ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

জামায়াত কি ফিরে আসছে?

জামায়াত কি ফিরে আসছে?
×

মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৩ | ০৪:৫০

দীর্ঘ ১০ বছর পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজনীতিতে। নানা প্রশ্ন সবার মনে– তাহলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত কি আবার প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরছে? সরকার কি তার কৌশলে পরিবর্তন এনেছে? নাকি মার্কিন নতুন ভিসা নীতির সুফল পেতে শুরু করেছে জামায়াতও?

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। তারা বলছে, এটি ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে বেইমানি। অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, নির্বাচন সামনে রেখে আবারও আগুন সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নিতে বিএনপিই জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের বিষয়ে কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে বিএনপি। দলটি বলছে, সব রাজনৈতিক দলেরই সভা-সমাবেশের অনুমতি পাওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। (সমকাল, ১১/০৬/২৩)

সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে বিএনপি। তাঁদের কথা শুনে মনে হয়, রাষ্ট্র চালায় আওয়ামী লীগ আর পুলিশ চালায় বিএনপি। বাস্তবতা হলো, এ পর্যন্ত যত সমাবেশ ও মিছিল করেছে বিএনপি, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ হলেও পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করেছে। গুলি চালিয়ে ১৭ জনের প্রাণ হরণ করেছে। অন্যদিকে শান্তি সমাবেশের নামে সরকারি দলের নেতারা চটাং চটাং কথা বললেও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটা ফুলের টোকাও দেয়নি তাদের।

বিএনপির বক্তব্যও সন্দেহজাগানিয়া বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। দলটির নেতারা এমনভাবে বললেন– সব রাজনৈতিক দলেরই সভা-সমাবেশের অনুমতি পাওয়ার অধিকার রয়েছে; যেন জামায়াতকে অনুমতিটা বিএনপিই দিয়েছে। তারা কি ক্ষমতায়? পুলিশ কি তাদেরই অধীন? অন্তত দুই বছর ধরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে এটি প্রকাশ্যেই বলে আসছেন– জামায়াতের সঙ্গে তাদের মিত্রতা নেই। একই কথা জামায়াতের বর্তমান প্রধান নেতার মুখ থেকেও আমরা শুনেছি। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে মুখ না খুললেও এই সময়ে তারা জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন জোটের বাইরের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দলগুলোকে নিজস্ব বলয়ে পেতেই এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে দলটি। কিন্তু জামায়াতকে সমাবেশ করতে সরকারের অনুমতিদানকে সমর্থন করায় এ ধারণাই পোক্ত হয়, বিএনপি-জামায়াতের মেলবন্ধন এখনও চলছে।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, জামায়াত এখন আর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। তার নিবন্ধন নির্বাচন কমিশন বাতিল করলেও তা বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাধিক রায়ের পর্যবেক্ষণে দলটিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। সে দলটিকে বিএনপি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পাওয়ার যোগ্য বলে প্রত্যয়ন করছে। পুলিশ জামায়াতকে সভা-সমাবেশ করার পারমিশন দিল!

২০১৪ সালের একতরফা জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে ক্ষমতাসীন দল ও তার সহযোগীরা বিনা ভোটে বিজয়ী ঘোষিত হলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনটিতে বিএনপিসহ সব দল অংশ নিলেও তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। বরং নির্বাচনটি নিয়ে এমন সব কথা চালু আছে, যা বাংলার মানুষ আগে কখনও শোনেনি। হয়তো পৃথিবীর মানুষও দেখেনি। এ প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনটি কোন প্রক্রিয়ায় হবে– তা নিয়ে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক চলছে। এমনও শঙ্কা অনেকের মধ্যে, প্রয়োজনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা ও বিষাক্ত করে তোলার লক্ষ্যেই জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে বর্তমান সরকার। না হলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অযোগ্য দলটিকে মাঠে নিয়ে আসার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। অনেকের মতে, আরও ইসলামী নামের দলকে এই শোভাযাত্রায় শামিল করতে পারে সরকার সামনের দিনগুলোতে, যাতে বিএনপি তাদের অধীনে নির্বাচনে না এলে এই বাহাত্তর দলের সম্মিলিত জোটের ব্যানার টাঙিয়ে আরেকটি অদ্ভুত নির্বাচন করার ইতিহাস রচনা করা যায়।

আসলে ক্ষমতা এমন এক মসনদ, যেখানে অর্থবিত্ত অর্জনের বৈধ-অবৈধ পথ অনেক। রাষ্ট্রক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেমন দাবিয়ে রাখা যায়, তেমনি সামাজিক প্রতিপত্তিও প্রদর্শন করা যায়। সেই ক্ষমতার ঘ্রাণে মাতোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা। তাঁরা কেউ মসনদ ছাড়তে চান না। ছলে-বলে-কলে-কৌশলে মসনদে থাকতে চান কিংবা সেখানে যাওয়ার কসরত করেন। এ খেলার প্রথম ধাপ হিসেবে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাল্টে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখন বলছে সংবিধানের আলোকেই নির্বাচন হবে। অন্য কোনোভাবে হবে না। আবার বিএনপি বলছে, তাদের করা ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে। কেননা, ওই ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ ও জালিয়াতিমুক্ত নির্বাচন হয়ে আসছিল। সেটি বাতিল করার অর্থ– ভোট ছাড়াই ক্ষমতার মসনদে থাকার অপচেষ্টা।

উভয় পক্ষের সামনে-পেছনে বা মধ্যিখানে জনগণ নামক রাষ্ট্রের মালিক বা ভোটাররা নেই। কী অদ্ভুত চিন্তা জনগণের সেবকরূপী রাজনীতিকদের! জনগণ দ্বারা নয়, যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকাই হচ্ছে রাজনীতিকদের মৌলিক প্রয়াস। তা করতে গিয়ে জামায়াতরূপী অন্ধকারের শক্তিগুলোকেও পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। জনগণ এদের প্রত্যাখ্যান করেছে সেই একাত্তর সালে। এদের থাকার কথা ছিল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির খেলায় এরা শুধু নিজেদের তবিয়তই বহাল রাখেনি, বরং কালে কালে শক্তি সঞ্চয় করেছে। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে ছোবল মেরেছে দেশের মৌলভিত্তির ওপর। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, যারা নিজেদের স্বাধীনতার চ্যাম্পিয়ন বলে দাবি করে, কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের জয়গান গায়, তারাই আজকে হীনস্বার্থে ওই অপশক্তিকে পুনর্জীবন দিচ্ছে। এই চিন্তা ও চেষ্টার অন্ধ গলি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তাদের, না হলে এ দেশের জনগণের ভোট প্রয়োগের অধিকার যেমন কায়েম হবে না; তেমনি বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

ড. মাহবুব হাসান: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×