রাজনীতি
'ধর্মীয়' হেফাজতের 'রাজনৈতিক' সংকট
×
ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০
হেফাজতে ইসলাম মানে ইসলামের হেফাজত বা ইসলামকে সংরক্ষণ করা। হেফাজত শব্দটি আরবি, বাংলায় ভাষান্তর করলে যার অর্থ দাঁড়ায় সংরক্ষণ। যিনি সংরক্ষণ করেন তিনি হাফেজ। আমরা পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা শেষে বিদায়লগ্নে বলি খোদা হাফেজ, মানে খোদা সংরক্ষণকারী। আর প্রকৃতপক্ষে খোদাতায়ালাই হলেন সর্বোত্তম হেফাজতকারী। কেননা আল্লাহপাক নিজেই ঘোষণা করেছেন, 'ওয়াল্লাহু খাইরুন হাফিজান' অর্থাৎ, আল্লাহতায়ালা উত্তম সংরক্ষণকারী। বস্তুত আল্লাহপাক স্বয়ং যা সংরক্ষণ করেন তা সব ধরনের বিপদ-আপদ, বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্ত থাকে। পবিত্র কোরআনকে আল্লাহপাক নিজে সংরক্ষণ করেছেন; তাই এ মহাগ্রন্থ আজও ত্রুটিমুক্ত, নিঃসন্দেহ ও সংরক্ষিত রয়েছে এবং আপন মহিমায় উদ্ভাসিত থেকে তা কেয়ামত পর্যন্ত নির্ভুল থাকবে। কেননা ইসলাম ও পবিত্র কোরআন হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহপাক অন্য কারও হাতে ছেড়ে দেননি। কোথায়, কীভাবে কোরআন পাক সংরক্ষিত ছিল তা আল্লাহপাকই আমাদের জানাচ্ছেন, 'বাল হুয়া কুরআনুম্ মাজিদুন ফি লাউহিম্ মাহ্ফুজ' অর্থাৎ, সেই মহিমান্বিত কোরআন, যা লাউহে মাহ্ফুজে (সুরক্ষিত ফলকে) সংরক্ষিত ছিল (৮৫ :২১-২২)। যারা পবিত্র কোরআন মুখস্থ বা হেফ্জ করেন আমরা তাদের হাফেজ বলি। সুতরাং আমরা দেখতে পাই হাফেজ, হেফাজত, মাহ্ফুজ ও হেফ্জ মূলত কোরআনি শব্দ হিসেবে একই উৎসমূল থেকে নির্গত হয়ে বিভিন্নরূপে তার ব্যবহার হয়েছে। এ শব্দের প্রতিটি রূপের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা একটি ধর্মীয় প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু আমাদের আলোচ্য 'হেফাজতে ইসলাম' বা ইসলামের হেফাজত নামে যা বর্তমানে সমগ্র দেশে একটি সংগঠন হিসেবে এক ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে আলোচিত হচ্ছে- ইসলামপ্রিয় মানুষ হিসেবে তা আমাদের যথেষ্ট উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
শুরুতে হেফাজতে ইসলাম বৃহত্তর চট্টগ্রামের বেসরকারি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র-শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন ছিল; যার আমির হিসেবে মূল নেতৃত্বে ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হজরত শাহ আহমদ শফী। বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১৯৩০ সালে তার জন্ম। স্বীয় পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর তিনি পটিয়ার আল জামি'আতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া জিরি-তে কিছুদিন অধ্যয়নের পর তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে হাটহাজারীর আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুইনুল ইসলামে ভর্তি হন এবং ১০ বছর সেখানে অধ্যয়ন করেন। এরপর ধর্মীয় উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে তিনি চার বছর কৃতিত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন এবং তাফসির ও হাদিস শাস্ত্রের ওপর বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে দেশের সর্ববৃহৎ দ্বীনি এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ও উর্দু ভাষায় তিনি জীবনঘনিষ্ঠ, আর্থ-সামাজিক, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব, হাদিস বিশ্নেষণ, সুন্নাত-বেদআত ও অন্যান্য সমসাময়িক বিষয়ে বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেন। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের অসংখ্য অনুসারীর মাঝে তিনি 'বড় হুজুর' বা 'শায়খুল ইসলাম' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রথিতযশা ইসলামি চিন্তাবিদ হজরত হোসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-এর একজন যোগ্যতর উত্তরসূরি হিসেবেও তিনি সমধিক খ্যাতি অর্জন করেছেন।
তার মতো একজন বুজুর্গ ব্যক্তির নিষ্ঠা, উপদেশ ও স্নেহধন্যে পরিচালিত হেফাজতে ইসলাম গত কয়েক বছরে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ সংশ্নিষ্ট অঙ্গনে অভূতপূর্ব কিছু অর্জন ও সাফল্যের সারথি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমাবার সন্ধ্যায় আলেম ও শতবর্ষী বুজুর্গ আহমদ শফী ইন্তেকাল করেছেন। প্রভাবশালী এ ইসলামি ব্যক্তিত্বের ওফাতের পূর্বাপর যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, মুসলিম হিসেবে এ আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এমন একজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতাকে রাহবারের দায়িত্বে পেয়েও হেফাজতে ইসলামেরই কিছু লোক তার জীবন সায়াহ্নে যে দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলির জন্ম দিল, তা আমাদের শাশ্বত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আর ধর্মীয় চেতনাকে স্তব্ধ করে দেয়।
এ পর্যায়ে হেফাজতের আহমদ শফী পরবর্তী একাল নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যাক। শফী হুজুরেরই ছাত্র হেফাজতের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান আমির মাওলানা জোনায়েদ বাবুনগরী; যাকে নিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বেশ উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। একসময় তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কারও করা হয়, যে প্রক্রিয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী। পরবর্তী সময়ে শফী হুজুরের ওফাতের পর বাবুনগরী আবারও মাদ্রাসায় বহাল হন এবং পাল্টা আনাস মাদানীসহ কয়েকজনকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। আনাসপন্থিরা শুরু থেকেই বাবুনগরী ও তার অনুসারীদের জামায়াতের এজেন্ট বলে প্রচার করছিল এবং প্রতিপক্ষ গ্রুপ আনাসপন্থিদের মাদ্রাসায় অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও সরকারের তল্পিবাহক বলে চিহ্নিত করে।
এরই মধ্যে হেফাজতের সম্মেলন ও নতুন আমির নির্বাচনের জন্য বাবুনগরীর অনুসারীরা উদ্যমী হয় এবং গত ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে দলের একপক্ষের আহূত কাউন্সিলের মাধ্যমে মাওলানা বাবুনগরীকে আমির ও মুফতি নুর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু এ কাউন্সিলে দাওয়াত পাননি প্রয়াত শফী হুজুরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একযোগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নবগঠিত কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং পাল্টা কাউন্সিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে খবর বেরিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আহূত কাউন্সিলে যিনি সভাপতিত্ব করেন, তিনি মাওলানা বাবুনগরীর মামা এবং হেফাজত থেকে পদত্যাগী মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী; তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার মূল মতলবই হলো মাওলানা বাবুনগরীকে আমির নির্বাচিত করা। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে হেফাজতের যে ভাবমূর্তি ছিল, সেটিও এ কাউন্সিলের মাধ্যমে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়; কেননা কমিটিতে কওমি সংশ্নিষ্টতা একেবারেই নেই এমন লোকদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি মুরগির খামারি, ট্রাভেল এজেন্সি বা হজ কাফেলা পরিচালনাকারী ব্যক্তিদেরও হেফাজতের নেতৃত্বে বসানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামের নানা বিষয়ে উচ্চকিত হেফাজত এতদিন অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যে খ্যাতি অর্জন করেছিল, এ কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহ্যও বিনষ্ট করা হয়েছে। নবগঠিত কমিটিতে সরকারবিরোধী অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকে কেন্দ্রীয় উচ্চপদে আসীন করা হয়েছে; যা ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বহু দল-মত ও ভাবাদর্শের বাংলাদেশে ইসলামের উদারনৈতিক মতাদর্শ চর্চা, প্রচার ও প্রসারের মহান ব্রত নিয়ে যে হেফাজতে ইসলাম সামনে এগিয়ে যেতে পারত, তা কি অচিরেই তার নীতি-দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে পার্থিব ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কিনা তা নিকট ভবিষ্যতেই পরিস্ম্ফুট হবে।
চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শুরুতে হেফাজতে ইসলাম বৃহত্তর চট্টগ্রামের বেসরকারি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র-শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন ছিল; যার আমির হিসেবে মূল নেতৃত্বে ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হজরত শাহ আহমদ শফী। বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১৯৩০ সালে তার জন্ম। স্বীয় পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর তিনি পটিয়ার আল জামি'আতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া জিরি-তে কিছুদিন অধ্যয়নের পর তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে হাটহাজারীর আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুইনুল ইসলামে ভর্তি হন এবং ১০ বছর সেখানে অধ্যয়ন করেন। এরপর ধর্মীয় উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে তিনি চার বছর কৃতিত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন এবং তাফসির ও হাদিস শাস্ত্রের ওপর বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরে দেশের সর্ববৃহৎ দ্বীনি এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ও উর্দু ভাষায় তিনি জীবনঘনিষ্ঠ, আর্থ-সামাজিক, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব, হাদিস বিশ্নেষণ, সুন্নাত-বেদআত ও অন্যান্য সমসাময়িক বিষয়ে বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেন। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের অসংখ্য অনুসারীর মাঝে তিনি 'বড় হুজুর' বা 'শায়খুল ইসলাম' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রথিতযশা ইসলামি চিন্তাবিদ হজরত হোসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-এর একজন যোগ্যতর উত্তরসূরি হিসেবেও তিনি সমধিক খ্যাতি অর্জন করেছেন।
তার মতো একজন বুজুর্গ ব্যক্তির নিষ্ঠা, উপদেশ ও স্নেহধন্যে পরিচালিত হেফাজতে ইসলাম গত কয়েক বছরে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কওমি সনদের স্বীকৃতিসহ সংশ্নিষ্ট অঙ্গনে অভূতপূর্ব কিছু অর্জন ও সাফল্যের সারথি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমাবার সন্ধ্যায় আলেম ও শতবর্ষী বুজুর্গ আহমদ শফী ইন্তেকাল করেছেন। প্রভাবশালী এ ইসলামি ব্যক্তিত্বের ওফাতের পূর্বাপর যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, মুসলিম হিসেবে এ আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এমন একজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতাকে রাহবারের দায়িত্বে পেয়েও হেফাজতে ইসলামেরই কিছু লোক তার জীবন সায়াহ্নে যে দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলির জন্ম দিল, তা আমাদের শাশ্বত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আর ধর্মীয় চেতনাকে স্তব্ধ করে দেয়।
এ পর্যায়ে হেফাজতের আহমদ শফী পরবর্তী একাল নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যাক। শফী হুজুরেরই ছাত্র হেফাজতের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান আমির মাওলানা জোনায়েদ বাবুনগরী; যাকে নিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বেশ উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। একসময় তাকে মাদ্রাসা থেকে বহিস্কারও করা হয়, যে প্রক্রিয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী। পরবর্তী সময়ে শফী হুজুরের ওফাতের পর বাবুনগরী আবারও মাদ্রাসায় বহাল হন এবং পাল্টা আনাস মাদানীসহ কয়েকজনকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। আনাসপন্থিরা শুরু থেকেই বাবুনগরী ও তার অনুসারীদের জামায়াতের এজেন্ট বলে প্রচার করছিল এবং প্রতিপক্ষ গ্রুপ আনাসপন্থিদের মাদ্রাসায় অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও সরকারের তল্পিবাহক বলে চিহ্নিত করে।
এরই মধ্যে হেফাজতের সম্মেলন ও নতুন আমির নির্বাচনের জন্য বাবুনগরীর অনুসারীরা উদ্যমী হয় এবং গত ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে দলের একপক্ষের আহূত কাউন্সিলের মাধ্যমে মাওলানা বাবুনগরীকে আমির ও মুফতি নুর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু এ কাউন্সিলে দাওয়াত পাননি প্রয়াত শফী হুজুরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একযোগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নবগঠিত কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং পাল্টা কাউন্সিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে খবর বেরিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আহূত কাউন্সিলে যিনি সভাপতিত্ব করেন, তিনি মাওলানা বাবুনগরীর মামা এবং হেফাজত থেকে পদত্যাগী মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী; তাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার মূল মতলবই হলো মাওলানা বাবুনগরীকে আমির নির্বাচিত করা। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ও অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে হেফাজতের যে ভাবমূর্তি ছিল, সেটিও এ কাউন্সিলের মাধ্যমে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়; কেননা কমিটিতে কওমি সংশ্নিষ্টতা একেবারেই নেই এমন লোকদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি মুরগির খামারি, ট্রাভেল এজেন্সি বা হজ কাফেলা পরিচালনাকারী ব্যক্তিদেরও হেফাজতের নেতৃত্বে বসানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামের নানা বিষয়ে উচ্চকিত হেফাজত এতদিন অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যে খ্যাতি অর্জন করেছিল, এ কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহ্যও বিনষ্ট করা হয়েছে। নবগঠিত কমিটিতে সরকারবিরোধী অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকে কেন্দ্রীয় উচ্চপদে আসীন করা হয়েছে; যা ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বহু দল-মত ও ভাবাদর্শের বাংলাদেশে ইসলামের উদারনৈতিক মতাদর্শ চর্চা, প্রচার ও প্রসারের মহান ব্রত নিয়ে যে হেফাজতে ইসলাম সামনে এগিয়ে যেতে পারত, তা কি অচিরেই তার নীতি-দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে পার্থিব ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কিনা তা নিকট ভবিষ্যতেই পরিস্ম্ফুট হবে।
চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- রাজনীতি