ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

কর্মক্ষেত্রে নারীর সুবিধা-অসুবিধা

কর্মক্ষেত্রে নারীর সুবিধা-অসুবিধা

নাফিসা বানু

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২১ | ১২:০০

সবার জীবনে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্টম্ন থাকে। আমিও ছোট্ট স্বপ্টম্ন দেখেছিলাম- পড়াশোনা করে ভালো চাকরি করব। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমকম (ফিন্যান্স) পড়তে পড়তে পত্রিকায় বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে থাকি। নজরে এলো এক গ্রুপ অব কোম্পানিতে হেড অব অ্যাকাউন্টসের চাকরির বিজ্ঞাপন। ভাবলাম দরখাস্ত করেই দেখি। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি তা আমার বাবা চাইতেন না। তার পরও সাহস করে দরখাস্ত করলাম এবং ইন্টারভিউতে ডাকা হলো। ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরিও পেয়ে গেলাম। একটু অবাক হলাম- এত বড় পদে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়ে নিলো! এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম দিন অফিসে গেলাম; কিন্তু কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হলো না। দ্বিতীয় দিনও গেল। তৃতীয় দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, কয়েকদিন পর কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে, এর মধ্যে আমার সঙ্গে কাজ করুন। তারপর দেখলাম তিনি আমাকে তার পারসোনাল কাজ দিয়েছেন। একটু বিরক্তবোধ করি। এরই মধ্যে কোম্পানির একটি প্রজেক্টের কনসালট্যান্ট আমাকে বললেন- মা, তুমি কি এখানে কাজ করতে পারবে? কথাটা শুনে খটকা লাগল। পরদিন অফিসে এসে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বললাম- স্যার, আমাকে যে কাজের জন্য নেওয়া হয়েছে, সেই কাজটা করতে দিন। তিনি বললেন, আপাতত আমি আপনাকে যে কাজ দেবো সেটিই করবেন। শুনে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। তার মুখের ওপরই বললাম- আমার জন্য নির্ধারিত কাজ দেওয়া না হলে এখানে কাজ করব না। তিনি তখন রেগে গেলেন। আমি রিজাইন দিয়ে চলে এলাম বাসায়। বাসায় এসে আমার বাবাকে বিষয়টি বলতে পারছিলাম না। তিনি আগেই প্রাইভেট চাকরি করতে মানা করেছিলেন। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে ভাইয়াকে বিষয়টি বললাম। বাবাকে বললাম, ওখানে কাজ ভালো না লাগায় ছেড়ে এসেছি।
কিছুদিন পর আরেকটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করতে চাইলাম, আমার বাবা নিমরাজি। তাকে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম; যদিও পরীক্ষা তেমন ভালো হয়নি। বিকেলে বাসায় একজন ভদ্রলোক এলেন। যেখানে পরীক্ষা দিয়ে এসেছি, তিনি সেখান থেকে এসেছেন। বললেন, চাইলে আপনাকে এখানে চাকরি দিতে পারি। বাবা সব শুনে বললেন, আমার মনে হয় না ওখানে চাকরি করা তোমার জন্য ভালো হবে।
কিছুদিন পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করি। সেখানে তিনবার মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে (প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা) মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে আমার চাকরি হলো। সেখানে কাজ করে যাচ্ছিলাম, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমকম ক্লাস করছিলাম। আমি যার অধীনস্থ ছিলাম, সেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিছুটা সুযোগ করে দেওয়াতে মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস এবং পরীক্ষা দেওয়ায় অসুবিধা হতো না। ভদ্রলোকের বাসাও ছিল আমাদের বাসার কাছাকাছি। আমি অফিসের বাসে করে আসা-যাওয়া করতাম। তিনি প্রায়ই নিজের গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় দেখতেন আমি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। একদিন আমাকে তার সঙ্গে যেতে বললেন। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়িতে উঠলাম। তারপর প্রতিদিনই আমাকে গাড়িতে উঠতে বললেও আমি রাজি হইনি। তাকে বলেছিলাম- স্যার, একজন জুনিয়র অফিসার হয়ে আপনার গাড়িতে প্রতিদিন যাওয়া দৃষ্টিকটু। ভদ্রলোক ভালো মানুষ, আমার অস্বস্তির কারণ উপলব্ধি করে মেনে নিয়েছিলেন।
গল্পগুলো বলার কারণ হলো, আমাদের সমাজে অবিবাহিত নারীর চাকরি করা বেশ কঠিন। তাকে অনেক কিছুই খেয়াল করে চলতে হয়। সব সময় যে পরিবেশ খারাপ হবে তা নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি।
১৯৯২ সালের অক্টোবর মাসে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ছেড়ে চাকরি নিলাম বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষতে (বেপজা)। ডেপুটি ম্যানেজার (অর্থ) হিসেবে। এখানে যার অধীনে সবচেয়ে বেশি সময় সরাসরি কাজ করেছি, তিনি ছিলেন প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা। পরে তিনি সদস্য (অর্থ) হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। অতিশয় ভদ্র ও ভালো এই ব্যক্তির অধীনে কাজ করে ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি আমাকে ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। বেপজায় যোগদানের পরপরই ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বিয়ে হয়।
নারীর জীবনে ঘর সামলে অফিস করা কষ্টসাধ্য কাজ। তার পরও নারীরা চাকরির ক্ষেত্রে অনেক বেশি মনোযোগী, কর্মঠ ও আন্তরিক। এর মানে এই নয় যে, পুরুষ সহকর্মীরা কাজ করেন না। কিন্তু মেয়েরা জানে প্রতিযোগিতামূলক সমাজে তাদের অফিসের কাজ অফিসে শেষ করে তবেই বাসায় যেতে হবে। বাসায়ও তার জন্য অনেক কাজ অপেক্ষা করছে। আজকাল বেশির ভাগ মেয়েই ঘর সামলেও সাফল্যের সঙ্গে চাকরি করছে দেখে খুব ভালো লাগে। মেয়েরা বাধাবিপত্তি পেরিয়েই এগিয়ে যায়। অফিস ও বাসা সামলেই আমার সংসার বেশ সুখের। একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টারি পাস করেছে। স্বামী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারপতি। শাশুড়ি ও ননদকে নিয়ে আমার সংসার ভালোই চলছে।
দীর্ঘ ৩০ বছরের চাকরি জীবনে আমার আরেকটি উপলব্ধি হলো- সরকারি অফিসে নারীর চাকরি করার পরিবেশ অনেক ভালো। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সব সময় নারীর জন্য অনুকূল পরিবেশ নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে ব্যতিক্রম সব জায়গাতেই আছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে হলে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে হবে সবার আগে। আর প্রয়োজন পুরুষ সহকর্মীর উদারতা ও সহমর্মিতা।
সদস্য (অর্থ) নির্বাহী বোর্ড, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ

আরও পড়ুন

×