সমাজ
সেদিনের গরুর রচনা এখন 'ভারত রচনা'
মেজর (অব.) সুধীর সাহা
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৪:৪৭
নবম-দশম শ্রেণিতে এবং পরে এসএসসি পরীক্ষায় 'গরু' নিয়ে রচনা লেখার বিষয়টি বেশ কমন ছিল আমার পড়াশোনাকালে। প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই গরুর রচনা খুব ভালো করে মুখস্থ করে ফেলত- যদি পরীক্ষায় আসে! অনেক সময়ই কমন পড়ে যেত। আবার কখনও কখনও কমন পড়ত না। যদি গরুর রচনা প্রশ্নপত্রে না থাকত এবং যে রচনা লিখতে বলা হয়েছে তা আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া না থাকত, তবে অনেকেই গরুর রচনাটি পরোক্ষভাবে কাজে লাগিয়ে দিত। ধরে নিন, রচনা লিখতে বলা হলো 'বর্ষাকাল'। ছাত্রটি রচনাটি শুরু করেই ঘুরেফিরে চলে যাবে বর্ষার নদীর ঘাটে। তারপর লিখত 'নদীর ঘাটে সব সময়ই দেখা যায় গরুকে গোসল করাচ্ছে গ্রামের কৃষক'। এরপর সোজা চলে যেত গরুর ওপর বর্ণনা দিতে। ছাত্রটি পুরো গরুর রচনা লিখে পরম তৃপ্তিতে পরীক্ষার হল থেকে হাসি মুখে বেরিয়ে আসত। তা ছিল কিশোর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের হযবরল সিদ্ধান্তের অংশ। কিন্তু আজ- অনেক বছর পর। আজও যদি সমাজে তেমন ঘটনাই দেখি, তাহলে হাসি না পেয়ে তো কান্না পাওয়ারই কথা। তা-ও আবার যারা কাজটি করছেন তারা কিশোর বয়সী নন, রীতিমতো যৌবনপ্রাপ্ত কিংবা বৃদ্ধ বয়সী।
ইদানীং নিশ্চয়ই আমার মতো অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, বাংলাদেশের একদল লোক আছেন, যারা কোনো কিছু হলেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রথমে সরকারকে দায়ী করা শুরু করেন। তারপর ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে, তারপর সংখ্যালঘু বিষয়কে এবং সবশেষে ভারতকে দায়ী করা শুরু করেন। ভারত, আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী, সংখ্যালঘু ইত্যাদি বিষয় একসঙ্গে গুলিয়ে বড়ি বানিয়ে সমাজকে খাওয়ানোর প্রবণতা তাদের মধ্যে। চীন এবং ভারত হঠাৎ করেই জড়িয়ে পড়ে সীমান্ত বিবাদে। বাংলাদেশের মানুষের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। কেননা, তা সম্পূর্ণই ভারত এবং চীনের বিষয়। কিন্তু একদল লোকের সেখানে দারুণ মাথাব্যথা। সামাজিকমাধ্যমে তারা ঝড় তোলেন। শুরু করে চীন-ভারত নিয়ে এবং শেষ করে ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদি আহ্বান জানিয়ে।
করোনাকালীন অনলাইন যোদ্ধা তারা। বিভিন্ন অনলাইন লাইভ প্রোগ্রামে তাদের বাহাদুরির শেষ নেই। কোনো পুলিশ সদস্য হয়তো অপরাধ করলেন, অন্যায়ভাবে কাউকে শাস্তি দিতে গিয়ে সমাজে অস্থিরতার সুযোগ করে দিলেন- এবার শুরু হয়ে গেল তাদের অনলাইন যুদ্ধ। সংশ্নিষ্ট পুলিশকে নয়, শুরু করেন পুলিশ বাহিনী নিয়ে। তারপর ইনিয়ে-বিনিয়ে নিয়ে আসেন ভারত প্রসঙ্গ। ভারত আমাদের সরকারকে হাতের মুঠোয় বন্দি করে রেখেছে, আমরা একেবারে মরণদশায় পড়ে আছি; ভারতের হাত থেকে আমাদের রক্ষা পেতেই হবে ইত্যাদি। এসব অনলাইন প্রোগ্রাম মূলত বাংলাদেশের বাইরে থেকে প্রচারিত এবং পরিচালিত হয়। পরিচালক এবং বক্তা সবাই বড় বড় কথা বলে দেশ উদ্ধার করতে চান। মনে হয়, তারা যেকোনো সময়ে সরকারকে ফেলে দেবেন। তারা যেন যেকোনো সময়ে যুদ্ধ করে ভারতকে পরাভূত করে ফেলবেন।
আমি ঠিক বুঝি না, তাদের এত রাগ কেন? তাদের রাগ ঝাড়ার একমাত্র পথ অনলাইন আলোচনা। দেশ, সরকার, সমাজ- এসবের বিরুদ্ধে কথা বলে তারা বেশ আমোদ লাভ করেন। সরকারের বিরুদ্ধে তেমন জোরালো বক্তব্য না পেলে তারা সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে জুড়ে দেয় ভারতের সঙ্গে। সরকারের বিভিন্ন অফিসে, গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন অফিসে নাকি ভারতের গোয়েন্দারা রীতিমতো সশরীরে অফিস করে বেড়াচ্ছেন। ইউটিউবে গেলে আপনারা শুনতে পারবেন অনেকের গালভরা হুঙ্কারের ধ্বনি। আমি কিন্তু তাদের মধ্যে আমার কিশোর বয়সে দেখা ছাত্রছাত্রীর সেই ছায়াই দেখি। তখন তাদের মুখস্থ ছিল গরুর রচনা, আর এখন তাদের মুখস্থ 'ভারত' রচনা। যে করেই হোক, ভারতকে আঘাত করতেই হবে। তাই তারা বাংলাদেশের যেকোনো ঘটনাকে ব্যক্ত করতে গিয়ে মুখস্থ করা ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটনার চিত্র অঙ্কন করেন। তাই বাংলাদেশের রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলেও যেন ভারতের দোষ। মোট কথা, সমস্যা কিংবা বিষয় যা-ই থাকুক কিংবা যতটাই অভ্যন্তরীণ থাকুক, দেশের যেকোনো বিষয়ের মধ্যে ভারতকে টেনে আনতেই হবে। যেহেতু বাংলাদেশের সরকারপ্রধান অসাম্প্রদায়িকতার কথা জোরেসোরে বলেন, তাই তাদের যেকোনো কাজের সঙ্গে এমন গরুর রচনা লেখার লোকগুলো খুব সহজেই সংখ্যালঘু কিংবা ভারতকে টেনে আনতে আনন্দবোধ করেন। তখন তারা ভারতকে বানিয়ে ফেলেন হিন্দুরাষ্ট্র। ভুলেই যান, সেখানে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কত।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী। সংস্কৃতি, ভাষা এসবেরও মিল বেশি। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা লাভে ভারত যেভাবে সাহায্য করেছে, কৃতজ্ঞতার ভাষা নেই তার সঠিক মূল্যায়ন করার। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেই ভারত তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি; প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে তারা প্রায় এক বছর আশ্রয় দিয়েছিল, অন্ন দিয়েছিল। কিন্তু যারা এমনসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের কাছে এসব যুক্তি মানেই ভারতের দালালি করা। ভারতের দালাল, ভারত আমাদের দেশটা খেয়ে ফেলেছে ইত্যাদি না বললে যেন তাদের মনের ঝাল মেটে না। আসলে তারা সরকারকে দোষ দিয়ে, সংখ্যালঘু বিষয় টেনে এনে, ভারতকে গালমন্দ করে ঠিক কী বোঝাতে চান- তা সম্ভবত নিজেরাই ঠিকমতো জানেন না। সরকারবিরোধী হতে হবে, ভারতবিরোধী হতে হবে- তারা এটুকুই বোঝেন। তাতে কোনো যুক্তি আছে কিনা এবং তাতে নিজের দেশের কতটা ক্ষতি করছেন, সে বিষয়ে চিন্তা করার চেষ্টাও তারা করেন না।
যুক্তিবাদী হওয়ার প্রয়োজন আছে আমাদের। দেশেই থাকি আর বিদেশেই থাকি, নিজের দেশকে ভালোবাসার অধিকার এবং দায়িত্ব দুটিই আছে প্রতিটি নাগরিকের। সেখানে একচোখে একপাশ দেখে গরুর রচনা মুখস্থ করার মতো ভারত নিয়ে, সরকার নিয়ে মুখস্থ বিশ্বাসকে উগড়ে দিয়ে আর যাই হোক, দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করা হয় না। এতে আন্তর্জাতিক সমাজে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে ভারত বহুদিন বাংলাদেশকে বাঁকা চোখে দেখত, সেই ভারতের সঙ্গে বর্তমান হাসিনা সরকার বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আস্থাপূর্ণ একটি স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ হয়েছে। কেননা, ভারত আমাদের পাশের সবচেয়ে বড় দেশ। সেই হিসাবে জল ঢেলে দিয়ে দেশের ক্ষতি করার নাম দেশপ্রেম নয়। এটুকু বোঝার জ্ঞান তাদের থাকা প্রয়োজন।
কলাম লেখক
ceo@ilcb.net
- বিষয় :
- সমাজ
- মেজর (অব.) সুধীর সাহা