সমকালীন প্রসঙ্গ
রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন জরুরি
এম হাফিজউদ্দিন খান
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২১:০৩
যে কোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজে রাজনীতি (সুস্থধারার) কতটা অপরিহার্য এ নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে ইতিমধ্যে নেতিবাচক আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। অথচ অনস্বীকার্য যে, আমাদের রাজনীতির ইতিবাচক দিকটি অনেক ব্যাপৃত এবং আমাদের রাজনীতির অর্জনও কম নয়। কিন্তু তারপরও দুঃখজনকভাবে দেশের রাজনীতিতে জীবনবৈরী অনেক কিছুই ঘটেছে। আমরা বরাবরই বলে আসছি, রাজনীতির দোষত্রুটি রাজনীতি দিয়েই দূর করতে হবে এবং এ জন্য শুদ্ধাচারের রাজনীতি অপরিহার্য। এসব বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে নানা মহলে আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি বটে, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হয়েছে, তা বলা যাবে না। যদি কাজের কাজ সত্যিকার অর্থেই হতো তাহলে এত কদর্যতা ফিরে ফিরে আমাদের সামনে ফুটে উঠত না।
সম্প্রতি রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। তবে এই ঝড় জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, দলীয় পর্যায়ে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের কতিপয় নেতাকর্মীর স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি-অস্বচ্ছতা-অনিয়মের সূত্র ধরে এই ঝড় বইছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তা সাধুবাদযোগ্য। তবে অনেকেই এ নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন যে, শেষ পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযানে তিনি কতটা কঠোর অবস্থানে থাকবেন। এটা সত্য বটে, যদি তিনি দলের নেতাকর্মী পরিচয়ের বিপথগামীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে অনড় থাকতে পারেন, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব শুধু দলীয় ক্ষেত্রে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। তবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেক কিছুই শুরু হয় বটে কিন্তু দলীয় চাপে, স্বার্থে অনেক কিছু থেমেও যায়। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। দলে গণতন্ত্র চর্চার পথ যদি সুগম হতো তাহলে অনেক নেতিবাচকতারই নিরসন ঘটত।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি, আদর্শ, গণতন্ত্রের চর্চা ইত্যাদি নিয়েও নতুন করে কিছু বলার নেই। চরিত্রগত দিক থেকে সবাই প্রায় এক। কোনো দলই গণতন্ত্র চর্চার দিক থেকে পরিচ্ছন্ন নয়। এখন আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যারা রাজনীতির মাঠে সক্রিয় এবং প্রভাব নিয়ে আছে। তাদের বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক দলের চর্চা সেভাবে দৃশ্যমান নয়। সন্দেহ নেই, আওয়ামী লীগের ভিত তৃণমূল পর্যন্ত শক্ত। আওয়ামী লীগ পুরনো রাজনৈতিক দল। কিন্তু সম্প্রতি এ দলের কিছু নেতাকর্মীর কদর্যতা নতুন করে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। এই অভিযানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। দলীয় পদবি ও দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ কেউ বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারে তারা এত বেশি আবর্জনা ছড়িয়েছেন, যা রীতিমতো বিস্ময়কর। যে ক্লাবগুলো ছিল ক্রীড়া-সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র, সেই ক্লাবগুলোতে জুয়ার প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠল। এই ক্যাসিনো অভিযানে এত বিপুল পরিমাণ টাকা একেক জনের আস্তানা থেকে উদ্ধার হলো, তা বিস্ময়কর, যুগপৎ প্রশ্নবোধক বৈকি। শুধু তাই নয়, অবৈধ আরও অনেক কিছুই উদ্ধার হয়েছে এবং তারা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন মহলসংশ্নিষ্ট।
ইতিমধ্যে আটক কেউ কেউ পুলিশ রিমান্ডে এমন সব তথ্য দিয়েছেন, এ যেন বোমা বিস্ম্ফোরণের মতো! নৈতিক স্খলন কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অবৈধ ও বল প্রয়োগে উপার্জিত অর্থের ভাগ-বণ্টন হয়েছে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত। এমতাবস্থায় সম্প্রতি সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, এটাকে অত্যন্ত ইতিবাচক বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করি। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নৈতিকতার ধস কীভাবে নেমেছে তা ভাবলে শুধু বিস্মিত নয়, উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি বিষয় আমাদের বিপথগামী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে পুরনো বিষয়। ছাত্রলীগের বলবানদের দুস্কর্মের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এবার এই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হলো (তাদেরকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়েছে), তা নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের গৌরবময় ছাত্র রাজনীতির অতীত ঐতিহ্য এভাবে দুস্কর্মকারীদের কারণে ম্লান হলো! হলো প্রশ্নবিদ্ধ!

প্রশ্ন হচ্ছে, দু-চারজনকে বহিস্কার করলে কিংবা ধরে বিচার করলেই কি সব পঙ্কিলতা দূর হয়ে যাবে? এর ভেতরে যে আরও গুরুতর সমস্যা রয়েছে, তার কী হবে? বিদ্যমান পরিস্থিতি বলছে, অপরাধ-অপকর্মের ডালপালা অনেক ছড়িয়ে গেছে এবং এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। কাজেই হাত দিতে হবে উৎসে। উৎসে হাত না দিয়ে ডালপালা কেটে লাভ হবে না। শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে আখেরে কোনো সুফল মিলবে না। আবারও এমন দুস্কর্মকারী গজাবে, তারা আবার অন্যায়-অনিয়মের সূত্রপাত ঘটাবে। অর্থাৎ এদের জন্ম যেখানে, সেই আঁতুড়ঘর ভাঙতে হবে। বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রগুলো নিশ্চিহ্ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো বিশৃঙ্খল অবস্থা সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞাত হয়েই শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। এই অভিযানের ভবিষ্যৎ কী, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের স্বস্তিবোধ যে জেগেছে, তা অসত্য নয়। দাপটশালী, অন্যায়কারীদের দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড হোক- এটা সাধারণ মানুষ চায়।
রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে যেভাবে টাকার খনির সন্ধান মিলছে, তাতে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে। অবৈধ টাকা ও ক্ষমতা এ সমাজে কীভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, এর বহুবিধ নজিরই আমাদের সামনে আছে। ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন ইত্যাদি নিয়ে যখন নানা মহলে এত কথা হচ্ছে, তখন উন্মোচিত কদর্যতার দীর্ঘছায়া এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে- কীভাবে বিষবৃক্ষের উৎপাটন করা যাবে? এই বিষবৃক্ষ টিকিয়ে রাখার জন্য আরও নানা রকম শক্তি ক্রিয়াশীল। দেশের সচেতন মানুষমাত্রেরই দৃষ্টি এখন শুদ্ধি অভিযানের দিকে। যদি এই অভিযান সত্যিকার অর্থেই কাঙ্ক্ষিত ফললাভের উদ্দেশ্যে আরও জোরদার হয় তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠবে বলেই মনে করি। রাজনীতিতেও আসবে গুণগত পরিবর্তন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নির্মোহ অবস্থানের কোনোই বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে থেমে যাওয়া কিংবা কোনো রকম অনুকম্পা প্রদর্শনেরও নেই অবকাশ।
দেশের অপরাধজগৎ সম্পর্কে বিগত কয় দিনে নতুন করে সংবাদমাধ্যমে যেসব চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে এ সত্যই ফের প্রতীয়মান হলো, সবকিছুর মূলেই রয়েছে অপরাজনীতি। অপরাজনীতির অপসংস্কৃতি সমাজদেহ বিষিয়ে দিয়েছে। তাই শুভ বোধসম্পন্ন রাজনীতিকদের কাছে প্রত্যাশা- রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে এবং দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থের প্রয়োজনে তারা নতুনভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে অস্বচ্ছতা-দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা নিরসনে নির্মোহ অবস্থান নেবেন। রাজনীতিকরা চাইলে তা নিশ্চয়ই কোনো দুরূহ বিষয় নয়। দরকার শুধু সদিচ্ছা। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের আত্মসমালোচনায় মগ্ন হলে আশা করি, সুন্দর পথ রচনা কোনোই দুরূহ ব্যাপার নয়। দেশের আর্থিক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী, অবৈধ অর্থ উপার্জনকারী বলবান চক্র সবকিছু খুবলে খুবলে খাচ্ছে। তারা দেশ-জাতির মিত্র নয়, হতে পারে না।
রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে যদি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন এবং প্রতিহিংসার বশবর্তী না হয়ে যদি সত্যিকারভাবে বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে অবস্থান নির্ধারণ করেন, তাহলে সুফল না মেলার তো কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই জরুরি কাজটি করার মতো মানসিকতা কতজন পোষণ করেন। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সমালোচনা না করে গঠনমূলক সমালোচনা-আত্মসমালোচনার পথটি মসৃণ করতে দায়িত্বশীলরা মনোযোগ দিন। দেশের সচেতন ও সাধারণ মানুষের মনে তিক্ততার যে পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য কোনো শুভবার্তা নয়। মানুষের হূত আস্থা পুনরুদ্ধারে রাজনীতিকরা যেন তাদের দায়টা ভুলে না যান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- এম হাফিজউদ্দিন খান