডা, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে কয়েক মাস অভিযানে গিয়ে মাছ ও মাংস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্ষতিকর রং মেশানোর প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব অভিযানে কয়েক মণ গরুর মাংস ও মাছ ধ্বংস করা হয়েছে। সংস্থাটি গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নানা অনিয়মের কারণে ২৭ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২৭ মামলা করার পাশাপাশি ৩৮ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে। এই অর্থবছরের একই সময়ে ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪৫ মামলা এবং ৪৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১৮টি এবং জরিমানা আদায়ও বেড়েছে ৫ লাখ টাকা।
এ ব্যাপারে বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইউম সরকার সমকালকে বলেন, দ্রুত বেশি মুনাফার আশায় কিছু ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল মেশাচ্ছে। কেউ জেনেশুনে খাদ্যে ভেজাল দেয়। আবার কেউ না বুঝেও অন্যের দেখাদেখি ভেজাল দেয়। বেশ কয়েক ধরনের খাদ্যপণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনও (বিএসটিআই) নিয়মিত অভিযানে যায়। সংস্থাটির অভিযানেও শিশুখাদ্য ও মানহীন পণ্য উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অপরাধে গত অর্থবছরে ২ হাজার ৯১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ১৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২১ অপরাধীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ২২টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়।
এই অর্থবছরের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রথম তিন মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৭৩১টি মামলা করা হয়। সব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। জরিমানা ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ৪৯৬ এবং জরিমানা আদায় হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত এক বছরের ব্যবধানে জরিমানার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা কমলেও মামলা বেড়েছে ২৩৫টি।
এ ব্যাপারে সংস্থাটির উপপরিচালক (সার্টিফিকেশন মার্কস উইং) রিয়াজুল হক বলেন, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী এ ধরনের অপরাধ করছে। এমনও দেখা গেছে, জরিমানা করার পরও একই ব্যবসায়ী বারবার একই অপরাধ করছে। ভেজালরোধে বিএসটিআই আরও কঠোর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম সমকালকে বলেন, খাদ্যে দেওয়া বিষাক্ত রাসায়নিক লিভার ও কিডনিতে জমা হয়। এ কারণে মস্তিস্কে ক্ষতি, জন্ডিস, ক্যান্সারসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সের অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, দেশের অর্থনীতি এবং অন্য অবস্থা যখন দুর্বল থাকে, তখন এ ধরনের অপরাধ বাড়তে থাকে। ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বকের পুরুত্ব ও রং নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নানা চর্মরোগ হতে পারে। সরকার নজরদারি আরও বাড়ালে এ ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পণ্যমূল্য বাড়ার কারণে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আরও মুনাফার আশায় এ ধরনের অনৈতিক সুযোগ নিচ্ছে। তারা মানহীন ও ভেজাল পণ্য বাজারে ছেড়ে গ্রাহককে ঠকাচ্ছে। মূলত পণ্যের দাম ও মানের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নজরদারির অভাবেই এসব অপতৎপরতা দিন দিন বাড়ছে।
- বিষয় :
- দামের ঢেউয়ে বাজারে ভেজালের জাল