ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলাম ও মানবিকতা

ইসলাম ও মানবিকতা
×

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২১ | ১২:০০

ইসলাম মানবতার ধর্ম। শান্তি, সৌহার্দ্য, সাম্য-মৈত্রী, সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, উদার-নৈতিকতা, মূল্যবোধগত উৎকর্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবিকতা হলো ইসলামের পরমাদর্শ। ইসলাম প্রবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার-বিশ্নেষণ করলেই পূতঃপবিত্র এই জীবন বিধানের নান্দনিক ও সৌন্দর্যময় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হবে। সর্বপ্রকার হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা আর পাশবিকতার ভিতের ওপর মানবতাবাদী ইসলামের কল্যাণধর্মী সৌধমালার গোড়াপত্তন ঘটে। গোটা বিশ্বে অমানবিকতার সব ধরনের রেকর্ড যখন অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তখনই ইসলাম তার সর্বমানবিক রূপটি নিয়ে বিশ্বমানবতার জন্য আবির্ভূত হয়। জাহিলিয়াতের অন্ধকার ভেদ করে ইসলাম তার মানবিকতার স্পর্শে সব মানুষকে আপন করে নেয়। ব্যক্তি-আক্রোশ, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক বৈষম্য আর জাতি-ধর্মের সব ভেদাভেদ দূর করে সাম্য-মৈত্রী আর বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদলে এক আদর্শস্থানীয় শান্তিময় সমাজ-কাঠামো গড়ে তোলে। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ইসলামের দ্রুত প্রসারের মূলে যে কয়টি অনুষঙ্গ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তার অন্যতম হলো সমাজে মানবিক মূল্যবোধের উপস্থিতি ও তার সফল প্রয়োগ। ইসলামের মানবতাবাদী আদর্শ সমকালীন ব্যক্তি ও সমাজ-মানসের ইতিবাচক পরিবর্তনে অনবদ্য অবদান রেখেছে।
ইসলামী জীবনদর্শনে বিশ্বমানবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। মানবসভ্যতায় সম্প্রীতির পৃথিবী আর সর্বজনীনতার প্রকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছে ইসলাম। ইরশাদ হচ্ছে- 'আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিমাতি ওয়া রাদিতু লাকুমুল ইসলামা দিনা' অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর প্রদত্ত আমার অনুগ্রহকেও সম্পূর্ণ করে দিলাম আর তোমাদের জন্য জীবনপদ্ধতি হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত করে দিলাম। মানবমণ্ডলীর জন্য মহান স্রষ্টার মনোনীত এই ইসলামের মূল মর্মবাণীই হচ্ছে কল্যাণকামিতা, মানবিকতা। বলা হচ্ছে- 'আদ্দিনু ওয়ান্নাসিহা' অর্থাৎ ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা সর্বদাই কল্যাণের কথা বলে, মানবিকতার জয়গান গায় এবং ভালোবাসার পূর্ণতা দান করে। ইসলাম, কোরআনে কারিম আর মহানবী (সা.)-এর প্রতিটি বাণী ও বক্তব্যে বিশ্বমানবতার প্রকৃত স্বরূপ পরিস্টম্ফুট হয়ে ওঠে। কোরআনে কারিমকে বলা হয় 'হুদাল্লিন্নাস' তথা গোটা মানবতার জন্য পথপ্রদর্শক আর বিশ্বনবী (সা.)কে বলা হয় 'রাহমাতুল্লিল আলামিন' তথা গোটা বিশ্ববাসীর জন্য করুণাস্বরূপ। এতে ইসলামের সর্বজনীন এবং বিশ্বজনীন রূপটিই সমহিমায় প্রকাশিত হয়ে থাকে এবং মানবতার পরিশুদ্ধ সুরতটিই তাতে বাঙ্‌ময় হয়ে ওঠে।
মহানবী (সা.) ইসলামের আলোকে যে সমাজ গড়ে তুলেছিলেন তার ভিত্তি ছিল সততা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতাবোধ। ইসলামে পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম প্রধান হলো নামাজ, আর সেই নামাজের মাধ্যমে আমরা মানবিকতা আর সাম্যের এক প্রকৃষ্ট নজির দেখতে পাই। একই কাতারে আমির-ফকির, সেখানে মানুষ হিসেবে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। নবীজি তাঁর এক বাণীতে বলেছেন- 'মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি দয়া বা অনুগ্রহ প্রদর্শন করে না, মহান আল্লাহ তার প্রতিও করুণা প্রদর্শন করবেন না।' তিনি আরও বলেছেন- 'সমগ্র সৃষ্টিই হচ্ছে মহান আল্লাহর পরিবারভুক্ত। আর তাই সৃষ্টিকুলের মাঝে সেই মহান আল্লাহর নিকট সবচাইতে অধিক প্রিয় যে তার পরিবারের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।' মহানবী (সা.) মক্কা বিজয়ের পর যারা তার সঙ্গে অতীতে চরম দুর্ব্যবহার করেছিল, নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিল, তাদের সবার প্রতি তিনি মানবিক আচরণ করেন। চরম দুঃসময়ে, যুদ্ধের ময়দানে এমনকি শত্রুর সঙ্গেও তিনি মানবিক আচরণের ধারা বজায় রেখেছেন। মক্কা বিজয়ের পর এক বৃদ্ধাকে তিনি দেখতে পেলেন, ভারী এক বোঝা বহন করে দূর পাহাড়ের দিকে যাচ্ছেন। দয়াল নবী বুড়ির কাছ থেকে বোঝাটি স্বীয় মাথায় উঠিয়ে নিলেন এবং তার গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। বিদায়বেলায় বুড়ি অবাক-বিস্ময়ে মক্কার পাশবিক ও রুক্ষ সমাজে এমন বিনয়ী, পরোপকারী মানুষের সন্ধান পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করে যখন দয়াল নবীর পরিচয় পেলেন, বুড়ি তখন আর চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি। চিৎকার করে আর আত্মবিশ্বাস ভরে তিনি বলতে লাগলেন- 'এই যদি হয় মোহাম্মদ (সা.)-এর মানবিক চরিত্র, তবে তিনি কোনো মানুষেরই ক্ষতি করতে পারেন না।' আর হ্যাঁ, তিনি কারও ক্ষতি করতে আসেননি, তিনি এসেছেন মানবিকতা, সম্প্রীতি আর পরোপকারিতার মাধ্যমে সর্বোন্নত ও মহত্তম এক মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে; যেখানে তিনি সর্বতোভাবে সফল হয়েছেন।
চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×