ভারত
বিচারের বাণী যখন সশব্দে কাঁদে
মেজর (অব.) সুধীর সাহা
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০ | ১৫:০২
বিচার পাওয়া আর ন্যায়বিচার পাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। ন্যায়বিচার না পেলে শুধু ভুক্তভোগীরাই কাঁদে না- আইনও কাঁদে, বিচারের বড় বড় বাণীও কাঁদে। আর এই কান্না হয়তো অনেকেই দেখেন না, শোনেন না। কেননা, এই কান্নার আওয়াজ নেই- শুধু অনুভূতি আছে। এমন কান্না বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বে প্রায়ই দেখা যায়। উন্নত দেশে এর অস্তিত্ব অনেকটা কম। সেখানে আইন চলে আইনের নিজস্ব পথে। প্রভাবশালীর প্রভাব বলে যে ধারণাটি তৃতীয় বিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে জানান দেয়, অনেক সময়ই ঠিক সেরকম সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি কালচার উন্নত দেশগুলোতে নেই। আদালত নিজে কথা বলতে পারে না। আইনের কাছে তার হাত-পা বাঁধা থাকে। সামনে সাক্ষ্য-প্রমাণ যা আসে তার ওপরই তাকে নির্ভর করতে হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত থাকে, প্রভাবের সুযোগ থাকে। সেখানে আদালত ও বিচার ব্যবস্থা নিরুপায়। তাইতো সেখানে কখনও কখনও কান্নার আওয়াজ ওঠে সবার চোখের আড়ালেই। বাংলাদেশ সরকারের অনিয়ম, রাষ্ট্রসংস্থার অন্যান্য ধাপের অনিয়ম কখনও কখনও বলা যায়, লেখা যায়; কিন্তু আদালতের বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই চিন্তা করতে হয়- কখন না আবার আদালত অবমাননার দোষ হয়ে যায়। তাই এই খাত নিয়ে খুব একটা বিশ্নেষণ করতে দেখা যায় না।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। প্রায় ২৮ বছর পর লখনৌর বিশেষ সিবিআই আদালতে বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও রামের জন্মভূমি আন্দোলনের সবাই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন। বিশেষ বিচারক সুরেন্দ্র কুমার যাদব অভিযুক্ত ৩২ জনকেই বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে রেহাই দিয়েছেন। কারণ, তাদের দোষী সাব্যস্ত করার মতো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। আদালতের দুই হাজার ৩০০ পাতার রায়ের মূলকথা হলো, ২৮ বছর ধরে তদন্ত চালিয়েও সিবিআই অভিযোগ প্রমাণে তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারেনি। সবাই বেকসুর- শুধু এই সরল-সত্য কথাটি বলতে দু'হাজার পৃষ্ঠা খরচ হয়ে গেল আদালতের!
আদালতের ব্যাখ্যার কয়েকটি দিক ঠিক এমন- ১. অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা, উস্কানিমূলক বক্তৃতা এবং স্লোগান দেওয়ার প্রমাণ মেলেনি; ২. ধর্মীয় উপাসনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। কারণ, বাবরি মসজিদে বহুদিনই নামাজ পড়া হতো না; ৩. সেখানে ১৪৪ ধারা ছিল না। ফলে বেআইনি জমায়েতের অভিযোগ টেকে না; ৪. সিবিআইর পেশ করা ভিডিওতে সিলমোহর ও নিরপেক্ষ সাক্ষীর স্বাক্ষর নেই। কবে, কে, কোথায়, কী অবস্থায় এই ভিডিও তৈরি করেছে তারও উল্লেখ নেই। ফলে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মোট ৪৯ জন অভিযুক্তের মধ্যে বালঠাকরের মতো ১৭ জন অভিযুক্ত আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অবশিষ্ট ৩২ জনের মধ্যে করোনা মহামারির মধ্যে বয়সজনিত কারণে আদভানি, জোশিসহ ৬ জন আদালতে হাজির ছিলেন না। ২৬ জন হাজির ছিলেন। সিবিআই তালিকায় ছিল এক হাজার ২৬ জন সাক্ষীর নাম। ৩৫১ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রথযাত্রার সময় আদভানির বক্তৃতা, সংবাদপত্রের রিপোর্ট, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ক্যাসেট সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে পেশ করা হয়।
ইতোপূর্বে রাম জন্মভূমি এবং বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেন, 'মসজিদ ভাঙা ও ইসলামিক সৌধ ধ্বংস আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন ছিল। অযোধ্যা মামলা চলাকালে মসজিদের গোটা কাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল। সাড়ে চারশ' বছর আগে তৈরি মসজিদ থেকে মুসলিমরা অনৈতিকভাবে বঞ্চিত হয়েছিলেন।' তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমএস লিবেরহানের প্রতিক্রিয়া ছিল, 'আমি তদন্ত করে যা পেয়েছিলাম, বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল না বলে সিবিআই আদালতের সিদ্ধান্ত তার পুরোপুরি বিপরীত। সিবিআইর তদন্ত ও তার পরে যা হয়েছে, তা পুরোপুরি প্রহসন।'
ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ৫ ডিসেম্বর লখনৌর জনসভায় প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেছিলেন, 'আদালত ভজন-কীর্তন বন্ধ করতে বলেনি। কিন্তু সেটি করতে বসার জন্য আগে জমি সমান করা জরুরি।' লালকৃষ্ণ আদভানির বক্তব্য ছিল, 'মন্দির নির্মাণের সংকল্প পূরণের জন্য যেকোনো ত্যাগ করতে রাজি।' ঘটনার ১৫ দিন আগে থেকেই লাখ লাখ লোক অযোধ্যার মতো ছোট শহরে এসে উপস্থিত হন। দিনের আলোতে চড়াও হয়ে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। হাত গুটিয়ে বসে থাকল পুলিশ প্রশাসন। লাখ লাখ জনতার তাণ্ডব চলল শহর জুড়ে। গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন হাজার দুয়েক মানুষ, তার পরও কাউকেই দোষী পাওয়া গেল না! এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত যেখান থেকে, সেখানে কাউকে দোষী পাওয়া গেল না!
বিচারক খুঁজে পেলেন, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ওই ঘটনার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র বা পূর্বপরিকল্পনা ছিল না; গোটাটাই 'হঠাৎ ঘটে যাওয়া' স্বতঃস্টম্ফূর্ত জনরোষের ফল। মোগল আমলের গোঁড়ার দিকে তৈরি বাবরি মসজিদ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো। শত শত মানুষের হাতে ছিল শাবল-গাঁইতি। দিনের আলোতে ঘটনার পুরোটাই সাংবাদিকদের রিপোর্টে ফুটে ওঠে। তা দেখতে পায় পুরো ভারত, পুরো বিশ্ব। শুধু তা দেখতে পেল না সিবিআই, দেখতে পেলেন না সিবিআই আদালতের বিশেষ বিচারক। অভিযোগ প্রমাণিত হলো না। অভিযুক্তদের সবাই বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন। ভাগ্যিস আদালত বলেননি, বাবরি মসজিদ ভাঙাই হয়নি!
ভারতের ইতিহাসে এই রায় কীভাবে বিবেচিত হবে তা বলে দেবে আগামী দিনের ভারত। তবে আজ এটা সহজেই বলা যাচ্ছে- বিচারের বাণী নিভৃতে নয়, সশব্দে কেঁদেছে নিশ্চয়ই। তা আজ ভারতের অনেকেই দেখতে পাচ্ছে না বলে মিথ্যা হয়ে যাবে না। বাবরি মসজিদ এবং অযোধ্যার মানুষ ন্যায়বিচার পেল কিনা তা সম্ভবত জিজ্ঞেস করার কোনো সুযোগ নেই। তা সবাই বোঝেন, কিন্তু আদালতের রায়ের ওপর তো কোনো কথা নেই!
কলাম লেখক
ceo@ilcb.net
- বিষয় :
- ভারত
- মেজর (অব.) সুধীর সাহা