ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফিরে দেখা

বোয়ালিয়া ঘাটের যুদ্ধ

বোয়ালিয়া ঘাটের যুদ্ধ
×

শেখ ইউসুফ হারুন

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:৩৪

বোয়ালিয়া খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত গ্রাম। শিবসা নদী কপোতাক্ষ নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এ গ্রামের পশ্চিম দিকে। উভয়ের মিলিত স্রোতে সৃষ্টি হয়েছে বালুচর। ভাটির সময় চর জাগলে এলাকার ছেলেরা জোয়ার আসার আগ পর্যন্ত ফুটবল খেলে। নদীর পশ্চিমপাড়ে রাড়ুলী গ্রাম বিখ্যাত রসায়নবিদ স্যার পিসি রায়ের জন্মস্থান। নদীর পাড়জুড়ে কেওড়া, গেওয়া, হরগোজা ও গোলপাতা গাছের বাগান। বড় বড় কেওড়া গাছে দিনের বেলা বাদুড়ের বাস। বাদুড়ের অভয়ারণ্য। জোয়ারের সময় নদীর পানি দু'কূল ছাপিয়ে কেওড়া ও গোলপাতা বনে ঢোকে। গ্রামের উত্তরদিকে বিল এবং দক্ষিণে বিএডিসির বীজ বর্ধন খামার। পূর্বদিকে হিতামপুর ও মেলেকপুরাইকাটি গ্রাম। কপোতাক্ষ ও শিবসা নদীর সংযোগস্থলে বোয়ালিয়া খেয়াঘাট, নদীর দু'পাড়ের গ্রামের লোকজনের পারাপারের একমাত্র অবলম্বন। কপোতাক্ষ নদ সে সময় প্রলয়ঙ্করী বোয়ালিয়ার পাড় ভাঙছে আর রাড়ুলীর পাড় গড়ছে। জেলেদের ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে চলে গেছে অনেকবার। প্রতিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়েছে। নতুন করে বেঁচে থাকার আশায় ঘর বেঁধেছে আবার। এখন তা মৃতপ্রায়। ভাটির সময় হেঁটেই পার হওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ২৫ মার্চের পর গ্রামের যুবকদের মধ্যে টিপু, সাবু, রওশন, ফক্কা, আহাদউল্লা, শামসুদ্দীন, কাশেম, মাছি খোকনসহ অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তবে এ গ্রামের কেউ রাজাকারের তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ করেনি। দু'একজন শান্তি কমিটিতে নাম লেখালেও তারা গ্রামে তেমন অত্যাচার করেনি। গদাইপুর-হিতামপুর সড়কের উত্তরদিকে হিন্দুপাড়া। হিন্দুরা মুসলিমদের চেয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল। তারা মূলত ব্যবসায়ী। স্থানীয় এবং দূরবর্তী হাটে কাপড়, মিষ্টি, হলুদ, মাটির হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদি বিক্রি করে বেশ টাকা-পয়সা অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে হিন্দুরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। একদিকে মাতৃভূমির টান, অন্যদিকে পরিবার-পরিজন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ঠিক এমন সময় স্থানীয় কতিপয় দুর্বৃত্ত গভীর রাতে হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করে। এতে তাদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। এর পর হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী হিসেবে ভারতে গমন করে। হিন্দুপাড়ার বাড়িঘর যেন খাঁ খাঁ মরুভূমি। এই বাড়িঘর একদিন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল। আজ সেখানে শিয়াল, বেজি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। দেশমাতৃকার টানে মালোপাড়ার জেলেরা বাসস্থান ত্যাগ করেনি। তারা অত্যাচারিত হয়েছে বারবার।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। যুদ্ধ শুরু হলে বাবার কর্মস্থল থেকে নানাবাড়ি হিতামপুরে চলে আসি। পড়ালেখা নেই। দুরন্তপনাই একমাত্র কাজ। নারিকেলপাড়া, নদীর চরে মাছ ধরা, গুলতি দিয়ে পাখি মারা, জেলেদের নৌকা দিয়ে নদী পাড়ি দেওয়া, নদীতে সাঁতার কাটা, নদীর চরের কাদায় স্লাইডিং করা, বালুচরে ফুটবল খেলা, পাখির বাসা খোঁজা- এগুলোই ছিল দুরন্তপনার উদাহরণ। সে সময় পাড়ার ছেলেদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। এক দলকে মুক্তিযোদ্ধা ও অন্য দলকে রাজাকার বানিয়ে এ খেলা চলত। তবে কেউ রাজাকার হতে চাইত না। আমার মা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন, কখন কী হয়। বাবা বন বিভাগে চাকরি করতেন। তাই খানসেনারা তাকে গানবোটে আটকে রাখে সুন্দরবনের পথ চেনার জন্য। বহুদিন তাকে আটক রেখেছিল। যখন মুক্তি পান, তখন বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।

১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমি, আমার ভাই ইলিয়াস ও খালাতো ভাই ইকবাল মাছ ধরার জন্য নৌকাঘাটে যাই। নদীর চরে মাছ ধরতে নামি। তখন সকাল ১১টা। পাটকেলঘাটা থেকে খুলনাগামী লঞ্চ আসার সময় তখন। দূরে শব্দ শুনলাম লঞ্চ আসার। এমন সময় শোনা গেল চিৎকার এবং গুলি। বুঝলাম, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তখন আমরা শিখেছি যুদ্ধ শুরু হলে 'ক্রলিং' করে যেতে হয়। না হলে মাথায় গুলি লাগে। আমরা 'ক্রলিং' করে এগোচ্ছি। দু'দিক থেকে গোলাগুলি হচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বায়ু ভেদ করে শাঁ শাঁ করে গুলি যাচ্ছে। অনেকক্ষণ এ রকম গোলাগুলি চলল। আমরা ক্রলিং করে জ্ঞান বাবুর (জ্ঞানেন্দ্রনাথ সাধু) বেড়ের হলুদ বাগানের মধ্যে পৌঁছলাম। যখন হলুদ ক্ষেতের মধ্য দিয়ে ক্রলিং করে চলছি, তখন দূরে অন্যদিকে পরাজিত রাজাকাররাও ক্রলিং করে পালিয়ে যাচ্ছে। হলুদ ক্ষেত নড়ছে। আমাদের অংশে হলুদ ক্ষেত নড়া দেখে তারা 'মুক্তিযোদ্ধা এসেছে' ভেবে ক্রলিং বাদ দিয়ে ভোঁ দৌড়। যা হোক, আমরা এভাবেই বাড়িতে পৌঁছলাম। মা কান্নাকাটি করছেন। আমাদের পেয়ে যেন চাঁদ হাতে পেলেন। তখনও থেমে থেমে গুলি চলছে। আমার নানা বারান্দায় খাটে শুয়ে আখ খাচ্ছেন। অনেকটা নির্বিকার। অন্যরা মাটির দেয়ালের নিচে আশ্রয় নিয়ে মহান আল্লাহকে স্মরণ করছেন।

মূল ঘটনা হলো, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাজাকার ক্যাম্প ছিল কপিলমুনি বাজারে বিনোদ বিহারী সাধুর বাড়িতে। প্রায় দেড়শ জন রাজাকার সেখানে থাকত। তাদের অত্যাচারে এলাকার জনসাধারণ অতিষ্ঠ। খুন, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপকর্মে তারা সিদ্ধহস্ত। ঘটনার দিন পাটকেলঘাটা-খুলনাগামী লঞ্চে কপিলমুনি থেকে কতিপয় রাজাকার লঞ্চে উঠে পাইকগাছার দিকে রওনা হয়। তারা লঞ্চের দু'দিকে বালুর বস্তা দিয়ে নিরাপত্তাবূ্যহ তৈরি করে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল বাঁকায় দিলীপ বসুর বাড়িতে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ সংবাদ পেয়ে সঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধা আইনুদ্দীন, খোকন, মোকছেদ, হান্নান, সোহরাব, আকামত, আমির আলী, ফয়জুল্লাহ্‌সহ ১১ জনকে নিয়ে রাড়ুলী খেয়াঘাটের দিকে রওনা হন। মুক্তিযোদ্ধারা ওয়াপদা বাঁধের নিচে তিনদিকে অবস্থান গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে লঞ্চটি বোয়ালিয়া ঘাটের কাছাকাছি জেলেপাড়ার মন্দিরের কাছে এলে কমান্ডার লঞ্চটি থামানোর জন্য চিৎকার করে নির্দেশ দেন। লঞ্চটি না থেমে চলতে থাকলে তিনি এসএমজি দিয়ে ফায়ার শুরু করেন। সারেং জীবন রক্ষার্থে লঞ্চটি জোরে চালিয়ে চলে যেতে থাকলে বোয়ালিয়ার পাড়ে মন্দিরের কাছে চরে আটকে যায়। রাজাকাররা লঞ্চের বালুর বস্তার ফাঁকে বসে মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও লঞ্চটি লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকে। রাজাকারদের কয়েকজন আহত হয়। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর রাজকাররা টিকতে না পেরে লঞ্চ থেকে নেমে বেড়িবাঁধের নিচে অবস্থান নিয়ে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু তাদের সঙ্গীয় রাজাকাররা আহত হওয়ায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অনড় অবস্থানের কারণে তারা রণে ভঙ্গ দিয়ে কপিলমুনির দিকে রওনা দেয়। আহতদের মধ্যে দু'জন মৃত্যুবরণ করে। মৃত ও আহতদের গরুর গাড়িতে করে তারা দ্রুত কপিলমুনি চলে যায়।

যুদ্ধ শেষ। মুক্তিযোদ্ধারা বীরদর্পে নদী পার হয়ে বোয়ালিয়ার পাড়ে এসে লঞ্চটি অনুসন্ধান করার সময় রাজাকারদের রক্তের দাগ দেখতে পায়। আমরাও যুদ্ধ শেষে নদীর পাড়ে যাই এবং দেখি লঞ্চটি মন্দিরের কাছে মাটিতে আটকানো অবস্থায়। আমার মাছুম মামা শ্যামাপদ বিশ্বাসের বাড়ির কাছ থেকে মাথার খুলির খণ্ড অংশ উদ্ধার করেন। শুনেছি, রাজাকারদের গুলিতে ওপারে কেওড়া গাছের বিপুল সংখ্যক বাদুড় মারা গেছে। বড় মামার বাড়ির গোলপাতা ভেদ করে একটি গুলি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সেটি অনেক দিন আমাদের সংগ্রহে ছিল। গ্রামের যুবক-যুবতীদের মধ্যে আনন্দ আর ধরে না। সবাই মিলে চিৎকার দিয়ে ওঠে- 'জয় বাংলা'।

এর পরের ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক। রাজাকাররা বোয়ালিয়া ঘাটের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়ে ওঠে। ১৯ সেপ্টেম্বর খানসেনারা গানবোটে এবং রাজাকাররা লঞ্চে বাঁকা বাজারের কাছে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা কমান্ডার আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা এসএমজি দিয়ে ফায়ার শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারা পেরে ওঠে না। নদীতে জোয়ার থাকায় কৌশলগত কারণে পাকিস্তানি সেনারা ভালো অবস্থানে ছিল। ওয়াপদার বাঁধ না থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা ভালো অবস্থানে ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাদপসরণ করতে থাকলে পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকাররা গানবোট ও লঞ্চ থেকে নেমে তাদের পিছু ধাওয়া করে। অনেকে মুক্তিযোদ্ধা পালিয়ে বাঁচলেও এনায়েত আলী, কামরুল ইসলাম ও শঙ্কর অধিকারীকে হত্যা করে। তাদের মৃতদেহ ইটভাটার মধ্যে পাওয়া যায়। মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকের পায়ে গুলি লাগে। আইনুদ্দিন, মালেক, ইদ্রিস ও আবু তালেবকে তারা ধরে নিয়ে যায়। ইদ্রিস চলন্ত লঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে বেঁচে যায়। অন্য তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ পাওয়া যায়নি। দিলীপ বসুর বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি রাজাকাররা জ্বালিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই ছয় বীর শহীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন

×