ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

হেফাজতিদের 'হেফাজত' করবে কে?

হেফাজতিদের 'হেফাজত' করবে কে?
×

নূরুর রহমান খান

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:০৭

একাত্তরের পরাজিত হায়েনার দল নবরূপে নখ-দন্ত বিস্তার করে বিকট অবয়বে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই জ্ঞানপাপীরা সব সময়ই ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এরা সব সময়ই স্বার্থান্বেষী ক্ষমতাগ্রাসী রাজনৈতিক দলের সমর্থন-সহযোগিতা পেয়ে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান যে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেন, সেটিতে জল সিঞ্চন করে তাজা করে তোলেন তারই সহযোগী এইচ এম এরশাদ- বাংলাদেশের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করে। এরই জোরে শ্বাপদেরা মাথা তোলার সাহস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মুখবর্তী চৌরাস্তার মোড়ে প্রস্তাবিত ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা জিয়ার নিযুক্ত ডিসিএমএলএ তোয়াবের নির্দেশে স্থগিত করা হয়। হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য হেফাজতিদের দাবির মুখে সরানোর ফলে এই দুর্বৃত্তরা আশকারা পায়। তখনই কঠোর হস্তে এদের দমন করলে আজকের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের নমনীয় নীতিও অগ্রহণযোগ্য। সরকার কঠোর হলে এরা জলসা-মাহফিলের নামে সাম্প্রদায়িকতার উন্মাদনা ছড়াতে পারত না। প্রথমদিকে তথাকথিত মাহফিলে মিনমিনে সুরে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকে। ক্রমশ এদের কণ্ঠস্বর হয় উচ্চতর। তারা এতটাই বেপরোয়া যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার মতো ধৃষ্টতা প্রদর্শনেও পরান্মুখ নয়। এদের পূর্বগামীরা পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ এবং আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল।

মনন, চিন্তন ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা তিনটি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী- দেশজ, ধর্মীয় ও পারিবারিক। ধর্ম ও সংস্কৃতি সমার্থক নয়। ধর্ম সংস্কৃতির একটি অংশমাত্র। বিভিন্ন মতাবলম্বীরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালনের অধিকারী। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানেও সবার জন্য এই অধিকার সংরক্ষণের অঙ্গীকার ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়সম্পত্তি-বাড়িঘরই যেন তাদের পরম শত্রু। এরই লোভে সমাজ-শত্রুরা তাদের ঘরছাড়া করছে।

একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি-জাতীয়তার জিগির তুলে তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টায় আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভাস্কর্য বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্রীদের সংস্কৃতির অর্থ বা তাৎপর্য সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান থাকলে এ ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত হতো না। ১৯৩৯-এর ১৪ মে 'সিল্‌হেট্‌ মুসলিম সাহিত্য সংসদ'-এর বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে সৈয়দ মুজতবা আলী স্মরণ করিয়ে দেন আরব সভ্যতা ও মুসলিম সভ্যতা অভিন্ন নয়। একটি আরবদের নিজস্ব সম্পদ, তার উদ্ভব আরব ভূখণ্ডেই এবং এর মাধ্যম আরবি ভাষা। উল্লেখ্য, আরবের ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলমান সবারই মাতৃভাষা আরবি- যেমন বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের মাতৃভাষা বাংলা। মুজতবা আলী বিষয়টি সহজভাবে বুঝিয়ে দেন যে, বিজয়ী আরব বিজিতের সহযোগে স্পেন থেকে মালয়, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তুর্কিস্থান পর্যন্ত যে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল তার সমষ্টিই হচ্ছে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি। মুজতবা আলী অন্যত্র মনে করিয়ে দিয়েছেন, আরবরা চারশ বছর ইরানকে শাসন করেছে। বিজিত ইরান বিজয়ী আরবের ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি।

১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর দুই-চারজন ধর্ম ব্যবসায়ী ও ফেরেববাজ রাজনীতির ধ্বজাধারী একটি অনভিপ্রেত প্রশ্ন তুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার বিফল চেষ্টা করেছিল। আমাদের জাতীয় সত্তার ভিত নষ্ট করার অপচেষ্টায় মেতেছিল। তাদের প্রশ্ন আমরা বাঙালি? মুসলমান, নাকি অন্যকিছু? এদের জবাব দিয়ে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বাঙালির স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় তুলে ধরেছেন- 'আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।'

সোজা কথায় আমরা যে দেশেই থাকি না কেন, আমাদের ধর্ম-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের পরিচয় একমাত্র বাঙালি হিসেবেই। এতে ফাটল ধরাতে চাচ্ছে একটি মহল। এরাই ধর্মের নামে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য ভাস্কর্য বিনষ্ট করার দুঃসাহস করছে। বাঙালি যাদের নিয়ে গর্ব করতে পারে, তাদের চিত্র-ভাস্কর্য এদেশে স্থাপিত হবেই। এই বরেণ্যজনদের মধ্যে বিদ্যাসাগর, মাইকেল, সুভাষ বসু, রবীন্দ্রনাথ, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু, বেগম রোকেয়া, জীবনানন্দ, জয়নুল আবেদিন, জসীম উদ্‌দীন, সুফিয়া কামাল তো থাকবেনই। যারা এসব বিনষ্ট করার অপচেষ্টায় জড়িত তাদের জন্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রদর্শিত 'অহিংসা পরম ধর্ম' দাওয়াই প্রয়োগই সর্বোত্তম ব্যবস্থা। 'পরিব্রাজক' গ্রন্থে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলে ভয়ংকর দর্শন দেয়ালচিত্র দেখে স্বামীজি একটি চুটকি পরিবেশন করেছেন- "... এক 'অহিংসা পরম ধর্মে'র বাড়িতে ঢুকেছে চোর। কর্তার ছেলেরা তাকে পাকড়াও করে বেদম পিটছে। তখন কর্তা দোতলার বারান্দায় এসে গোলমাল দেখে, খবর নিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, ওরে মারিসনি, মারিসনি; 'অহিংসা পরম ধর্ম।' বাচ্চা অহিংসারা মার থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, 'তবে চোরকে কী করা যায়?' কর্তা আদেশ করলেন, ওকে থলিতে পুরে জলে ফেলে দাও।"

এই বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন করতেই হবে। এ কাজে সরকার গাফিলতি কিংবা 'সময়ক্ষেপণ' নীতি গ্রহণ করলে জনসাধারণই এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করবে। জাতির পিতার অমর্যাদা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। যদি পালের গোদারা জনতার হাতে পড়ে তাহলে 'থলি দর্শন'ই হবে তাদের উপযুক্ত প্রাপ্য- যাতে এহেন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করার দুঃসাহস কারও না হয়। তবে দেশের মঙ্গলের জন্য এ কাজটি সরকারের এখতিয়ারে থাকাই ভালো। ভাস্কর্য এবং চিত্রাঙ্কন পৃথিবীর অন্যতম শিল্পকলা। সৌদি আরব তথা মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া অর্থাৎ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যের অভাব নেই। এই অপশক্তিকে যদি নির্মূল করা না হয় তাহলে এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বন্ধ করার দাবি তুলবে। কারণ, চারুকলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত বিভাগগুলো হচ্ছে- অঙ্কন ও চিত্রায়ণ, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প ইত্যাদি। তাদের স্থ্থূলবুদ্ধিতে 'মৃৎশিল্প' 'প্রতিমা নির্মাণ বিভাগ' মনে হতে পারে। পর্যায়ক্রমে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যানস স্টাডিজ, সংগীত, নৃত্যকলা প্রভৃতি বিভাগের মধ্যেও অনৈসলামিক গন্ধ আবিস্কার করবে। এর পরে বলবে রবীন্দ্রসংগীত, নববর্ষ উদযাপন, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নবান্ন উৎসবও ধর্মবিরোধী সংস্কৃতি! বাংলা গানের একটি সমৃদ্ধ ধারা কীর্তন ও শ্যামাসংগীত কুফরি গান- বেদাত! চরিত্র সাফ-সুতরো রাখবার জন্য 'সহশিক্ষা' চলবে না। বায়নার আর সীমা থাকবে না।

একাত্তরের পর্যুদস্ত শক্তিকে চিরতরে উচ্ছেদের লক্ষ্যে সরকারের আশু কর্তব্য : ১. সংশোধন ব্যতিরেকে ১৯৭২-এর সংবিধান পুনর্বহাল। ২. মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বাঙালি ও বাংলাদেশ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা। সে সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ইতিহাস অবশ্যই পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে। অর্থাৎ মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব বিকাশের লক্ষ্যে যুগোপযোগী পাঠক্রম প্রণয়ন ও আবশ্যিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। ৩. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতির পিতার প্রমাণ সাইজের ছবি টানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৪. স্কুল ও মাদ্রাসায় ক্লাস শুরুর আগে 'অ্যাসেম্বলিতে' শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা এবং প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দান করতে হবে। ৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ বিশেষ দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আমরা চাই সেই ধরনের 'মাদ্রাসা' অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- যেখানে প্রকৃত মানবিক গুণ সমৃদ্ধ 'আলেম' তৈরি হবেন। তিনিই 'আলেম' যার 'এলেম' অর্থাৎ জ্ঞান আছে। কুশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত তমসাচ্ছন্ন ব্যক্তি নয়- একজন আলোকিত মানুষই সমাজের গৌরব, দেশের সম্পদ; সবার সম্মানের পাত্র- দয়া বা অনুগ্রহজীবী নন।

প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×