সমাজ
আয়বৈষম্য হ্রাসে চাই সুশাসন
ড. আবদুর রশিদ সরকার
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৪:১৯
স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম দুই দশক চরম দারিদ্র্যে জর্জরিত ছিল বাংলাদেশ। তবে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা হ্রাস, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ আর্থসামাজিক অন্যান্য ক্ষেত্রে চমকপ্রদ অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রায়ই শোনা যায়, এদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বটে, সঙ্গে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। কার্যত এই বৈষম্য পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থারই অনুষঙ্গ। এদেশের আয়বৈষম্য বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে কতটা প্রকট তা তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুসন্ধান করা দরকার।
মার্কস ও অ্যাঙ্গেলসের আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছিল বৈষম্যহীন। মধ্যযুগে কৃষিতে বহুমানুষের শ্রমে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মুষ্টিমেয় মানুষের দখলের নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকেই মানুষে মানুষে বৈষম্যের সূত্রপাত। অবশ্য ১৫০০ সালে এসেও ইউরোপ এবং অবশিষ্ট বিশ্বের আয় ও জীবনযাত্রার মানের মধ্যে উল্লেখ করার মতো কোনো পার্থক্য ছিল না। তখন পৃথিবীর মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩০ বছর। ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবকালে শহুরে ও গ্রামীণ মধ্যবিত্তের অর্জিত সুবিধা নিম্নবিত্তের সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি হয় এবং আধুনিক আয়বৈষম্যের উন্মেষ ঘটে। এই সময়েও মানুষের গড় আয়ু ৪০ বছর পেরোয়নি।
অর্থনীতিবিদ কুজনেটস সর্বপ্রথম ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও জার্মানির তথ্য নিয়ে দেখান, উন্নয়নের শুরুর দিকে একটি দেশের মাথাপিছু আয় যখন বাড়তে থাকে তখন আয় বণ্টনে বৈষম্যও বাড়ে। কিন্তু বাড়ন্ত মাথাপিছু আয় একটা স্তরে পৌঁছার পর থেকে এই আয়বৈষম্য হ্রাস পেতে শুরু করে, যা উন্নয়ন অর্থনীতিতে কুজনেটস অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে রস্টো ১৯৬০ সালে তার উন্নয়ন তত্ত্বে বলেন, একটি দেশ যখন সনাতনি, উড্ডয়নের পূর্বাবস্থা ও উড্ডয়নকাল পার করে পূর্ণ বিকাশ স্তরে প্রবেশ করে, তখন আয়বৈষম্য হ্রাস পেতে শুরু করে। বাংলাদেশ তথা বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশ সনাতনি স্তর পার করে এখনও উড্ডয়নের পূর্বাবস্থায় বিরাজ করছে।
সম্প্রতি কিছু উন্নত দেশের তথ্য নিয়ে থমাস পিকেটি দেখিয়েছেন, মাথাপিছু আয়ের অতি উচ্চ পর্যায়েও আয়বৈষম্য হ্রাস না পেয়ে বরং বাড়তে পারে। তার মতে, ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য সমাজে বিত্তবানদের প্রভাব বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাদি বৈষম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদের মতে, কখন এবং কেন মাথাপিছু আয়স্তরে বৈষম্য হ্রাস পাবে বা নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিনা তা নির্ভর করছে প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হয়, কারা অংশগ্রহণ করে; কোন কোন খাত ও অঞ্চল অগ্রাধিকার পায়; রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর; শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নাকি কর্তৃত্ববাদী; সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় দর্শনের ওপর।
সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় পর্যায়ে আয়বৈষম্য পরিমাপে বহুল ব্যবহূত পদ্ধতি হলো জিনি সহগ, যার মান শূন্য থেকে ১-এর মধ্যে থাকে। বিশ্বব্যাংক ১০০ দ্বারা গুণ করে জিনি সূচক প্রকাশ করে। এই সহগের মান শূন্য-এর অর্থ হলো, দেশের সব নাগরিকের সমান আয় এবং ১ বা ১০০-এর অর্থ হলো জাতীয় আয়ের পুরোটাই এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। অপরপক্ষে, ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণে দেশের জনসংখ্যাকে আয়ের ঊর্ধ্বক্রমানুসারে সাজিয়ে ৫ বা ১০ ভাগে ভাগ করে কোন ভাগে কত শতাংশ নাগরিক মোট আয়ের কত শতাংশের অধিকারী তা দেখানো হয়। বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে জিনি সূচকের মান শূন্য বা ১০০; অর্থাৎ বৈষম্য আছে সব দেশেই; কম আর বেশি। এই বৈষম্য ঐতিহ্যগতভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোতে অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় কম। তবে মধ্য-পূর্ব ইউরোপীয় এবং নর্ডিক দেশগুলোতে আয়বৈষম্য সবচেয়ে কম।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাউথ আফ্রিকায় এ সূচকের মান ৬৩, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং স্লোভেনিয়ায় ২৪ দশমিক ৬, যা সর্বনিম্ন। সাউথ আফ্রিকায় সব থেকে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয়, সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের আয়ের থেকে ৫৬ গুণ, যা স্লোভেনিয়াতে মাত্র ৫ গুণ। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে জিনি সূচকের মান ৪১ দশমিক ৪ এবং নিচের ১০ শতাংশ মানুষের আয়ের চেয়ে ওপরের ১০ শতাংশের আয় ১৮ গুণ। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল রিপোর্ট-২০২০ এ ১১৯টি দেশের ১৯৯০-২০১৬ সময়ের জিনি সহগের প্রবণতা বিশ্নেষণ করে দেখানো হয়েছে, ৪৯টি দেশে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পেলেও ৫৮টি দেশে হ্রাস পেয়েছে এবং ১২টি দেশে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, বৈষম্য বৃদ্ধির দেশগুলোতে পৃথিবীর ৭০ শতাংশ মানুষের বসবাস।
দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি আয়বৈষম্যের দেশগুলো হলো- শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ। আর কম আয়বৈষম্যের দেশ হলো বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান। ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কায় এই সূচকের মান ছিল ৩৯ দশমিক ৩০ আর বাংলাদেশে ৩২ দশমিক ৪। বাংলাদেশে ১৯৮৩ এবং ১৯৯৫ সালের মধ্যে এই সূচকের মান ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও ২০০৫-২০১৬ সময়ে বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। সবচেয়ে বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষের আয় এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম এবং সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের আয় পাকিস্তান ব্যতিরেকে বাংলাদেশে বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বাড়লেও তা বৈশ্বিক এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়নি।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৫ ও ২০১৬ সালে জিনি সূচকের মান যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৭ ও ৪৮ দশমিক ২ এবং সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ২০১৬ সালে মোট জাতীয় আয়ের ৩৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ; যা ২০০৫ সালে ছিল ৩৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বৈষম্য বৃদ্ধির পরিমাণ নগণ্য হলেও এই মানগুলো উচ্চ আয়বৈষম্যের নির্দেশক। এ অবস্থায়ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী একজন কৃষিশ্রমিক ১৯৯১-৯২ সালে তার দৈনিক মজুরি দিয়ে তিন কেজি মোটা চাল কিনতে পারত এবং একই ধরনের শ্রমিক এখন দৈনিক মজুরি দিয়ে একই মানের সাত কেজির ওপর চাল কিনতে সক্ষম। অর্থাৎ অধিক আয়বৈষম্যের মধ্যেও মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর সংগতি ও সুযোগ দুই-ই বেড়েছে।
এদেশে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৬ বছর, যা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি এবং পৃথিবীর মানুষের গড় আয়ুর সমান। ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অবমূল্যায়ন করে। কাজেই বিভিন্ন ধরনের পাবলিক অ্যাকশনের মাধ্যমে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির দুষ্টচক্রকে বৈষম্য হ্রাসের শিষ্টচক্রে পরিণত করতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পদের যৌক্তিক পুনর্বণ্টন করে বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত শোষণহীন ন্যায়ানুগ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করে মোট কর রাজস্বে প্রত্যক্ষ করের শেয়ার বৃদ্ধি করতে হবে। প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যাতে আয় পুনর্বণ্টনের যথাযথ সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রহিত করে এর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের সব সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে আয়বৈষম্য নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য।
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমাজ
- ড. আবদুর রশিদ সরকার