ডিমের বাজার
অস্থিরতার কারণ জানা, সমাধান কোন পথে
জাহিদুর রহমান ও জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৩ | ০১:৪৬
নিত্যপণ্যের বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের এমনিতেই হাঁসফাঁস অবস্থা। মাছ-মাংসের দামের তেজে দরিদ্র মানুষের চোখ যখন ডিমে, তখন আমিষ পূরণের অন্যতম পণ্যটির বাজারও অস্থির। রেকর্ড দামে ডিমই নতুন করে চাপ তৈরি করেছে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের টানাটানির সংসারে। গেল এক সপ্তাহে প্রতিটি ডিমের দাম অন্তত ৩ টাকা বেড়েছে। পাইকারিতে কিছুটা লাগাম টানা গেলেও খুচরা পর্যায়ে এখনও রেকর্ড দরে চলছে বেচাকেনা।
গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডজন বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। তবে এক হালি কিনতে গেলে ক্রেতাকে এখনও গুনতে হচ্ছে ৬০ টাকা। ডিমের বাজার এমন অস্থির হয়ে ওঠার ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের আগস্টে একই কায়দায় ডিমের বাজার নড়েচড়ে উঠেছিল। তখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাজারে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পায়। বাজারের কারসাজি খুঁজতে তখন মাঠে ছিল সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম হঠাৎ কেন বাড়ছে তা সবারই জানা, তবে সমাধানের পথে হাঁটে না কেউ। দফায় দফায় বৈঠক, ধরপাকড়, নির্দেশনা– কোনো কিছুই কাজে লাগছে না। এক বছরের মাথায় ডিমের দাম হঠাৎ লাফ দিলে গত শনিবার থেকে অভিযানে নামে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে গতকাল বৈঠকও করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আজ সকালে মতবিনিময় সভা ডেকেছে। এতকিছুর পরও বাজারে ছিটেফোঁটা প্রভাব পড়েনি। দাম বাড়ার পেছনে দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, চাহিদার তথ্য না থাকা, কৃষি বিপণন আইনের দুর্বলতা, উৎপাদন কমে যাওয়া, কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি না হওয়া, খামারিদের নীতি সহায়তা না দেওয়াকে দায়ী করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, মাছসহ অন্য পণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় ডিমের ওপর চাপ বেড়ে বাজার অস্থির হয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
এক ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকা
খামার পর্যায়ে ডিমের উৎপাদন খরচ কত– সে তথ্য প্রতি মাসে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে চলে এলেও তা প্রকাশ করা হতো না। এবারই প্রথম ডিমের উৎপাদন খরচ ও খুচরা বাজারে কত বিক্রি করা উচিত, সে বিষয়ে মুখ খুলেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, মুরগির খাবার, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক খরচসহ অন্য উপকরণ মিলিয়ে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ে সাড়ে ১০ টাকা। সে অনুযায়ী একটি ডিম ১২ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়।’
তবে মন্ত্রীর এ ঘোষণা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, এতে ১২ টাকার নিচে আর ডিমের দাম নামবে না। অন্যদিকে, খামারিরা বলছেন, তাদের উৎপাদন খরচ হিসাব করলে ডিমের দাম খুচরা বাজারে ১৩ টাকা হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, ‘আমরা জুলাইয়ে খামার পর্যায়ে ডিমের উৎপাদন খরচ বের করেছি। এরই মধ্যে মুরগির খাবারসহ অন্য উপকরণের দাম বাড়েনি। ফলে ধরে নেওয়া যায়, আগস্টেও ডিমের উৎপাদন খরচ একই থাকবে। প্রতি মাসেই উৎপাদন খরচ বের করা হবে। উৎপাদন খরচ কমলে, ডিমের দামও কমবে। এটি স্থায়ী নয়।’
দুই মন্ত্রণালয়ের ঠেলাঠেলি
ডিমের দর নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আছে সমন্বয়হীনতা। ডিমের দাম বাড়লেই প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, উৎপাদন পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব, বাজার নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার তাদের নেই। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, ডিমের বিষয়টি প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেখে। গতকালও দুই মন্ত্রীর বক্তব্যে সমন্বয়হীনতার বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাজারের লাগাম টানতে দর নির্ধারণ ও ডিম আমদানির বিষয়ে দুই মন্ত্রী দুই রকম কথা বলেছেন। গতকাল রোববার রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হলে এক কোটি ‘ফ্যামিলি কার্ডধারী’ নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝে পণ্য কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বাজারে ডিমের দাম কত হবে তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দিলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলেই ডিম আমদানি করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। আশা করি, খুব শিগগির এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে।
তবে এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, দর নির্ধারণ করে দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। এর আগে ২০১০ সালে বাচ্চা মুরগি ও অন্য বিষয়ের দাম নির্ধারণের বিষয় উঠেছিল। সে ক্ষেত্রে আদালত প্রশ্ন তুলেছিলেন, মন্ত্রণালয় এভাবে দাম নির্ধারণ করতে পারে না। আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে যে উৎপাদন আছে, বাজার ব্যবস্থা বিন্যাস করতে পারলে আমদানির প্রয়োজন হবে না।
খামারিরা যা বলছেন
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাহিদ রশীদের সভাপতিত্বে গতকাল সচিবালয়ে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। সেখানে ব্যবসায়ীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি আনোয়ারুল হক, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, বিপিআইসিসির যোগাযোগ ও মিডিয়া উপদেষ্টা মো. সাজ্জাদ হোসেন প্রমুখ।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি সমকালকে জানান, দাম কমানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে খামারিদের অনুরোধ করা হয়। সচিবের এ আহ্বানের সঙ্গে তারা একমত। পাশাপাশি তারা বেশ কিছু সমস্যার কথা তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরেন।
বৈঠকে এক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, ডিমের দাম বাড়লে শুধু বড় প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ডলার, জ্বালানি তেল, পোলট্রি খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কয়েক বছর ধরে খামারিরা লোকসান দিচ্ছেন। ডিমের দাম যখন কম ছিল, তখন সবাই চুপ ছিল। একতরফা করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হচ্ছে। এ খাতে কোটি কোটি টাকা লুটের তথ্য গণমাধ্যমে প্রমাণ ছাড়াই তুলে ধরা হচ্ছে।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ডিমের দাম বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে– আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া, চাহিদা বেড়ে যাওয়া, খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব, পোলট্রি খাদ্যের দাম বাড়া, ডিমের সঠিক চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য না থাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যে মাসে ডিমের উৎপাদন বেশি, পরের মাসেই দামের পতন ঘটেছে। বিপরীতে কম উৎপাদন হলে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এই উৎপাদন কমবেশির কারণে সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
বিপিসিসিআই সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ সমকালকে বলেন, প্রতি মাসে ডিমের সম্ভাব্য প্রকৃত চাহিদা ৬ কোটি পিস। তবে ডিমের উৎপাদন কম হলে বাজারে দাম বাড়ে। সেই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীরা জড়িয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো বিনিয়োগ নেই এ বাজারে। বিপরীতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে ডিম উৎপাদন করেও লাভ করতে পারছেন না খামারিরা। ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে না রাখলে এ খাত ধ্বংস হয়ে যাবে।
চার হাত ঘুরে বাড়ে দাম
ডিমের পাইকার, ডিলার ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খামার পর্যায়ে এখনও ১০০ ডিম পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১১৪০ থেকে ১২৩০ টাকা দরে। খামারি থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ে আসা পর্যন্ত চার হাত ঘোরে ডিম। শুরুতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে মুনাফা যোগ করে খামারিরা ডিম সরবরাহ করে ডিলারদের। ডিলাররা কেনা দামের সঙ্গে অন্য খরচ ও মুনাফা যোগ করে পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছান। পাইকাররাও একইভাবে তাদের ব্যবসায়িক খরচ ও মুনাফা যোগ করে পৌঁছায় খুচরা বিক্রেতার কাছে। শেষ ধাপে খুচরা বিক্রেতারাও তাদের মুনাফা যুক্ত করে ভোক্তা পর্যায়ে ডিম বেচেন। খামারি, ডিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা– এ চার ধাপে কমবেশি সবাই মুনাফা করেন। শুধু তা-ই নয়, এ চারটি ধাপেই মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী দাম ওঠানামার ক্ষেত্রে কিছু না কিছু ভূমিকা রাখেন।
তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ মিয়া বলেন, এখন বর্ষাকাল, বছরের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ সময় ডিমের চাহিদা বেশি থাকে। সম্প্রতি মাছের বাজার চড়া থাকায় ভোক্তারা ডিমের প্রতি ঝুঁকছেন। তবে যে হারে চাহিদা বেড়েছে, সেই হারে উৎপাদন বাড়েনি। এর কারণ লোকসানের কারণে কিছু খামার বন্ধ হয়ে গেছে। তা ছাড়া কোরবানির সময় চাহিদা না থাকায় অনেক লোকসান দিয়ে বিক্রি করেছেন। এখন কেউ কেউ তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কারওয়ান বাজারে ৩৫ বছর ধরে ডিমের ব্যবসা করছেন জাহাঙ্গীর হোসেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, সরবরাহে ঘাটতির কারণেই বাজারের এ হাল। উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। খুচরা বাজারে অভিযান চালালে সমাধান হবে না। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি ব্যবসায়ীর হাত ঘুরেই খুচরা বাজারে ডিম আসে। অতএব বড় হাতগুলোতে কী হচ্ছে, সেখানে খোঁজ নিতে হবে।
মামলার রায় হতে পারে শিগগিরই
গত বছর জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রতিযোগিতা কমিশন করপোরেট পর্যায়ে শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করে। মামলাগুলো নিয়ে বেশ আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনোটির নিষ্পত্তি হয়নি।
কমিশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ডিম নিয়ে ছয়টি এবং ব্রয়লার মুরগি বিষয়ে ছয়টি মামলা হয়েছিল। এরই মধ্যে একই কোম্পানির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলোর শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী সেপ্টেম্বরে দু-একটি মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে।
- বিষয় :
- ডিমের বাজার