ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদল ও আন্তর্জাতিক মহলের দায়িত্ব

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদল ও আন্তর্জাতিক মহলের দায়িত্ব
×

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৬:০৭

রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দল গত ২৯ এবং ৩০ জানুয়ারি ভাসানচরে স্থানান্তরিত হয়েছে। দুই দিনে তিন হাজার ২৪২ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দফায় এক হাজার ৬৪২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় এক হাজার ৮০৪ জনকে স্থানান্তর করা হয়। মালয়েশিয়া ফেরত ৩০৬ জন আগে থেকেই ভাসানচরে বাস করছিল। সব মিলিয়ে ভাসানচরে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় সাত হাজার। তৃতীয় দফা স্থানান্তরের সময় রোহিঙ্গাদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং আরও প্রায় ৪০ অপেক্ষমাণ থাকার খবর, ভাসানচর নিয়ে যারা সমালোচনা করেছেন, তাদের জন্য একটা জবাব হিসেবে হাজির হয়েছে।

এটা অনস্বীকার্য যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা সবসময় রহস্যজনক। আবার এটাও স্বীকার্য যে, উখিয়া এবং টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে নতুন-পুরোনো রোহিঙ্গা মিলে যে বিশাল শরণার্থী ব্যবস্থাপনা-যজ্ঞ উখিয়া-টেকনাফে চলছিল, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা না থাকলে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান নির্বিঘ্ন রাখতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো যে সময়, অর্থ, নীতি ও কূটনীতি ব্যয় করে, সেটা যদি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য ব্যয় করত, তা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অনেক সহায়ক হতো।

আমরা দেখেছি, যখন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে তাদের ইচ্ছায় ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হৈচৈ শুরু করে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আশ্রিত। সুতরাং তাদের কোথায় রাখবে, সেটা বাংলাদেশের নিজস্ব এখতিয়ার। আন্তর্জাতিক মহল বড় জোর দেখতে পারে, এসব রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে কিনা। স্থানান্তরিতরা আগের চেয়ে ভালো জীবন যাপন করতে পারবে কি-না। কিংবা রোহিঙ্গাদের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিচ্ছে কিনা। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা ইত্যাদি। কিন্তু তার বদলে বারবার বলার চেষ্টা করল, ভাসানচর দ্বীপের বয়স মাত্র বিশ বছর। আগে সেখানে কখনও মানুষের বসতি ছিল না। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে সেখানে মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। কিন্তু তারাও জানে যে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। সেখানে নিশ্চয়ই ভাসানচরের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের ফলে যদি কোনো দুর্যোগঘটিত কারণে রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটে, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকেই তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

বড় কথা, ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের যে মানবতাবাদী ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, সেটা বাংলাদেশ কেন জেনেশুনে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে! এটা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সম্ভবত বিবেচনা করতে চায়নি। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়া, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ইস্যুটিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে যে- রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় দফা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে গমন এবং স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যাওয়ার জন্য আরও চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষমাণ থাকায় প্রমাণ করে যে, রোহিঙ্গাদের জোর করে ভাসানচরে নেওয়া হচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, সজ্ঞান এবং সচেতনভাবে ভাসানচরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। তাই, রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দফা ভাসানচরে স্থানান্তরে প্রকারান্তরে সমালোচকদের জন্য কড়া জবাবও বটে।

আমি পত্রিকান্তরে লিখেছি- 'ভাসানচরে স্থানান্তরিত হওয়া রোহিঙ্গারা রীতিমতো মুগ্ধ এবং তারা সহজেই তাদের উখিয়ার জীবন আর ভাসানচরের জীবনের মধ্যে একটা তুলনামূলক চিত্র আঁকতে পারে। সে তুলনামূলক চিত্রের কপি তারা উখিয়া-টেকনাফে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের পাঠায় নানান কথামালা এবং ফোনালাপের মাধ্যমে। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে ভাসানচর সংক্রান্ত নানান ভুল-ভ্রান্তি দূর হচ্ছে এবং ক্রমবর্ধমান হারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভাসানচরে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।' এখন আর ভাসানচর নিয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে আলগা লোকের অযাচিত কীর্তন গাওয়ার দরকার নেই। কারণ উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসকারী অনেক রোহিঙ্গার আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব ইতোমধ্যে ভাসানচরে বসবাস করতে শুরু করেছে। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, 'উখিয়া- টেকনাফে তো আমাদের কিছু করার নেই। খাইদাই আর ঘুমাই। কিন্তু ভাসানচরে এসে আমরা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি। এখানে এসে নতুন করে জীবনটাকে সাজাতে চাই। কবে মিয়ানমারে ফিরে যাবো তার তো কোনো ঠিক নেই। মিয়ানমার আদৌ আমাদের নেবে কিনা তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই জীবন তো আর থেমে থাকবে না। ভাসানচরেই নতুন করে জীবনটা সাজানোর চেষ্টা করছি।'

রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই যে পরিবর্তন, তা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন দেখেও দেখছে না। যদিও জাতিসংঘ বলছে তাদের একটি টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট টিম ভাসানচর ভিজিট করতে চেয়েছিল (যদিও সরকার জাতিসংঘের এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে!) এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যৌথভাবে ভাসানচর ভিজিটের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু সরকার সে আবেদন গ্রহণ করেনি। সরকার কেন এদের আবেদন গ্রহণ করেনি তার উত্তর সংশ্নিষ্টরা ভালো দিতে পারবেন। কিন্তু আমার মনে হয়, ভাসানচরের যে ব্যাপক ও অত্যন্ত পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তাতে জাতিসংঘের টিম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে ভাসানচরে ভিজিট করালে বাজারে জারি থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়ানো যেত।

এখানে লিখে রাখা জরুরি যে, রোহিঙ্গারা পরিস্থিতির শিকার। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের জন্য রোহিঙ্গাদের কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না। এ সংকট সৃষ্টির জন্য প্রধানত দায়ী মিয়ানমার। আর এ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য এবং দ্রুত রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হওয়ার জন্য দায়ী মিয়ানমার, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশ তার সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে রোহিঙ্গাদের একটা উন্নততর জীবন দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হিসেবে তারা নিজেরা নিজেদের দায়িত্বটুকু এবং করণীয়গুলো ঠিকমতো পালন করেছে কিনা সেটা ভেবে দেখা জরুরি।

পরিশেষে বলব, গতকাল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে এনএলডি প্রধান অং সান সু চি ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করে এক বছরের জন্য মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। এ অবস্থায় অত্যন্ত বোধগম্য কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। তাই, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল এবং সহযোগিতার মনোভাবাপন্ন হওয়া সময়ের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সমালোচনা নয়, সহযোগিতা ও সমাধান জরুরি। 

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

আরও পড়ুন

×