দিবস
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করোনার দীক্ষা
ডা. মোহিত কামাল
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
অদৃশ্য শত্রু, অণুজীব করোনার আক্রমণকে আমরা দু'ভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। একদিকে 'থ্রেট' হিসেবে দেখেছি; আরেকদিকে দেখেছি কিংবা দেখছি 'লস' হিসেবে। আবার কোনো কোনো মর্মান্তিক ঘটনাকে একই সঙ্গে 'লস' ও 'থ্রেট' হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছি।
সাধারণত যাপিত জীবনের 'থ্রেটফুল ইভেন্ট' চাপ তৈরি করে মনে; ভয়-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বা অ্যাংজাইটি। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়; সেই সঙ্গে সংকট মোকাবিলা করার সামর্থ্যও। মনোযোগের ঘাটতিসহ স্মরণশক্তি কমতে থাকে; সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও। 'লস'-এর কারণে মনে হাহাকার জাগে, হতাশা সৃষ্টি হয়; চূড়ান্ত পর্যায়ে বিষাদ হানা দেয় মনে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চিত ধোঁয়াশায় ঢেকে যায়। মূল কথা 'থ্রেট' এবং 'লস'-এর সম্মিলিত আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছে বিশ্বজুড়ে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য; মানবগোষ্ঠী বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিল প্রাথমিকভাবে।
নিশ্চয় আমরা দুর্দিন কাটিয়ে উঠতে পারব। আমরা করোনাসৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা-পরবর্তী পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ও বিষণ্ণতাকে হটিয়ে আনন্দময় জীবনের পথে পা বাড়াতে পারব আবার।
অনেকে ট্রমা বহন করবে দীর্ঘদিন- পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসের দীর্ঘমেয়াদি যাতনা ধীরে ধীরে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। অস্থিরতা, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি, শব্দ-কথাবার্তা সহনের শক্তি কমে যাবে অনেকের। দুঃস্বপ্নে বারবার ভয়াবহ ঘটনাগুলো মনে হানা দেবে। কোনো 'কিউ' সামনে এলে সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ঘটনাটা মনের মধ্যে জেগে উঠবে। ঘুমের সমস্যাও শুরু হয়ে যাবে ভুক্তভোগীর।
এসব থেকে বাঁচতে হলে প্রথমেই হতে হবে ক্যাথার্সিস। এখন যারা ভয়াবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ইমোশনাল রিলিজ হওয়া দরকার- ক্যাথার্সিস হওয়া দরকার, সাইকোলজিক্যাল ফার্স্টএইড দরকার। দরকার ক্রাইসিস ইন্টারভেনশনও। এসব চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে বিষণ্ণতা রোগ, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার অথবা অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কমে আসবে। পরবর্তীকালে কী হবে- না ভেবে এ সময়েই মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার অর্থ হচ্ছে নিজের মধ্যে স্বস্তি থাকা, সামর্থ্যগুলো শনাক্ত করা, প্রতিদিনের চাপ মোকাবিলা করার ক্ষমতা অর্জন করা, প্রতিদিনের কাজগুলো ঠিকমতো পালন করা এবং নিজের দক্ষতাকে শানিত করে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করা। এসব গুণ থাকলে আমরা বলব, একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো আছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে নিজের দক্ষতাকে যেমন শানিত করতে হবে, তেমনি অদক্ষতাগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। পরিচর্যার মাধ্যমে তা উন্নত করতে হবে। তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে, মন ঠিক থাকবে। আবার বলা যায়, দেহ ঠিক থাকলে মন ঠিক থাকবে। দেহ-মন একই সূত্রে গাঁথা। এ দুর্যোগকালে দেহ ও মন সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত এক্সারসাইজ, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং সামাজিক সংযোগ বজায় রাখা, ব্যক্তিগতভাবে না পারলে ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে হলেও সংযুক্ত থাকা জরুরি। জরুরি জনবিচ্ছিন্ন না-হওয়াও।
করোনার অভিঘাতে সৃষ্ট ক্ষতি, ভয়, আতঙ্ক, বিষণ্ণতা দীর্ঘায়িত হয়েছে, হচ্ছে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য-বিপর্যয়ও বিষণ্ণতার বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভয়কে জয় করতে হবে, নতুন কর্মোদ্দীপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মনোবল বাড়াতে হবে। মনের নেতিবাচক চিন্তা শাসন করে ইতিবাচক ভাবনায় ঋদ্ধ হতে হবে। সর্বোপরি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিতে হবে। হতাশ না হয়ে কভিড-উত্তর শারীরিক ও মানসিক যাতনা, সমস্যা মোকাবিলার জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
বিশ্বজুড়ে যে অসম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক সম্পদ, টিকা নিয়ে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়েছে দ্য ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সব স্টেকহোল্ডার। এ কারণেই সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এবার ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য- 'অসম বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য'।
সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য রোধ করার আহ্বান এসেছে। চিকিৎসা গ্যাপ পূরণের ডাক এসেছে। মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলামসহ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ যুগোপযোগী করার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ সবার মানসিক স্বাস্থ্যকে বিশেষ বিবেচনায় উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি রাষ্ট্র, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্দেশে বলা হয়েছে :বিশ্বজুড়ে বৈষম্য দূর করে এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; মানুষের মানবাধিকার উন্নত করার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। কাউকে পেছনে রেখে নয়, উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া ছড়িয়ে দিতে হবে বয়োজ্যেষ্ঠসহ অনুন্নত বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর জন্য।
করোনার নির্মম আর হিংস্র অভিঘাত কি আমাদের এই দীক্ষা উপহার দিয়ে যায়নি?
অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ; জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক
drmohitkamal@yahoo.com
- বিষয় :
- দিবস
- ডা. মোহিত কামাল