সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
বাদ পড়াদের তথ্য পুনর্যাচাই নিয়োগপত্র ধাপে ধাপে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা গতকাল রোববার রাজধানীর শাহবাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫০ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০১
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও বাদ পড়া প্রার্থীদের তথ্য আবার যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন করে জেলায় জেলায় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গতকাল রোববার এসব প্রার্থীর তথ্য পুনর্যাচাই শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি জেলায় বাদ পড়া প্রার্থীদের নামে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র ইস্যুও শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্রটি জানায়, যাচাই-বাছাইয়ের কারণে যেসব সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নিয়োগপত্র আটকে আছে, প্রয়োজনে নতুন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাদের তথ্য আবার যাচাই করা হবে। ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া প্রার্থীদের পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে।
এদিকে নিয়োগপত্র না পেয়ে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন কয়েকশ প্রার্থী। বেলা ১১টা থেকে শাহবাগ থানার সামনে জাতীয় জাদুঘর-সংলগ্ন এলাকায় ‘সারা বাংলাদেশের নিয়োগপত্র বঞ্চিত শিক্ষকবৃন্দ’ ব্যানারে তারা অবস্থান নেন। বিভিন্ন জেলার নিয়োগপত্র ধাপে ধাপে প্রকাশের খবর পেয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর আন্দোলনকারীদের অনেকে শাহবাগ ছাড়েন।
আন্দোলনকারীরা জানান, আজ সোমবার সকালে আবার শাহবাগে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন তারা। সবার নিয়োগপত্র প্রকাশ হলে কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা হবে।
ভোলা থেকে আসা চাকরিপ্রার্থী শাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, ‘যেসব প্রার্থীর নাম বাদ পড়েছিল, ধাপে ধাপে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে। এ খবরে আমরা মোটামুটি সন্তুষ্ট।’
গাইবান্ধা থেকে আসা সালেহীন বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের কয়েকজন বাদ যেতে পারেন। বাকিদের নিয়োগপত্র শিগগির প্রকাশ হবে বলে আমরা আশা করছি।’
সচিবালয়ে সাক্ষাৎ পাননি প্রতিনিধিরা
শাহবাগে অবস্থানের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে যায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবির কথা জানানোর চেষ্টা করেন তারা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ না পেয়ে বিকেল ৩টার পর তারা শাহবাগে ফিরে আসেন।
জবিতে জকসু-ছাত্রশক্তির মানববন্ধন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তি জবি শাখা। সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য বন্ধ এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের সামনে মানববন্ধন করে জকসু। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জাতীয় ছাত্রশক্তি।
কয়েক জেলায় দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র
কয়েকটি জেলায় দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়েছে। রাজশাহীতে গতকাল ২২ জনকে নতুন করে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা বিজ্ঞপ্তিতে তাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে প্রথম দফায় ১৩৯ জনসহ রাজশাহীতে দুই দফায় মোট ১৬১ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগপত্র ইস্যু করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীর উপজেলাভিত্তিক তালিকা প্রকাশ ও নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর। এরপর বিভিন্ন জেলার প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও তারা নিয়োগপত্র পাননি। ৪১ জেলায় সহস্রাধিক প্রার্থী এভাবে বাদ পড়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। তাদের একটি প্ল্যাটফর্মের হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় দুই হাজার। ৬১ জেলায় এ সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
গাইবান্ধার ৪১ জন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী গতকাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। এতে তাদের নিয়োগ না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী করণীয় জানানোর দাবি করা হয়। চুয়াডাঙ্গার প্রার্থীরাও স্মারকলিপি দিয়েছেন।
এর আগে ‘কেন্দ্রীয় প্যানেল প্রাইমারি ২০২৫’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ, তথ্য পুনঃযাচাই, প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের সুযোগ এবং যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়া।
গত বছরের শেষ দিকে ৬১ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। পার্বত্য তিন জেলা বাদে ৬১ জেলায় দুই ধাপে ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ৯ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষা হয়। এতে অংশ নেন ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন।
২১ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ হন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের মাধ্যমে তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রায় আট মাস পর ২৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণ শুরুর পরই চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও একাংশের নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
খুলনায় আরও ৬৭ জন নিয়োগপত্র পাবেন
খুলনায় নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়েন ৬৯ জন চাকরিপ্রত্যাশী। তাদের মধ্যে ৬৭ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি
গাইবান্ধায় গতকাল দুপুরে নিয়োগবঞ্চিত ৪১ জনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন পলাশবাড়ী উপজেলার নুরবানু ঝর্ণা।
গোবিন্দগঞ্জে উপজেলার কাটাবাড়ি এলাকার আবু তালহা নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে আমার বাদ পড়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি জানিয়েছেন, আমার গোয়েন্দা রিপোর্ট নাকি সন্তোষজনক নয়। আমার নামে না আছে মামলা, পরিবারের কেউ রাজনীতি করে না, তবুও আমি বঞ্চিত।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার বলেন, ‘সহকারী শিক্ষক পদে ৪৫৬ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮ জন কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি ৪১ জনের পুলিশ ভেরিফিকেশন সন্তোষজনক নয়। কেন সন্তোষজনক নয়, তা আমারও জানা নেই।’
বরিশালে ৭২ জন নিয়োগপত্র পাননি
বরিশাল জেলায় ৭২ জন নিয়োগপত্র পাননি। এর সুরাহা চেয়ে গতকাল দুপুরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। নিয়োগ বাতিল বা স্থগিতের কোনো লিখিত আদেশ, প্রতিবেদন কিংবা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত থাকলে তার অনুলিপি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বঞ্চিতরা।
এদিকে মানিকগঞ্জে ২২ জন নিয়োগপত্র পাননি। গতকাল দুপুরে বঞ্চিতরা দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন।
চট্টগ্রামে নিয়োগপত্র পাননি ৪৮ জন
চট্টগ্রামে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি ৪৮ জন। দুটি গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা নিয়োগপত্র পাননি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহম্মদ বলেন, ‘৪৮ জন নিয়োগপত্র পাননি। এতে আমাদের কিছুই করার নেই।’
বগুড়ায় বাদ পড়েছেন ৪৮ জন
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, বগুড়ায় ৩০৭ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৯৬ জন। চূড়ান্ত নিয়োগপত্র পান ২৪৮ জন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেজোয়ান হোসেন বলেন, বাদ পড়া ৪৮ জনের বিষয়ে আজকে জরুরি সভা হয়েছে। তাদের মধ্যে আরও কয়েকজনকে নেওয়া হবে।
এদিকে সিরাজগঞ্জে নিয়োগপত্র পাননি তিনজন। পুলিশ ভেরিফিকেশন ও প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ে তাদের বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসার পর নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়োগপত্র পাননি ৫০ জন
ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়োগপত্র পাননি ৫০ জন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন জানান, ‘বাদপড়াদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত যা আসবে আমরা তা বাস্তবায়ন করব।’
অন্যদিকে কুমিল্লায় ৫০৮ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার পর ৪৭৭ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। এর মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন কারণে ৭৭ জন নিয়োগপত্র পাননি।
পটুয়াখালীতে নিয়োগপত্র পাননি ২০ জন
পটুয়াখালীতে নিয়োগপত্র পাননি ২০ জন। তবে তারা কী কারণে বাদ পড়েছেন তা জানায়নি প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।
এদিকে রাজবাড়ীতে বঞ্চিত ১০ জন প্রার্থী। জেলায় ৮৪ জন প্রার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তাদের মধ্যে ৬ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। ৭৮ জনের মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগের বিষয়ে আদেশ জারি হলেও ১০ জন নিয়োগপত্র পাননি।
- বিষয় :
- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
- শিক্ষক নিয়োগ