ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পকেটে টান, টিসিবির ট্রাকেও নেই ভরসা

পকেটে টান, টিসিবির ট্রাকেও নেই ভরসা
×

খরচ কিছুটা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘ লাইন পড়ছে টিসিবির ট্রাকের পেছনে। মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারের ছবি মামুনুর রশিদ

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৩:৫৩

মলিন মুখ। সকালের ঝলমলে নরম রোদের পরশও রুবিনা বেগমের বিমর্ষ মুখে ছড়াতে পারছে না আলো। ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা রুবিনার চোখে কী যেন হারানোর ভয়। ট্রাক, এই বুঝি এলো বলে! তার মতো রাজধানীর ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে জটলা পাকানো শতাধিক নারী-পুরুষের চোখও কিছু একটা খুঁজছে। সবারই এক রকম 'যুদ্ধংদেহী' প্রস্তুতি। সরকারি বিপণন সংস্থার (টিসিবি) ট্রাকের ছায়া দেখলেই দেবেন ছুট। কার আগে কে সারিতে দাঁড়াতে পারবেন, আগে দিতে হবে সেই পরীক্ষা। পরে পণ্য পাওয়ার 'ভাগ্য' পরীক্ষা। কারণ, সারিতে দাঁড়ালেই চলবে না; ট্রাকে পর্যাপ্ত মজুত না থাকলে সাত-আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ে দিন শেষে খালি হাতে ফিরতে হবে বাড়ি।
সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নিত্যপণ্যের দামের 'পাগলা ঘোড়া'র সঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে হাঁপাচ্ছেন দরিদ্র, নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও। ফলে টিসিবি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে মানুষ ছুটছে টিসিবির ট্রাকের পিছু পিছু। প্রতিদিন আসছে নতুন বিমর্ষ মুখ। নতুন মুখগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই আবার মধ্যবিত্ত পরিবারের।
এদিকে, যে পরিমাণ পণ্য নিয়ে টিসিবির ট্রাক আসে, তা দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ফলে যারা ভোর থেকে সারিতে দাঁড়ান, তাদের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ পণ্য কিনতে পারেন না।
রাজধানীর কয়েকটি স্থানে গতকাল মঙ্গলবার টিসিবির ট্রাকের বিক্রয় কার্যক্রমের খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে আসে এ রকমই বেদনার ছবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায় মানুষ টিসিবির ট্রাকমুখী হচ্ছে। সরকার টিসিবির পণ্য বিক্রির আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ স্বল্প পরিসরে ক্রেতাকে স্বস্তি দিলেও এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। টিসিবির সারি ছোট করতে হলে বাজারে পণ্যের দামে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
কারণ, বাজারে আমদানি ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামে ব্যাপক ফারাক দেখা যায়। সিন্ডিকেট করে কেউ কেউ পণ্য মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে। আবার কখনও দেখা যায়, দোকানে পণ্যের দামের তালিকা ঝোলানো। তবে তা বাস্তবায়ন হয় না। তাই এ ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ সংশ্নিষ্টদের।
পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ বা বিপণন সব পর্যায়ে চাঁদাবাজদের আগ্রাসন রয়েছে। এ কারণে পণ্যের ব্যয় কিছুটা বেড়ে যায়। কিন্তু সেই বাড়তি ব্যয়টা মূলত ভোক্তার ঘাড়ে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে জিরো টলারেন্সে থাকতে হবে। এ ছাড়া উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম হাতে নেওয়া, সরকারি পর্যায়ে মজুত বাড়ানো, সময়মতো আমদানি করলে বাজারে এক ধরনের সবুজ সংকেত যায়। ফলে পণ্যের দামে নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি যারা অবৈধ উপায়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মত বিশেষজ্ঞদের।
ঠেলাঠেলি, হট্টগোল :রাজধানীর কাজীপাড়া থেকে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে টিসিবির পণ্য কিনতে এসেছেন ছালেহা বেগম। তার সামনে ক্রেতা বেশি থাকায় সারি থেকে বের হয়ে ট্রাকের পাশে গিয়ে পণ্য কেনার চেষ্টা করছিলেন। আর তাতেই তেতে ওঠেন পেছনের ক্রেতারা। একসময় লেগে যায় হট্টগোল।
ছালেহা বেগম সমকালকে বলেন, 'ভোর ৫টায় এখানে এসেছি। তখন মাত্র ৮ থেকে ১০ জন ছিল। গাড়ি আসার পর অনেক লোক ধাক্কাধাক্কি করে সারিতে ঢুকে গেছে। এ কারণে অনেক পেছনে পড়ে গেছি। সে জন্য সামনে গিয়ে কিনতে চেয়েছিলাম।'
একই স্থানে ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন ষাটোর্ধ্ব ফাতেমা বেগম। থাকেন স্কয়ার হাসপাতালের পাশে। দুপুর দেড়টার সময় তিনি টিসিবির গাড়ি থেকে পণ্য কেনার সুযোগ পান। সমকালকে বৃদ্ধ ফাতেমা বলেন, 'বাসায় আমার মেয়ে আছে। আমরা দুজনই বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। বাজারের চেয়ে কম দামে পণ্য পাওয়ার কারণে এখানে ছুটে এসেছি। তবে এখানে ঠেলাঠেলি, পণ্য পাব কিনা জানি না।'
তবে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন ছবি। টিসিবি ভবনের সামনে ট্রাক থেকে পণ্য কিনছেন চল্লিশোর্ধ্ব মো. হারিস। পণ্য নিয়ে নানা কথার ফাঁকে আক্ষেপ করে তিনি জানান, নাখালপাড়ায় তিনতলা এক বাড়ির কেয়ারটেকার তিনি। বাড়িওয়ালা তাকে দিয়ে প্রতি মাসে বিভিন্ন জায়গা থেকে টিসিবির পণ্য কেনান। নিজের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিজে না কিনে বাড়ির মালিকের জন্য পণ্য কিনতে হয়।
দুপুর ২টার দিকে ফার্মগেটে টিসিবির ওই ট্রাকটির পেছনে দেখা যায়, পুরুষ সারিতে ৮৪ ও নারীর সারিতে ১০৫ জন ক্রেতা অপেক্ষা করছেন। গাড়িতে যে পরিমাণ পণ্য রয়েছে, তা আর কতজনকে দেওয়া যাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাকটির বিক্রয়কর্মীরা জানান, বড়জোর ৫০ থেকে ৬০ জনকে দেওয়া যাবে; বাকিরা পাবেন না। এই কথার সূত্র ধরে সেখানকার এক পান বিক্রেতা বলেন, এখানে সপ্তাহে তিন দিন টিসিবির গাড়ি আসে। প্রতিদিনই অর্ধেক মানুষ কিনতে পারেন না। কখনও কখনও হট্টগোল বেধে যায়। তখন ট্রাক বিক্রি বন্ধ করে চলে যায়।
টিসিবির পণ্যে ক্রেতার সাশ্রয় কত :টিসিবির ট্রাকে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১১০ টাকায়, প্রতি কেজি চিনি ৫৫, ডাল ৬৫ ও পেঁয়াজ ৩০ টাকায় মিলছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, দুই কেজি করে চিনি ও ডাল এবং তিন কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারছেন।
বর্তমানে বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত তেল ১৬৮ টাকা। পেঁয়াজের কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, চিনি ৮০ থেকে ৮২ এবং বড় দানার মসুর ডাল ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে ক্রেতা বাজার থেকে এসব পণ্য না কিনে টিসিবির ট্রাক থেকে কিনলে তার সাশ্রয় হয় ২৩৬ থেকে ২৬০ টাকা। বাড়তি এই টাকা সাশ্রয় করার জন্য প্রতিদিনই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্রেতারা।
প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশের সব মহানগর, জেলা ও উপজেলায় এই পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চলছে। দৈনিক প্রতিটি ট্রাকের মাধ্যমে ৩০০ থেকে ৮০০ কেজি চিনি, মসুর ডাল ৪০০ থেকে ৮০০ কেজি, পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১০০০ কেজি এবং সয়াবিন তেল ৫০০ থেকে ১০০০ লিটার বরাদ্দ রাখা হয়। টিসিবির তথ্য বলছে, গতকাল রাজধানীর ৫৮টি স্থানে টিসিবির ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মত :এ ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টিসিবি ট্রাকের এই দীর্ঘ সারি বলে দিচ্ছে, যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন, তাদের পাশাপাশি স্বল্প, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অনেকে এখন সারিতে দাঁড়াচ্ছেন। এই চিত্রই বলে দেয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা কমেছে।
টিসিবির এক কোটি মানুষকে পণ্য দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, 'উদ্যোগ ভালো। যত সংখ্যক লোক টিসিবির পণ্য কেনার জন্য আগ্রহী, তার অল্প সংখ্যক মানুষই পণ্য কিনতে পারবেন। অনেকেই এ লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না। তাদের হয়তো রোজগারের জন্য কর্মক্ষেত্রে থাকতে হয়। অনেক মধ্যবিত্ত রয়েছেন, তাদেরও ক্রয়ক্ষমতা কমছে। তারা হয়তো ট্রাকের পেছনে আসবেন না। তাই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।
চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকবে, কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষতা সাধন করতে না পারলে এ সমস্যা থেকেই যাবে। আয়বর্ধক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। আবার ডলারের বিপরীতে টাকা কিছুটা দর হারিয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে আমদানি করা পণ্যগুলোতে শুল্ক্ক কমানো যেতে পারে।
প্রভাবশালীদের চাপ :সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যেসব এলাকায় নিয়মিত টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়, সেসব এলাকার রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রভাব খাটিয়ে টিসিবির ট্রাক থেকে অতিরিক্ত পণ্য কিনে নিয়ে যান। এ ছাড়া পর্দার আড়ালে থেকে প্রভাব খাটিয়ে বাড়ি-গাড়ি আছে এমন সামর্থ্যবানও তাদের বাসার কাজের লোক দিয়ে টিসিবির পণ্য কিনে নিচ্ছেন। এ কারণে টিসিবি নিজেদের ওয়েবসাইটে ডিলারদের নাম ও মোবাইল নম্বর প্রকাশ করা থেকে সরে এসেছে। কয়েক দিন ধরে ওয়েবসাইটে শুধু পণ্য বিক্রির স্থান উল্লেখ করা হচ্ছে।
টিসিবির পণ্যের চাহিদা প্রতিদিন বাড়লেও সংস্থাটির কাছে বর্তমানে কী পরিমাণ পণ্য মজুত আছে, তা জানা যায়নি। তবে সংস্থাটির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, একদিকে পণ্য আসছে, অন্যদিকে বিক্রি হচ্ছে। ফলে মজুতের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। তবে ক্রেতাদের দেওয়ার জন্য টিসিবির কাছে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রয়েছে।
প্রতিদিনই প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ পণ্য না পেয়ে ফেরত যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো হবে কিনা- জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, যারা পণ্য না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশ লোক দু-তিনবার করে পণ্য কেনেন। একই লোক প্রতিদিনই পণ্য কেনেন। এদের কারণে প্রকৃত কেউ কেউ পণ্য নাও পেতে পারেন। যারা একাধিকবার পণ্য কেনেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
রমজান উপলক্ষে পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এক কোটি মানুষকে কম দামে টিসিবির পণ্য দেওয়া হবে। তাদের টিসিবির কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডধারীরা পণ্য কিনতে পারবেন। ঢাকার বাইরে কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম চালু করা হবে। তবে ঢাকায় চলমান পদ্ধতিতেই লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে পারবেন ক্রেতারা। সে ক্ষেত্রে বিক্রি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, একজন ক্রেতা যেন বারবার টিসিবির পণ্য কিনতে না পারেন, সে জন্য ক্রেতাদের কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। এটা ভালো দিক। এতে শৃঙ্খলা ফিরবে কিছুটা। তবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থায় তদারকি জোরদার করতে হবে।
চার দিন বাড়ল টিসিবির বিক্রি কার্যক্রম :টিসিবি গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে অষ্টম ধাপে পণ্য বিক্রি শুরু করে। ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা চালু থাকার কথা ছিল। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেটি আগামী শনিবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গতকাল টিসিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

×