সুশাসন
স্বাস্থ্য খাত, দারিদ্র্য ও বাজেট
জাফরুল্লাহ চৌধুরী
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২১ | ১২:০০
প্রশ্ন জাগে, সব নাগরিকের জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিশ্চিত হবে কি? ১৮ মাস আগে সিনোভ্যাক ও স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন আনার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম, তখন গ্রহণ করলে প্রতি ডোজ ২-৪ ডলারে পাওয়া যেত। এখন ৮ থেকে ২০ ডলার দিয়ে কিনতে হবে। আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্টের অধীনে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতায় এর সুবিধা নিয়ে নিজেদের ভ্যাকসিন তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলাম। এতে রয়েলটিসহ উৎপাদন খরচ পড়ত ৫০ সেন্ট থেকে দুই ডলার মাত্র। এই পরামর্শও সরকার নেয়নি।
দুই কোটি সোভিয়েত স্পুটনিক-ভি টিকা পাওয়া যাবে প্রতিটি আট ডলারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কুইক রেন্টাল বাতিল করে দিয়ে যে টাকা সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে সব নাগরিকের টিকার ব্যবস্থা করা যাবে। টিকা মৃত্যু ও সংক্রমণ উভয় কমায় এবং কর্মদক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। তদুপরি সুলভ সুদে সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করার নিমিত্তে বিশ্বব্যাংক ৫০০ মিলিয়ন ডলার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক থেকেও ভ্যাকসিন কেনার জন্য সহায়তা পাওয়া যাবে।
১৯৯৪ সালে এক গবেষণায় বিআইডিএসের গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশে দরিদ্রতা নিরসন না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অত্যধিক চিকিৎসা ব্যয়, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত ও অপচিকিৎসা। পরে বিআইডিএসের বর্তমান মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. জিম ইয়ং কিম তার 'ডায়িং ফর গ্রোথ :গ্লোবাল ইনইকুয়েলিটি অ্যান্ড দ্য হেলথ অব দ্য পুওর' বইতে দরিদ্রতার সঙ্গে স্বাস্থ্যের অন্তর্নিহিত সম্পর্ক উপস্থাপন করেছেন। বিল্ডিং দিয়ে যদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মান নির্ণীত হতো, তবে বাংলাদেশ উচ্চ প্রশংসিত হতো।
দেশে প্রায় অরক্ষিত ৫০০০ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, প্রায় ৪৫০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১৪ হাজার ৩৮৪ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং কয়েকশ জেলা, বিভাগ ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে। কেবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কয়েকজন চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখা যায়, ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন চিকিৎসককে পাওয়া যায় না। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বসবাসকারী ৭০-৭৫ শতাংশ জনগণের ২০ শতাংশ রোগীর ভাগ্যে মৃত্যুর আগেও একজন এমবিবিএস চিকিৎসক দর্শনের সৌভাগ্য হয় না।
শুনতে ভালো লাগে যে, অর্থমন্ত্রী সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যান্সার হাসপাতাল, সব জেলা হাসপাতালে নেফ্রোলজি ইউনিট ও কিডনি সেন্টার, ৩৩টি হাসপাতালে অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ইউনিয়ন পর্যায়ে ১০ শয্যা বিশিষ্ট এমসিডব্লিউসি মাতৃ ও শিশুসেবা কেন্দ্র পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম জেলার বাইরে অন্য সব জেলায় ১০ বছরের কর অব্যাহতির ভিত্তিতে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, অনকোলজি (ক্যান্সার) প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের ২৫০ শয্যার সাধারণ হাসপাতাল এবং নূ্যনতম ২০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরির জন্য দশ বছর আয়কর রহিত করছেন। কিন্তু এগুলো চালাবেন কারা? আমলাদের মতো নিজের গাড়ি উবারে পাঠিয়ে সরকারি চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে অনুপস্থিত থেকে বেসরকারি হাসপাতালে গলাকাটা দরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে বেড়াবেন না তো?
সরকারি হাসপাতালে সব চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে কেবল বরাদ্দ বাড়ালে চলবে না, কতকগুলো মৌলিক পরিবর্তন কার্যকর করতে হবে। নিয়ম করতে হবে কোনো সরকারি চিকিৎসক কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে কাজ করতে পারবেন না। সব অবকাঠামোর উন্নতি করতে হবে, হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রাচীর, গভীর নলকূপ, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন, সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নার্স, টেকনিশিয়ান, ডেন্টিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট ও চিকিৎসকদের বাসস্থান, ছাত্রদের জন্য ডরমিটরি, দুজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের বাসস্থান নির্মাণ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকাকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। বিনা ভাড়ায় বাসস্থান এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসকদের মাসিক দশ হাজার টাকা ইউনিয়নে অবস্থান ভাতা দিলে তরুণ চিকিৎসকরা কর্মস্থলে সর্বক্ষণ অবস্থান করতে আগ্রহী হবেন। চিকিৎসকদের পর্যায়ক্রমে ছয় মাস একাধিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে, পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফায়েড বিশেষজ্ঞে উন্নীত করুন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সর্বক্ষণ সপরিবারে বসবাস সাপেক্ষে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা নন-প্র্যাকটিসিং বিশেষজ্ঞ ভাতার ব্যবস্থা আকর্ষণীয় পদক্ষেপ হবে।
আগামী দশ বছরে ইউনিয়নের লোকসংখ্যা বেড়ে পঞ্চাশ হাজার থেকে সত্তর হাজারে উন্নীত হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রাচীর মেরামত, বাসস্থান নির্মাণ, ৩০ শয্যার হাসপাতাল ও সম্প্রসারিত বহির্বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ৫ শয্যার সিসিইউ/আইসিইউ, প্রসবরুম, ল্যাবরেটরি, ছাত্রদের ডরমিটরি, লাইব্রেরি ও ডাইনিং রুমের ব্যবস্থা বাবদ প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট নির্মাণে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীদের বাসস্থান নির্মাণে চার কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা থাকতে হবে। রেফার করা প্রত্যেক রোগী ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে যাবেন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক কর্মকর্তার মর্যাদা হবে ডেপুটি সিভিল সার্জনের। নবীন চিকিৎসকরা মোটরসাইকেল কেনার জন্য বিনা সুদে ধার পাবেন।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সেবাকে আকর্ষণীয় ও জনকল্যাণকর করার লক্ষ্যে একটি মোবাইল এক্স-রে, ইসিজি, ইকোগ্রাম, আলট্রাসনোগ্রাম, বায়োকেমিস্ট্রি, রক্ত পরিসঞ্চালন মাইক্রোবায়োলজি, হেমাটোলজি অ্যানালাইজার, কার্ডিয়াক মনিটর, ডিফিবরিলেটর, ভেন্টিলেটর এবং সজ্জিত প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে ৫০ রকমের পরীক্ষা করা যাবে। ব্যয় হবে মাত্র চার কোটি টাকা।
কমিউনিটি ক্লিনিকে ৮০০ বর্গফুটের একটি প্রসব কক্ষ, একটি প্যাথলজি ও রক্ত পরিসঞ্চালন রুম ও রোগীর বিশ্রাম কক্ষ নির্মাণ বাবদ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে ব্যয় হবে বিশ লাখ টাকা মাত্র।
বর্তমান বাজেটে ২৫০০ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ২০০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৫০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সজ্জিত করা জরুরি। দ্বিতীয় বছরে বাকি সেন্টারগুলোকে নির্মাণ ও যন্ত্রপাতির জন্য বরাদ্দ দিন। প্রতিবছর তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্য একশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া গেলে সেন্টারগুলো সচল ও সক্রিয় হবে। তবে সব চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ডেন্টিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ হবে জেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নয়।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। পাঁচ লাখ চিকিৎসক সৃষ্টির লক্ষ্যে সব মেডিকেল কলেজে প্রতিবছর বিশ হাজার ছাত্র ভর্তির প্রয়োজন রয়েছে। সাশ্রয় ও উন্নত শিক্ষার জন্য মেডিকেল কলেজের ইউনিট হিসেবে ডেন্টিস্ট্রি ও ফিজিওথেরাপি পরিচালনা করা যুক্তিসংগত পদক্ষেপ হবে। ছাত্রদের ইউনিয়ন পর্যায়ে রেখে শিক্ষাদান করলে ব্যয় হবে বছরে বিশ কোটি টাকা।
ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র
- বিষয় :
- সুশাসন
- জাফরুল্লাহ চৌধুরী