শ্রদ্ধাঞ্জলি
তোমাকে যেমন জেনেছি
কাজী আফরোজ জাহান আরা
সালমা আখতার
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে একটি পরিচিত নাম কাজী আফরোজ জাহান আরা। গত ৩ অক্টোবর তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। মৃত্যু চিরসত্য। কিন্তু কিছু মৃত্যু এমনই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক; যে হারায় সে-ই তার মর্ম অনুভব করে। শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং বন্ধু হিসেবে আমরা এতই পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম যে, ওকে আমরা সোলমেট বলতাম। লকডাউনের ১৮টি মাস আমরা পরস্পরকে এত সময় দিয়েছি, যা আমাদের সময়কে অসহনীয় না করে আনন্দময় করে তুলেছিল। আমরা তখন ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা। বাইরে যাই না। কিন্তু আধুনিক টেকনোলজিক্যাল ডিভাইসকে কাজে লাগিয়ে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব পরিচিতজন, প্রতিবেশী সবার ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিয়েছি।
আইইআরে আমরা দু'জনেই 'জেন্ডার এডুকেশন' বিষয়ক কোর্স পড়িয়েছি। ফলে যুগে যুগে, শতাব্দী ধরে নারীর অবস্থান, ক্ষমতা, ক্ষমতায়ন (আর্থিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা) পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের প্রাবল্য এখনও কীভাবে নারীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে, তা নিয়ে গভীর আলোচনা হতো। ইদানীং আবার তালেবান শক্তির পুনরুত্থান এবং তার প্রভাব আমাদের দেশের নারীদের ওপর কী হতে পারে- এ নিয়েও চিন্তা ছিল আমাদের মাথায়।
এখনও যে প্রতি কাজে নারী হিসেবে এক ধরনের লুক্কায়িত বাধার সম্মুখীন আমাদের হতে হয় এবং তা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়; তা নিয়ে চলত অবিরাম কথোপকথন। আফরোজ ছিলেন স্পষ্টভাষী, অন্যায়ের প্রতিবাদী। আইইআরের পরিচালক ও প্রশাসক হিসেবে আমি অনেক সময় স্ট্র্যাটেজিকে পরিস্থিতিমুখী করে নিতাম। কিন্তু আফরোজ সরব এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাষী। ফলে আমরা দু'জনই অনেকের প্রিয়ভাজন এবং অপ্রিয় দুই-ই ছিলাম।
উচ্চশিক্ষিত ও অতি সচ্ছল পরিবারের একমাত্র কন্যা রেহানা অর্থাৎ আফরোজকে বাল্যকালেই বিয়ের কনে সাজতে হয়েছিল। ১৭-১৮ বছর বয়সে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালেই বিয়ে হয়। স্বামীর সঙ্গে পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন। কিন্তু কোনো উন্নাসিকতার ছাপ তার মধ্যে দেখিনি। অতি সাধারণ, সাদামাটা কিন্তু রুচিশীল পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-ব্যবহার ছিল।
শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে প্রথমদিকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন আফরোজ। সিন্ডিকেটের নির্বাচিত নারী সদস্য সংখ্যায় তখন খুবই কম। সাহসী, বলিষ্ঠ ও সত্য কথা বলতে ভয় না পাওয়া নারী সদস্য পুরুষপ্রধান সিন্ডিকেটে! নারী শিক্ষকদের জন্য এক গর্বের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নধর্মী কাজ, শিক্ষার উন্নয়ন কাজে তার কণ্ঠ সর্বদাই ছিল গঠনমুখী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সাবেক সদস্য ছাড়াও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সক্রিয় সদস্য, বিভিন্ন সিলেকশন কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। আইইআরের কারিকুলাম কোর্স তৈরি, শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্মে সহায়তা প্রদান- সব কাজে তার অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়।
জীবন কী, কেমন হতে পারে এবং কীভাবে তা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হয়; এর হাতেখড়ি তার অল্প বয়সেই নিতে হয়েছিল। স্বামীর দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে চোখ নষ্ট হওয়ায় গোটা সংসারের আর্থিক দায়ভার ও তিন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব সামলেছেন। এরই মধ্যে স্কটল্যান্ড থেকে 'এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স'-এ উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসেছিলেন। বাবা-মায়ের সাপোর্ট তার এগিয়ে যাওয়ার বড় পাথেয় ছিল।
আমি হতবিহ্বল, হতবাক ও বাক্যহারা। সুদীর্ঘ কর্মজীবনের সহকর্মী, ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব, সর্বোপরি চিন্তা-চেতনা এবং তুলনামূলক আদর্শিক মিল।
কী করে ভুলব তোমায় আফরোজ! জীবন থেমে থাকে না। এগিয়ে চলে এবং চলবে। কিন্তু ক্ষতি কি পূরণ হবে, যে শূন্যতা তুমি সৃষ্টি করে গেলে! এ প্রার্থনাই তোমার জন্য- তোমার সালমা আপার, যে আপার ফোন বাজলেই তুমি ফোন রিসিভ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠতে। আমাদের সম্পর্কটা কতই না গভীর ছিল! কত সুন্দর সময় কাটত আমাদের! সৃষ্টিকর্তা তোমার আত্মার মঙ্গল করুন।
অধ্যাপক; সাবেক পরিচালক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- সালমা আখতার