ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃতিত্বের পেছনে নেতারা, বাড়তি খরচ গুনছে বিশ্ববিদ্যালয়

ডাকসুর কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ

কৃতিত্বের পেছনে নেতারা, বাড়তি খরচ গুনছে বিশ্ববিদ্যালয়
×

ফাইল ছবি

জুবায়ের হোসাইন

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৪৯

মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাদের বার্ষিক কার্যক্রমের তালিকা প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। তবে কিছু কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। এখতিয়ারবহির্ভূত কাজের অভিযোগে ডাকসুর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডাকসুর কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এক বছরে ডাকসু ১২০টির বেশি বিভিন্ন বিষয়ে সভা, সেমিনার, মেলা ও কর্মশালা করেছে। ৪০টিরও বেশি নানা বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছে। দোয়া ও ইফতার মাহফিল করেছে ৪০টির বেশি। চীন সফরসহ মন্ত্রণালয়, ইউজিসি প্রতিনিধি দলসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের সংখ্যাও ৫০-এর কাছাকাছি। এ ছাড়া ৫০টির বেশি বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, শোভাযাত্রা, খেলাধুলার আয়োজন ও স্পন্সর করেছে ডাকসু। সব মিলিয়ে বছরজুড়ে তিন শতাধিক কার্যক্রম করেছে তারা।

কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, সভা-সেমিনারের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কাজের সংখ্যা ছিল প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, দাবি-দাওয়া পেশ, কাজের আবেদন। যার সংখ্যা দেড় শতাধিক। শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দে অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু, সংকটকালীন আবাসন বৃত্তি, ছাত্রী হলে ভোগান্তি নিরসন, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধের মতো মৌলিক এবং নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলোতে শুধু প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে কাজ শেষ করেছে ডাকসু। কোনো কার্যকর সমাধান আদায় করতে পারেনি তারা।

এ ছাড়া প্রায় ২৫টি কাজে প্রশাসনের বাধার অভিযোগ করেছে ডাকসু। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসে রিকশা চালু, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ, খেলার মাঠ সংস্কার, নারীদের জিমনেশিয়াম উদ্বোধনসহ বড় বড় কাজে প্রশাসন বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ ডাকসু নেতাদের।

দৃশ্যমান কাজের মধ্যে ১৩টি হলের রিডিং রুমে এসি লাগানো, সেন্ট্রাল মসজিদ সংস্কার ও এসি সংযোজন, শহীদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার সংস্কার, চেয়ার-আলমিরা স্থাপন, ছারপোকা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, হলে হলে ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান, মেডিকেল সেবা, কলাভবনে কমনরুম সংস্কার, বিভিন্ন রুটে বাস সংখ্যা বাড়ানো, সান্ধ্যকালীন বাস ও শনিবারের বাস চালু, শাটল সার্ভিস, বই প্রকাশসহ সর্বশেষ শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালু করে ডাকসু।

তবে ডাকসুর এসব উদ্যোগে বিপাকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বাজেটের বাইরে গিয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। গত জানুয়ারি থেকে ডাকসুর উদ্যোগে সান্ধ্যকালীন বাসসেবা চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি রুটে চলাচলকারী এসব বাসের একটি ট্রিপ বাড়ানোয় প্রতিদিন বাড়তি খরচ হচ্ছে ৪৫ হাজার ২৯৮ টাকা। বছরে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান সমকালকে জানান, শিক্ষার্থীদের চাপে শনিবারের বাস ট্রিপ চালু করেছে ডাকসু। অথচ এই বাসগুলোতে যাত্রীসংখ্যা খুব কম। এক দিনের বাস সার্ভিসের জন্য খরচ হচ্ছে দিনপ্রতি আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা। একই অবস্থা সান্ধ্যকালীন বাস সার্ভিসেরও।

এ ছাড়া মসজিদ ও রিডিংরুমগুলোতে এসি লাগানোয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলও গুনতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী আক্রাম হোসেন বলেন, ডাকসু যেসব এসি লাগিয়েছে, সেগুলো তত্ত্বাবধান ও বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য একটা কমিটি করা হয়েছে। তবে এসিগুলোতে এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। 

ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থীরা খুশি হয়েছে কিনা, সেটা সবচেয়ে বড়। টাকা বড় বিষয় নয়। এটা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

এ ছাড়া ক্যাম্পাস এলাকায় ১৯টি বৈদ্যুতিক শাটল সার্ভিস চালু করেছে ডাকসু। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎকর্মীরা বলছেন, প্রতিদিন গাড়িপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকার বিদ্যুৎ লাগে। এতে ১৯টি গাড়ির মাসে বিদ্যুৎ লাগে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকার। যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় এক কোটি ২৬ হাজার টাকায়। তবে এই শাটলগুলো কারা পরিচালনা করছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন অফিসের কাছে।

এ ব্যাপারে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, তারা ৩ মাস অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা তাদের একটা মিটার করে দিয়েছি। এখন মিটার অনুযায়ী তারা বিল দেবে।

এদিকে ডাকসুর কাজের তালিকায় ২ হাজার ৮৪০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পকে নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করা হয়েছে। তবে প্রশাসন বলছে, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই একনেকে অনুমোদিত হয়। আর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রায় দুই মাস পর। প্রকল্পটি ১৫ বছর মেয়াদি একটি মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপ।  

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ডাকসুর তরফে এসব বিষয়কে নিজেদের রাজনৈতিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তারা হয়তো ডাকসুকে একটি বিকল্প প্রশাসন হিসেবে ভাবছে। বাস্তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ারই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানের আওতাভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে থাকা বিষয়গুলোকে ডাকসুর নিজস্ব অর্জন হিসেবে দাবি করা বোধগম্য নয়।

একইভাবে চীন সরকারের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ছাত্রীদের জন্য বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হলের কাজকেও ডাকসুর প্রতিবেদনে নিজেদের অর্জনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং চীনের একটি কারিগরি দল জায়গা নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে। 

এ বিষয়ে অধ্যাপক আলফেছানী বলেন, ডাকসু নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর আগেই চীনা সরকারের আগ্রহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গা নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়েছে। 

এ ব্যাপারে জানতে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের সঙ্গে দুই দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, প্রকল্পটি ডাকসুর মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়েছে এবং অর্থ ছাড়ের পর নানা জটিলতার মধ্যেও তারা প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়েছেন।

ছাত্রীদের হলে প্রবেশের সময় রাত ১০টা থেকে বাড়িয়ে ১১টা করার সিদ্ধান্তকেও ডাকসুর অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ১ সেপ্টেম্বর এ সিদ্ধান্ত নেয়। রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, মেয়েদের হল রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ হওয়ায় আমরা আন্দোলন করেছি। সেখানে ডাকসু সমর্থনও করেনি। অথচ এখন তারা হল এক ঘণ্টা পরে বন্ধ হওয়ার কৃতিত্ব নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ডাকসু পুরো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মের আলাদা কৃতিত্ব দেখানোর সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

×