চলচ্চিত্র
রেহানা মরিয়ম নূর: না দেখেই সমালোচনা!
জিমি আমির
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২১ | ১৬:১৪
দেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র মৃতপ্রায়। আর্ট ও বাণিজ্যিক মিশেলে কোনো কোনো নির্মাতা যেসব চিত্র বানান তা শেষ পর্যন্ত দেখার যোগ্য থাকে কমই। অথবা দেখার পরে আপনি ঠাওর করতে পারবেন না, ঠিক কী দেখলেন। মাঝির ছেলে ব্যারিস্টার, স্বামী কেন আসামী বা নাগ-নাগিনীর প্রেমজনিত '৮০ বা ৯০-এর দশকের সিনেমা থেকে এখনও তেমন বের হতে পারেনি বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। অন্তত গত ১০ বছরে দেশের সিনেমার জন্য তৈরি হননি তেমন কোনো নায়ক-নায়িকা বা অভিনেতা-অভিনেত্রী বা বলার মতো চরিত্র! সর্বশেষ মৌসুমী, শাবনূর বা পূর্ণিমা পর্যন্ত দর্শকরা মনে হয় হলে গিয়ে ছবি দেখেছেন। এর পর আর কতজন যান কিনা বা হলে গিয়ে দেখার মতো তেমন ছবি বানানো হয়েছে কিনা, তা নিয়েই অনেক প্রশ্ন তৈরি হবে। আবার কেউ কেউ দেদার টেলিভিশনে সিনেমা মুক্তি দিয়ে সর্বনাশের বীজ বুনছেন।
এখানে একটা বিশেষ 'কিন্তু' রয়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশে যে নায়ক বা নায়িকা তেমন কিছু করতে পারেন না, তিনি আবার কলকাতার ছবিতে ভালো কাজ করছেন। সেগুলো আমরা দেখছি, প্রশংসা করছি। এর মানে কী দাঁড়াল? চরিত্র বের করে আনতে হয়, যেখানে অভিনয়, গল্পকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পরিচালক এসব দেখেন দর্শকের চোখে। আবার এ দেশে কেউ কেউ বিশেষ শ্রেণির জন্য সিনেমা বানান, যা দেখতে অনেক টাকা খরচ করে দামি জায়গায় যেতে হয়। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন, এ দেশের মানুষ তো 'বেদের মেয়ে জোসনা'ই দেখে। তাই যদি হবে, তাহলে এখনও সেসব সিনেমা হচ্ছে, কিন্তু সিনেমা হলে দর্শক কোথায়? তার মানে, এ দেশের আপামর দর্শকের রুচি বদলে গেছে। তা না হলে আকাশ সংস্কৃতিতে ভর করে এ দেশে দেদার বলিউড, দক্ষিণী বা টালিগঞ্জের সিনেমা চলত না। যে সময় 'বেদের মেয়ে জোসনা' তৈরি করা হয়েছিল; সময়ের বিবেচনায় তা পারফেক্ট টাইমিং ছিল বৈকি!
হলিউড বা ব্রিটিশ মুভি বাদ দিন। পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকান। কোথায় চলে গেছে! এখন তৈরি হচ্ছে গল্পনির্ভর সিনেমা। রোমান্টিক সিনেমার বর্তমানের বাদশা শাহরুখ খানের গদি অনেক দিন ধরে নড়বড়। পারফেকশনিস্ট আমির খানকে নিয়ে আগের মতো আলোচনা নেই। টালিগঞ্জেও এখন দুর্দান্ত সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। গল্পের সঙ্গে দর্শক যেন বুঁদ হয়ে থাকেন। প্রধান চরিত্র বা নায়ক-নায়িকানির্ভর করে নয়; গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র দাঁড় করানো হচ্ছে। তাই তো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বেলাশেষে' মানুষ দেখে নেশার মতো। ধাক্কা খেয়ে নায়িকার দেখা বা খলনায়কের রেপের হাত থেকে নায়িকাকে বাঁচাতে নায়ক এসে হাজির হন। এর পর গৎবাঁধা গল্প চলতে থাকে। এসব কাহিনিরও মেয়াদ শেষ হওয়া শুরু করেছে অন্তত '৯০-এর দশকের পর থেকেই।
শেষ ১০ বছরে আমরা শুধু দেখেছি ঢালিউডের পোশাকি পরিবর্তন। গল্পের নামে খিচুড়ি। ফলে স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়েছে একের পর এক সিনেমা হল। এ খাতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। সরকারি অনুদানেও চমক দেওয়ার মতো কিছু থাকে না। তবে কারও কারও আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে ইন্ডাস্ট্রি এখনও সলতের আলো দিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় চরম হতাশার খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আমাদের আরেকবার সুড়ঙ্গের শেষ মাথার আলো দেখালেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। অন্যান্য পরিচালকের মতো নিজের ঢোল বাজানো দূরে থাক, চেহারাই দেখাননি। এখনও অনেকেই জানেন না, তিনি কথা বলতে পারেন কিনা! কারণ, ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশন পাওয়ার পর দেশ-বিদেশের কোনো মিডিয়াকে দেখাও যেমন দেননি, তেমনি আবার দু-একটা মিডিয়ার সঙ্গে শুধু এক বা দুই লাইনের ফরমাল কথা বলেছেন মাত্র।
সিনেমা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সাদ বা রেহানা মরিয়ম নূর নিয়ে যেখানেই যা পেয়েছি, গোগ্রাসে গিলেছি। দেখেছি অভিনন্দন বা প্রশংসার পাশাপাশি আছে নানা ধরনের সমালোচনা। উপমহাদেশে বলিউড যেহেতু দাপট দেখায়, তাই বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড বা জুরি বোর্ড নিয়ে আছে নানা পক্ষপাতিত্বের গল্প। ঠিক সেই মাইন্ডসেট থেকেই এ দেশের অনেক বোদ্ধা আবার বলছেন, এগুলো কীভাবে সিলেকশন হয়, তা নাকি তাদের জানা! কান চলচ্চিত্র উৎসবে এর আগেও বাংলাদেশের সিনেমা গেছে, কিন্তু মূল পর্বে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। সেসব সিনেমার সঙ্গে রেহানা মরিয়ম নূরকে তুলনা করা হচ্ছে। কেউ কেউ তো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, তৃতীয় বিশ্বের এমন স্ট্রাগলিং মেয়ের গল্প ভালো খায় উন্নত বিশ্ব। প্রতিটি জিনিসের আলাদা স্বকীয়তা আছে। কিছুতেই মাথায় আসছে না- কেন রেহানা মরিয়ম নূরকে মাটির ময়নার সঙ্গে তুলনা করতে হবে? তাতে যে দু'জনকেই ছোট করা হয়- সে বোধটাও কি নেই আমাদের বোদ্ধাদের?
গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ১৫ মিনিট) কানের পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের সাল দুবুসি প্রেক্ষাগৃহে 'রেহানা মরিয়ম নূর' প্রদর্শিত হয়। উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও ছিলেন। সিনেমা নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা এ রকম ছিল, সাদ কোনো গ্রামার মেইনটেইন করেননি। পুরো সিনেমা এনজি শটে নেওয়া (ঘাড়ের ওপর ক্যামেরা রেখে)। ফলে প্রতিটি দৃশ্য কেঁপেছে বা ধাক্কা দিয়েছে, যা রেহানার চরিত্রের সঙ্গেই তুলনা করা হচ্ছে।
সিনেমাবিষয়ক বিশ্বের বিখ্যাত নানা মিডিয়াতে রেহানা বা বাঁধনের স্ট্রং অভিনয়ের প্রশংসা করা হচ্ছে। নাম ভূমিকায় অভিনয় করা রেহানার অভিনয়ের প্রশংসাই বলে দিচ্ছে, সিনেমাটি নিশ্চয়ই নিরাশ করবে না। অন্তত দেখার আগে আমরা যে কোনো সমালোচনা থেকে বিরত থাকি। অবশ্য এমন সমালোচনা কিন্তু সিনেমার প্রচারেই কাজে লাগে।
উন্নয়নকর্মী