দাম বাড়ানোর প্রস্তাবেই খোলা সয়াবিন 'হাওয়া'
প্রতীকী ছবি
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২১:৩৭ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২১:৩৭
বাজারে এক বছর ধরে কয়েক ধাপে সবচেয়ে বেশি যে পণ্যটি ভোক্তাদের ঘোল খাইয়ে ছাড়ছে সেটি ভোজ্যতেল। সর্বশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভোজ্যতেল পরিশোধনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম আট টাকা বাড়িয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তিন সপ্তাহ পর ফের লিটারে ১২ টাকা করে দর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এই প্রস্তাব জানাজানি হওয়ার পরই বাজার থেকে খোলা ভোজ্যতেল রীতিমতো হাওয়া হয়ে গেছে।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশিরভাগ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেল নেই।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ মূল্য ১৬৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৭৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিনের লিটার ১৪৩ টাকা এবং সুপার পাম তেলের দাম ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে বাজারে বোতলজাত তেল নির্ধারিত দামে বিক্রি হলেও খোলা সয়াবিন ও পাম তেল নির্ধারিত দরের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৬৫ থেকে ১৭০ এবং পাম তেলের লিটার ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি করছেন তারা। এই বাড়তি দরের মধ্যেই ফের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদক সমিতি। প্রতি লিটারে ১২ টাকা দাম বাড়ানোর জন্য গত রোববার বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দিয়েছে সমিতি।
ভোক্তারা বলছেন, তেলের দাম আবারও বাড়বে- এমন খবরে ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে রেখেছেন। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোড থেকে কারওয়ান বাজারে শাহিনুর বেগম ও ফাতেমা আক্তার নামের দু'জন গৃহিণী এসেছেন খোলা সয়াবিন তেল কিনতে। সমকালকে তারা জানান, ১৫ থেকে ২০টা দোকানে খোঁজ করেও খোলা সয়াবিন এবং পাম তেল পাননি তারা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, 'ইচ্ছা করে ব্যবসায়ীরা তেল লুকিয়ে ফেলেছেন। বেশি দাম পাওয়ার জন্য তাদের এই ফন্দি।'
তবে খুচরা বিক্রেতারা জানান, দাম বাড়তে থাকায় খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। কারওয়ান বাজারের খুচরা ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী আল-আমিন জানান, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল পাইকারি পর্যায়ে কিনতে হয় ১৬১ টাকায়। বিক্রি করতে হবে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম ১৪৩ টাকায়। এতে লিটারে লোকসান গুনতে হবে ১৮ টাকা। অন্যদিকে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন কেনা যাচ্ছে ১৬০ টাকার কমে। লাভ-ক্ষতির এই হিসাব কষে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করেছেন বলে জানান তিনি।
আর পাইকারদের অভিযোগ, মিলাররা ইচ্ছা করে বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট সৃষ্টি করেছেন। কারওয়ান বাজারের পাইকারি কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মিলাররা প্রতি লিটার খোলা তেলের দাম কত নিচ্ছেন- সেই বিষয়ে তারা স্পষ্ট জানতে পারেন না। এর কারণ হিসেবে তারা জানান, মিলাররা পাইকারদের যে স্লিপ দেন, তাতে মোট দাম লেখা থাকে। কত লিটার তেল, কত দর রাখা হয়েছে সেই বিষয়ে উল্লেখ থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে পাইকারদের বাড়তি দরে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। বাড়তি দরে বিক্রি করে যে পরিমাণ মুনাফা পাওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে জরিমানা করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ গোলাম মাওলা সমকালকে বলেন, কয়েকটি বড় আমদানিকারকের তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সে কারণে বাজারে খোলা তেলের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। তবে একেবারে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন নয়। তেল পাওয়া যাচ্ছে, তবে দাম একটু বেশি।
তিনি বলেন, আমদানিকারকরা তেলের মূল্য বাবদ যে স্লিপ দেন, তাতে কখনই লিটারপ্রতি দর লেখা থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে বারবার অনুরোধ করলেও মিলাররা তা মানছেন না। বিষয়টি কয়েকবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে। তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের এই অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ভোজ্যতেল বিপণনকারী সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, 'দুষ্ট লোকেরা এমনই বলে থাকে। তা ছাড়া মানুষ বোতলজাত তেল না কিনে খোলা তেল কেন কিনবেন?' তিনি আরও বলেন, 'তেলের দাম বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলেই দাম কার্যকর হবে।'
ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর দাবিকে অতিরিক্ত 'দুষ্টামি' বলছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, 'দাম বাড়ানোর আবেদন করলেই দাম বাড়ানো হবে না। গত ৭ ফেব্রুয়ারি যখন প্রতি লিটার তেলের আট টাকা বাড়ানো হয়েছে, তখন তো তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রমজান পর্যন্ত আর দাম বাড়াবে না। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন না।'
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'বিশ্ববাজারে তেলের দাম আজ বেড়েছে। বাড়তি দামের সেই তেল দেশে আসবে আরও দুই মাস পর। তাই এখনই দাম বাড়াতে হবে কেন?'
রমজানের আগে সয়াবিন তেলের দাম বাড়বে না :এদিকে গতকাল রাতে রাজধানীর একটি হোটেল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজিত এক কর্মশালায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়বে না। ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে এসেছিলেন। তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। তবে কত টাকা বাড়াতে চান, সে কথা উল্লেখ করেননি। আমরা তাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেছি। রমজানের আগে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হবে না।'
- বিষয় :
- ভোজ্যতেল
- তেল
- তেলের দাম
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়