বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
অধিকার সচেতন হোক সর্বস্তরের মানুষ
ড. এ কে এম নুর-উন নবী
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২১ | ১৬:১৮
পৃথিবীতে এখন সাড়ে সাতশ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। ক্রমে এ সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বের কিছু দেশ ইতোমধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, কিছু দেশ মাঝপথে রয়েছে; আর কিছু দেশ এখনও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণেই আনতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই সফল বাংলাদেশ। বাংলাদেশে একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে, অন্যদিকে গড় আয়ু বেড়েছে। এই ফলাফল এসেছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃৃতিক উন্নয়নের কারণে। কিন্তু কভিড পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকে এক অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।
আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। করোনা মহামারি বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- 'অধিকার ও পছন্দই মূল কথা :প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার প্রাধান্য পেলে কাঙ্ক্ষিত জন্মহারে সমাধান মেলে।' দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এক. অধিকার; এ অধিকার হতে পারে মানবাধিকার কিংবা প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার। এ অধিকারগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। দুই. পছন্দ; এই পছন্দ হতে হবে স্বাধীন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- নারী বলছে শরীর তার, সুতরাং সিদ্ধান্তও তার। নারী কখন বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হবে, কখন সন্তান ধারণ করবে, কোন ধরনের কর্মে যুক্ত হবে- এ সিদ্ধান্ত একান্তই তার। এটাই স্বাধীন পছন্দ কিংবা স্বেচ্ছা পছন্দ। এই স্বাধীন পছন্দ বাস্তবায়ন করা না গেলে স্লোগান শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
অধিকার ও স্বাধীন পছন্দের ক্ষেত্রে আমরা বেশ কিছু নির্দেশক দেখতে পাই। এক. কর্তৃত্ব ও অধিকার:পরিবারের ভেতরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রে নারীর কর্তৃত্ব ও অধিকার কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুই. সুযোগ: পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ কতটুকু। তিন. শিক্ষার্জন:শিক্ষার্জনের ক্ষেত্রে নারী কি নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, নাকি পরিবার বা আত্মীয়স্বজন তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে? চার. দারিদ্র্য:দারিদ্র্য আমাদের সবার পছন্দকে সংকুচিত করলেও এর প্রভাব নারীর ওপর বেশি থাকে। পাঁচ. ক্ষমতায়ন:নারীর ক্ষমতায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। স্বাধীন চিন্তা বা পছন্দের ক্ষেত্রে অপরিহার্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। কিন্তু নারী কি সে সুযোগ পাচ্ছে?; ছয়. প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা:প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানাবিধ সংকট। সাত. সুরক্ষা বলয়:যে কোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী। নারীর সুরক্ষা বলয় খুবই দুর্বল। বিশেষ পরিস্থিতিতেও নিজের সুরক্ষার জন্য পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় নারীকে। বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও বয়স্ক নারীদের সুরক্ষা বলয় আরও নাজুক। আট. আত্মনিয়ন্ত্রণ:নারী তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারবঞ্চিত। নারীর শরীর পরিচালিত হয় পুরুষের ইচ্ছায়। সন্তান ধারণ, প্রসব, সন্তানসংখ্যা, গর্ভধারণের সময়সহ এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ইচ্ছা ও মতামতকে এখনও গৌণ করে দেখা হয়। নয়. নারীর কর্মসংস্থান:নারীদের অনেকেই এমনকি শিক্ষিত ও দক্ষ অনেক নারী কর্মে যোগ দিতে পারে না পরিবারের চাপে। কেউ কর্মে যোগ দিলেও নানা প্রতিবন্ধকতা সামনে হাজির হয়। দশ. নারীর প্রতি সহিংসতা:নারী প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও বাচনিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নারীর সুরক্ষা বলয়সহ তার স্বাধীন সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ সহিংসতা রোধ করে সমঝোতামূলক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। এগারো. অসমতা:সামগ্রিকভাবে এসব নির্দেশকের কিছু অর্জিত হলেও আমরা পুরুষ-নারীর মধ্যে বৈষম্য বা অসমতা দেখতে পাই। একই শ্রম দিয়ে নারীরা কম পারিশ্রমিক পায়। কয়েক দিন আগে আমরা একটি লজ্জাকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করলাম। বলা হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ সম্মান জানানোর প্রক্রিয়ায় নারী প্রশাসকরা অংশ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া সমাজের নানা ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য বিরাজমান। সমাজে এসব নির্দেশক আছে বলেই নারীর স্বাধীন সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
নারীর অধিকার নিয়ে আমাদের অনেক উদ্যোগ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পছন্দের প্রতিফলন ঘটছিল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কভিড পরিস্থিতির কারণে সেই চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অধিকারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কভিডের কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ। শিক্ষার্থীরা বসে থাকছে। কর্মসংস্থান সীমিত হওয়ায় মানুষ কাজ হারিয়েছে ও হারাচ্ছে। নতুন করে কাজে যোগদান করার সুযোগও কম। এ রকম অনিশ্চয়তায় বাল্যবিয়ে বাড়ছে। ইতোপূর্বে এ সূচকে যতটুকু অগ্রগতি এসেছিল, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। করোনা মহামারির মধ্যে দেশে ১৩ শতাংশ বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনাকালে অভিভাবকের কাজকর্ম না থাকায় ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার কারণে বাল্যবিয়ে বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। আর সন্তানের স্কুল খোলার অনিশ্চয়তায় বেড়েছে ৭১ শতাংশ। এছাড়া করোনা মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় অনিরাপত্তাবোধের কারণেও বাল্যবিয়ে বাড়ছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আনুমানিক পাঁচ লাখ মেয়ে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে আছে। আর বাল্যবিয়ের শিকার ১০ লাখ মেয়ে সন্তানসম্ভবা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। করোনা মহামারির কারণে ২০২৫ সালে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেড়ে মোট ছয় কোটি ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
করোনাকালে বাল্যবিয়ের পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। বাড়ছে পারিবারিক কলহ, বিয়ে বিচ্ছেদ ও সামাজিক অপরাধ। যুবসমাজ ডিজিটাল মাধ্যমে আসক্ত হচ্ছে; মাদকের দিকে ঝুঁকছে। এতে অন্যান্য অপরাধের মতো ডিজিটাল অপরাধও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। কিছুদিন আগে আমরা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নারী পাচারের লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছি। কভিডের নানামুখী প্রভাবে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হয়েছে। এপ্রিলের পর থেকে নভেম্বরে এসে এ সেবা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আবার তা সংকুচিত হয়েছে। কভিড সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সেবাদাতারা তাদের পরিদর্শন কর্ম সীমিত করেছে। ফলে সচেতনতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কভিড পরিস্থিতি বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে কীভাবে সেবাদান অব্যাহত রাখা যায়, সে বিষয়ে সেবাদাতাদের তেমন প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়নি।
কভিড পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এসব 'অধিকার ও ইচ্ছা' পুরো মাত্রায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। আমরা বাস্তবে কতটুকু 'অটোনমাস', তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর পরও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছি, এখন উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছি। দেশে অনেক উন্নত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা অভাবনীয় মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি। বাংলাদেশ কভিড মোকাবিলায় নিজস্ব অর্থায়নে ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি শুরু করেছি অনেক আগেই। কিছুদিন টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হলেও আবার এর অগ্রগতি হয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে তৃতীয় ডোজের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে নিশ্চয়তা বাড়াতে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এখনও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা টিকা পাননি বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা যাচ্ছে না। সুতরাং এ কর্মসূচির গতি বাড়াতে হবে।
আমাদের দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ। এই জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করার বড় মাধ্যম হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। করোনা পরিস্থিতির কারণে মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হবে। মানুষের নানান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সজাগ থাকতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষের মধ্যে আরও বেশি শিক্ষা ও তথ্যের বিস্তার ঘটাতে হবে। সর্বোপরি, মানুষকে তাদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে।
সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়