পাকিস্তান
ভুল থেকে শিক্ষা নিক ইমরান খান
ভুল সিদ্ধান্ত থেকে যে শিক্ষা হলো পিটিআইয়ের, সেটা পরবর্তীকালে ইমরান কাজে লাগাতে পারবেন
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২২ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২২ | ০০:৪২
সংক্ষেপে বলা যায়, এক বিটকেল পরিস্থিতিতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে পাকিস্তানি রাজনীতি। বাইরে থেকে এটাই মনে হচ্ছে। তবে, পাকিস্তানি জনগণ ঠিক নার্ভটি চিনতে পেরেছে কী কারণে ইমরান খানের পতন হলো। সেই জনগণ এখন প্রতিবাদের মিছিলে দেশটির শহরগুলোর রাজপথে।
স্বাভাবিক চিন্তায় এটাই মনে হতে পারে, ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের [পিটিআই] জোট সরকারের সঙ্গীরা প্রধানমন্ত্রীর ওপর নানা কারণে অখুশি ছিলেন। সেখানে ক্ষমতার অংশীদারদের মধ্যে আস্থা বজায় রাখতে পারেননি ইমরান। ক্ষমতার ভাগ দিলেও হয়তো ক্ষমতাভোগের বিষয়ে তারা অখুশি ছিলেন।
পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল মুসলিম লীগ নওয়াজের চেষ্টা ছিল ইমরান খান সরকারের পতন। তারা বাগিয়ে নিয়েছিল এমকিউএম সদস্যদের। অভিযোগ করেছেন ইমরান খান, টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন তারা। সেই জোট সঙ্গীরা ইমরানের ভাষায় স্বদেশী-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।
ভুল থেকে শেখে মানুষ। কিন্তু ইমরান কিছু ভুল তো করেছেনই। যেমন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উসমান বুজদারকে নিয়োগ। এ ছাড়া আরও কিছু স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ভুল, যা ইমরানের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে ঠিক মানানসই ছিল না। কিন্তু তিনি সেসব ভুলকে স্বীকার করেননি এবং ভুল শুধরে নতুন করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেননি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাত থেকে বের করে আনার বিষয়ে তিনি যথার্থ পথ অবলম্বন করতে পারেননি। জনকল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারেননি। আর তার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থাকলেও তা কর্তৃত্ববাদিতার ভেতর দিয়ে সম্পন্ন করতে চেয়েছেন। গণতন্ত্রমনস্ক জনগণ তা পছন্দ করেনি। এটা হয়তো ইমরান খান বুঝতে পারলেও সেখান থেকে সরে আসতে পারেননি রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডাদের চাপের মুখে।
পিটিআই বিজয়ী হয়ে আসার পেছনে সে-দেশের পরিচিত 'অ্যাস্টাবলিসমেন্ট'এর সঙ্গে [সামরিক বাহিনী ] সুসম্পর্ক নির্মিত হওয়াই ছিল মূলে। সেই সম্পর্ক এখন শূন্যে নেমে এসেছে। আইএসআইর মহাপরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিমত সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই তার সূচনা। আইএসআই প্রধান মূলত পরবর্তী সেনাপ্রধানেরই পদ। সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের বিরোধের সূচনা সেখান থেকেই। সেটা আরও খারাপের দিকে গেছে বুজদারকে সরিয়ে না দেওয়ায়। পাঞ্জাবের শাসক হিসেবে উসমান বুজদারকে সেনাবাহিনী চায়নি। মূলত ইমরানের পতনের সূচনা সেখান থেকেও। তারা একলা চলার নীতিতে অনড় থাকায় গণতন্ত্রের যে ভিত, তা একপেশে হয়ে পড়ে।
পাকিস্তানি এক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফাহাদ হোসেন বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন ইমরান বধের। তিনি লিখেছেন এক. এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারা। দুই. বিরোধীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি। তিন. উসমান বুজদারকে নিয়ে রাজনৈতিক ভুল। চার. অযোগ্যদের দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন। পাঁচ. অতি আত্মবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্য।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তেহরিক-ই-ইনসাফ সুসম্পর্ক গড়ে ওঠায় ২০১১ সালে পার্টি পুনর্গঠিত হয়। আর ইমরানের পিটিআই ক্ষমতায় আসে ২০১৮ সালের ১৬ জুলাইয়ের নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ৩৪২ আসনের মধ্যে পিটিআই বিজয়ী হয় ১৪৯টি আসনে। পিটিআই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তাই তিনটি ক্ষুদ্র আসনের দলকে জোটবন্দি করে সরকার গঠন করেন ইমরান খান। জোট সদস্যরা হলো- এমকিউএম, পিএলএম ও বিএপি। এই ক্ষুদ্র আসনের মালিকরাই ইমরান খান সরকারের ওপর থেকে জাতীয় পরিষদে তাদের আস্থা তুলে নেয়। কেন তারা আস্থা তুলে নেন তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, সরকারের অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুঃশাসন বা টাইরান্ট শাসন। তারা বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইমরান খান সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। সংসদে অনাস্থা ভোট হয়েছে। সেই ভোটাভুটিতে পিটিআই সদস্যরা অনুপস্থিত ছিলেন। সেখানে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৭৪টি। বিপক্ষে শূন্য ভোট। মুসলিম লীগ [নওয়াজ] পিপিপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন এমকিউএম, পিএলএম আর বিএপির সংসদ সদস্যরা। সব মিলিয়ে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে (১৭৪টি)। ফলে বিরোধী নেতা মুসলিম লীগ নওয়াজের প্রধান পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
বিষয়টি টের পেয়েছিলন ইমরান খান অনেক আগেই। কিন্তু তার রাজনৈতিক সততা ও সাহস তাকে অন্যায় আবদার মেনে নিতে দেয়নি। যা আমরা এতকাল কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে দেখিনি, প্রকাশ্যে আমেরিকার মতো দেশের ষড়যন্ত্রকে তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন। চিঠি দিয়ে যে হুমকি দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু তা গোপনই থাকার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন প্রকাশ্যে বিরোধ সৃষ্টি করায় পরিস্থিতি খুবই নাজুক হয়ে উঠেছে। যার ফলে তাকে অনাস্থার শিকার হয়ে সরকার থেকে ছিটকে পড়তে হলো। এই প্রথম কোনো পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী অনাস্থায় হেরে পদ হারাল।
কেন পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্ট ইমরানের ওপর থেকে তাদের সমর্থন সরিয়ে নিল? এক. আইএসআইর প্রধান হিসেবে ফায়েজ থাকুক, এটাই চেয়েছিলেন ইমরান খান। ইমরানের সেই চাওয়া তারা ফিরিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন ইমরান। এটাও বুঝতে পারে এস্টাবলিশমেন্ট। তারা ইমরানের মস্কো সফর চায়নি। তারা রাশিয়ার বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ এস্টাবলিশমেন্ট ইউক্রেনের পক্ষে। তার মানে তারা পশ্চিমাদের পক্ষে। সরাসরি বললে বলা যায়, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। আর জো বাইডেনের প্রশাসনের ডোনাল্ড লু চিঠি দিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ইমরান খান, সেই সূত্রেই খেলেছে এস্টাবরিশমেন্ট। বাইরে থেকে আমরা যতই দেখি না কেন পাকিস্তানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক সুদৃঢ় হলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মূল স্তম্ভ সেনাবাহিনীর অবস্থান রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে অনেকটাই শক্তিশালী। ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার প্রতিক্রিয়া জানালেও চীনা প্রেসিডেন্ট কোনো রা কাড়েননি। তার মানে চীনের মনে কী খেলা করছে তা কেউ জানতে পারছে না। পাকিস্তান পুরোনো বন্ধু চীনের। তবে ইমরানের সময় তা আরও দৃঢ় হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ও সামরিক মেরূকরণ শুরু হয়েছে, সেই শৈলশিলার উপরিভাগ আমাদের চোখে পড়ছে। নিচে জমে আছে আরও অনেক বেশি অংশ। সেখানে দাবার ঘুঁটির চালগুলো কী হবে সেই নকশা তৈরির কাজ চলছে, তা কেউ কি জানে? রাশিয়া এখন মার্কিনি ও পশ্চিমা পুঁজিবাদীদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে নতুন ব্যবস্থার সূচিমুখ সৃষ্টি করেছে। আসলে সে-কাজটা শুরু হয়েছে আরও আগে থেকেই। রাশিয়া তার ৬৩ হাজার কোটি ডলারের রিজার্ভের ১৬ শতাংশ রেখেছে ডলারে আর ১৩ শতাংশ রেখেছে ইউয়ানে, চীনা মুদ্রায়। ডলারের বিপরীতে ইউয়ানকে বেছে নেওয়ার পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন মেরূকরণের সূচিপথ তৈরি করেছে রাশিয়া তারই বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছে পুতিনের কথায়। তিনি বলেছেন, তেল বিক্রি করব, তবে মূল্য পরিশোধ করতে হবে রুবলে। এই শর্ত না মানলে রাশিয়া পশ্চিমাদের তেল দেবে না। পাইপলাইন বন্ধ করে দেবে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের শুরুর দিন [২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২] অকস্মিকভাবে মস্কো সফরের কী কারণ থাকতে পারে আমেরিকার এই পুরোনা ও পরীক্ষিত বন্ধু দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের? আবার নব্য বন্ধু ভারতই বা কোন উদ্দেশে রাশিয়ার তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, আমেরিকাকে নাখোশ করে। নাখোশ আমেরিকা কি নরেন্দ্র মোদিকে টার্গেট করবে ইমরান বধের পর? হতে পারে, নাও পারে। আমেরিকা এমনই এক নিষ্ঠুর পররাষ্ট্রনীতিতে চলে, যা আসলে তাকে আনপ্রেডিকটেবল হিসেবে চিত্রিত করা চলে।
২.
ইমরান খান এখন সত্যিকার রাজনীতির মাঠে। রাজনৈতিকভাবে তিনি ও তার দল মোকাবিলা করবে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ-নওয়াজের জোট সরকারকে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করা উচিত। ভুল সিদ্ধান্ত থেকে যে শিক্ষা হলো পিটিআইয়ের, সেটা পরবর্তীকালে ইমরান কাজে লাগাতে পারবেন। কিন্তু যাদের ক্ষমতায়ন হলো টাকা আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, তারা এস্টাবলিশমেন্টের কাছে মাথা নত করে থাকবে। তাদের এমন মনোবল হবে না যে এস্টাবলিশমেন্ট রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে বেহুদা নাক গলায় ও গণতন্ত্রকে সংহত হতে দেয় না, যা আমেরিকান চেতনার অংশ। হোয়াইট হাউসের জেন সাকি যতই বলুন না কেন যে আমেরিকা গণতন্ত্রই দেখতে চায় দেশে দেশে, সেটা তাদের রাজনৈতিক বুলি। আসলে তাদের স্বার্থ হাসিলে যে কোনো রকম সরকারকে তারা সহযোগিতা দেয়, অতীতে তার বহু প্রমাণ আছে। গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিকভাবে সৎ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ রাজনীতিকদের সদিচ্ছা জরুরি। কিন্তু রাজনীতির স্টেকহোল্ডাররা সেই সৌন্দর্য় হারিয়ে ফেলেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের সততার সঙ্গে রাজনীতি করতে হবে। এর বিকল্প নেই।
তবে, পাকিস্তানের মতো একটি সামরিক বাহিনীর তীব্র প্রভাবের ভেতরেও যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সেটা প্রমাণ হলো ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির ভেতর দিয়ে কিংবা এটাও হতে পারে যে তারাও রাজনীতিকদের মতোই লোভের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুয়োমটো করা এবং সংসদ ও রাষ্ট্রপতির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা প্রমাণ করে তারাও যেন অদৃশ্যপ্রায় কোনো শক্তির উৎসজাত। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না, সবকিছুর সঙ্গে এস্টাবলিশমেন্টের যোগসূত্র রয়েছে।
- বিষয় :
- মাহবুব হাসান
- ইমরান খান
- পাকিস্তানে বিক্ষোভ