ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় ‘সেবা হাব’ গড়ার প্রস্তাব

মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় ‘সেবা হাব’ গড়ার প্রস্তাব
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে গত ৮ সেপ্টেম্বর ‘মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা: গুণগত মান ও টেকসই উন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। সমকাল ও ‘জননী’ প্রকল্প যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক নজরে জননী প্রকল্প

জননী প্রকল্প (স্ট্রেন্থেনিং দ্য মেটারনাল অ্যান্ড নিওনেটাল হেলথ সিস্টেম ইন রংপুর, বাংলাদেশ) রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায় মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কোইকার অর্থায়নে, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে আরডিআরএস বাংলাদেশ এবং গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সহযোগী হিসেবে রয়েছে আইসিডিডিআর,বি। ২০২৩ সালের ১ মার্চ শুরু হওয়া প্রকল্পটি প্রথম পর্যায়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। বর্তমানে রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার ১৩টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ের কাজ চলছে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিদ্যমান নবজাতক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে মা ও নবজাতক মৃত্যুর হার কমাতে সহায়তা করা; বিশেষ করে দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সেবা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা নারী ও পরিবারের মধ্যে নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা এবং নবজাতকের যত্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে। কমিউনিটি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করে সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ নিশ্চিত করাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। দীর্ঘ মেয়াদে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে মা ও নবজাতকের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশ গড়ে তোলা এই উদ্যোগের মূল প্রত্যাশা। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের জটিলতার ক্ষেত্রে দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের সহযোগী হিসেবেও কাজ করছে জননী প্রকল্প। 

ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম
পরিচালক, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সমন্বিত থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে সেবা পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু আমরা এখনও দেখছি, গ্রামাঞ্চলের নারীরা জরুরি প্রসূতিসেবার জন্য সরাসরি মেডিকেল কলেজ বা টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালে যাচ্ছেন। এতে টারশিয়ারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, রোগীদের খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে অফিস কর্মঘণ্টার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সীমিত উপস্থিতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জননী প্রকল্পের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মডেলে সরকারি-বেসরকারি ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’-এর মাধ্যমে অফিস সময়ের পরও গাইনি বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেস্থেটিস্ট নার্সসহ সমন্বিত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। অফিস কর্মঘণ্টার পরও এ মডেলে জরুরি সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ‘হাব’ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে প্রাথমিক সেবাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা এবং জননী প্রকল্পের পরিকল্পনার সঙ্গে কিন্তু সামঞ্জস্য আছে। জননী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, এখানে নতুন কর্মী যুক্ত হলে আরও ভালো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

ডা. মো. নুরুল ইসলাম
পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

জননী প্রকল্প শেষ হলেও এর সুফল ধরে রাখাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। জননী প্রকল্প ৪০টি ইউনিয়নে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করে রেফারেল হার ২০ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছে এটি বড় সাফল্য। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আঞ্চলিক চাহিদা অনুযায়ী ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’ এবং বার্ষিক প্রকিউরমেন্ট পরিকল্পনা জরুরি। প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত সিজারিয়ান সেকশন কমানো সম্ভব। প্রতিটি উপজেলা ও জেলার সমস্যা এক নয়। কোনো উপজেলা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এগিয়ে থাকলেও পাশের কোনো উপজেলা দুর্গম এলাকা হওয়ায় পিছিয়ে থাকতে পারে। তাই কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। দেশের সব উপজেলার জন্য একই ধরনের উপকরণ কেনার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা উচিত। একটি কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব করাতে গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, কী কী উপকরণ প্রয়োজন তা আগে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, ওষুধ, অক্সিজেনসহ অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

বিকাশ কুমার দাস
পরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা, রংপুর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

রংপুরে মাতৃসেবার চাহিদা অনেক। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এখানে ভালো ফল দিয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রায় ৩০ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় কার্যকর মনিটরিংয়ে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ও কনসালট্যান্ট থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জননী প্রকল্পের উদ্ভাবনী অভিজ্ঞতা সরকারি নীতিমালায় যুক্ত করা গেলে প্রান্তিক সেবার মান আরও বাড়বে। রংপুর বিভাগের জনসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখের মতো। সেই হিসাবে মাত্র দুটি জেলায় আমরা যে এতগুলো সার্ভিস দিতে পেরেছি, এটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। এখানে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যে সমন্বয় বা টিমওয়ার্ক, সেটি অসাধারণ। রংপুর বিভাগীয় শহরের ভেতরে পড়ায় আমাদের এখানে জনবল অপেক্ষাকৃত ভালো আছে। অন্যান্য জেলায় যে সংকট আছে, এখানে তা অতটা প্রকটভাবে নেই। আমার প্রত্যাশা হচ্ছে যে প্রতিটি ডেলিভারি যখন হবে, একজন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী একটু পাশে থাকবেন। যদি বিপদ হয়, ব্লাড সার্কুলেশন বা ট্রান্সফিউশনের ব্যবস্থা থাকবে, আলট্রাসনোগ্রামের ব্যবস্থা থাকবে। আমরা চেষ্টা করব নরমাল ডেলিভারির। কিন্তু যদি বিপদ হয়, আমাদের জরুরি ব্যাকআপ থাকতে হবে। আর সেই পর্যায়ে আসতে গেলে হয়তো সময় লাগবে।  
 

ডা. আ. ন. ম. মোস্তফা কামাল মজুমদার
উপপরিচালক, এমসিএইচ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

পরিবার পরিকল্পনা থেকে আমরা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করি। আমাদের তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে। জাতীয় পর্যায়ে আমাদের কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় ২৮৩টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র আছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে তিন হাজার ২৯০টি।  
আমরা ২৪/৭ স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে এখনও প্রস্তুত নই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কল্যাণ কেন্দ্রে পাঁচজন কর্মীর একটি টিমের মাধ্যমে সেবা দিয়ে থাকি। এর মধ্যে এএনসি, পিএনসি ও ডেলিভারি সেবা সংশ্লিষ্ট কিন্তু একজন (এফডব্লিউভি)। আর একজন কর্মী দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। সার্বক্ষণিক ভালো সেবা দিতে হলে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার জন্য জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন। আমরা প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চারজন করে মিডওয়াইফ দেওয়ার প্রস্তাবনাও দিয়েছি। এক বছর ধরে মা ও নবজাতকের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার যেভাবে ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে থাকি, অর্থের সংকুলান না হওয়ায় সেটি আমরা দিতে পারিনি। নতুন করে এটি এখন প্রকিউরমেন্ট পর্যায়ে রয়েছে, আমরা আশা করছি আগামী নভেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারব। 

ইসরাত জাবীন
উপপরিচালক (প্রোগ্রাম মনিটরিং, আইইএম ইউনিট), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিটের কাজ হচ্ছে জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করা এবং আচরণ পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করা। জননী প্রজেক্ট যে দুটি জেলায় (রংপুর ও লালমনিরহাট) প্রধানত কাজ করছে, সেখানকার কিছু অংশ অত্যন্ত দুর্গম এবং মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে আছে। এই পিছিয়ে থাকার কারণে সেখানে বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেক বেশি। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে অভিভাবকরা উপযুক্ত বয়সের আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি জননী প্রজেক্টের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, তারা আটজন কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা মাকে একসঙ্গে করে নিবিড় পরিবীক্ষণে রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করছেন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করতে সঠিক ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কর্মী ও কর্মকর্তা পর্যায়ে তীব্র সংকট রয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি বরাদ্দ সংকটের কারণে নতুন জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না; এমনকি কেনাকাটার জটিলতার কারণে কন্ট্রাসেপ্টিভ বা গর্ভনিরোধক সামগ্রীরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেখানে ২০ জন কর্মী দরকার, সেখানে আছেন মাত্র পাঁচজন! এই জনবল ঘাটতি পূরণ না করে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

ডা. সাবিনা আশরাফী লিপি
সহকারী পরিচালক, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ নিউট্রিশন সার্ভিস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং প্রজেক্ট ২০২৫ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলবে। প্রকল্পটির অনুমোদন সম্প্রতি হয়েছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্য একাধিক অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ ‘মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট’ (এমএমএস) চালু করা হবে। প্রচলিত আয়রন ট্যাবলেটের পরিবর্তে এতে আয়রনের পাশাপাশি ফলিক এসিডসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি থাকবে। একটি কৌটায় প্রায় ১৮০টি ট্যাবলেট থাকবে। এর মাধ্যমে মা ও নবজাতকের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসার প্রবণতা বাড়বে। সারাদেশে প্রকল্পটির কার্যক্রম চললেও ডিএলআই যুক্ত থাকায় সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে লেবার রুমগুলোকে গাইডলাইন ও প্রটোকল অনুযায়ী প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় এসব লেবার রুমের মেরামত, সংস্কার ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য জাতীয় মাতৃস্বাস্থ্য রেফারেল গাইডলাইন অনুসরণ করে রেফারেল লিংক কার্যকর করা হবে। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ব্যবস্থাও প্রকল্পের আওতায় রাখার সুযোগ রয়েছে। 

ডা. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিওপি-এমসিজিএল প্রজেক্ট, Jhpiego Bangladesh

সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। কিন্তু জনবলের প্রকট সংকট রয়েছে। জননী কিংবা আমি যে প্রকল্প নিয়ে করছি ‘মোমেন্টাম কান্ট্রি অ্যান্ড গ্লোবাল লিডারশিপ’– সব প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারকে সহযোগিতা। যাতে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনা যায়।  সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাতৃত্বকালীন ভাতা শুধু প্রথম গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি-১-এর সঙ্গে যুক্ত না রেখে চতুর্থ এএনসি বা এএনসি-৪-এর সঙ্গেও যুক্ত করা দরকার। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যাতে সেবা বন্ধ না হয়, সেজন্য শুরু থেকেই সরকারকে সম্পৃক্ত করে ‘সেরা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাগুলো’ জাতীয় নীতিতে রূপান্তর করা যেতে পারে।  
৫০টি বেডের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা যায় দুইশ-আড়াইশ রোগী ভর্তি আছে। তো সেখানে মানসম্মত সেবা কীভাবে দেওয়া সম্ভব? এ ক্ষেত্রে স্থানীয় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ও ব্যক্তিগত অনুদানকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। আপনি যদি গুণগত সেবা দিতে চান ইউনিয়ন পর্যায়ে বলুন, উপজেলা পর্যায়ে বলুন কিংবা জেলা পর্যায়ে বলুন– কর্মী ছাড়া মান নিশ্চিত করতে পারবেন না। দক্ষ জনবল এবং নতুন কর্মী নিয়োগ দুটিই প্রয়োজন। আশা করা যায়, নতুন সরকার এ বিষয়ে বাড়তি নজর দেবে।

মাসুমা রহমান নাবিলা
উপস্থাপিকা, মডেল ও অভিনেত্রী

রংপুরের জননী প্রকল্পের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আমার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। সেখানকার মাতৃস্বাস্থ্যসেবার মান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সত্যি প্রশংসাযোগ্য। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রতিটি দেয়ালে পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন যত্ন ও সন্তান প্রসবের পর করণীয় বিষয়ে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা মায়েদের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমি পাঁচ বছর আগে সন্তানের মা হয়েছি। তখন আমি কিন্তু অনেক বিষয় জানতাম না, যেটি রংপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দেয়ালে লেখা তথ্য থেকে জানতে পেরেছি। রংপুরের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কয়েকজন অন্তঃসত্ত্বা ও সম্প্রতি সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তানের মা হয়েছেন। আগের সন্তানগুলো বাড়িতে প্রসব করলেও এবার তারা আত্মীয় কিংবা ‘জননীবন্ধু’র মাধ্যমে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে তারা অনেক ভালো সেবা পেয়েছেন। সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা (মিডওয়াইফ) অভিজ্ঞ ও দক্ষ। তবে মাত্র দুজন কাজ করছেন। এখানে অন্তত চারজন কর্মী প্রয়োজন। এ খাতে যেন দক্ষ মিডওয়াইফ নিয়োগ পান। জননীবন্ধুরা বাল্যবিবাহ বন্ধ, মা ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। আমি চাইব, প্রকল্প শেষ হলেও এ ধরনের উদ্যোগ যেন থেমে না যায়। 

ড. ইমরুল কায়েস মুনিরুজ্জামান
নির্বাহী পরিচালক, আরডিআরএস বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে একটি সম্পূরক শব্দ জড়িয়ে আছে, তা হলো ‘ব্যবস্থাপনা’। ব্যবস্থার অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে, যা হয়তো সহসা দূর করা যায় না কিন্তু ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সেবার মান বাড়ানো সম্ভব।
এর আলোকে যে জননীবন্ধু নেটওয়ার্ক যা মূলত কমিউনিটিভিত্তিক অ্যাপ্রোচ, সেটির স্থায়িত্ব বা টেকসই রূপ দিতে বেশি প্রয়োজন ক্ষমতায়ন। এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গড়ে তোলা এবং তাদের ক্ষমতায়ন করা প্রয়োজন। জননীবন্ধু নেটওয়ার্ককে টেকসই করতে স্বেচ্ছাসেবীদের সামাজিক স্বীকৃতি এবং পারিবারিক সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। নেটওয়ার্কের সদস্যদের পরিবারও যেন তাদের উৎসাহ দেয়, এটি নিয়েও কাজ করা দরকার। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যারা যুক্ত আছেন, তাদেরও এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। যে বা যারা একজন রোগীকে স্বাস্থ্যসেবার জন্য সঠিক জায়গাটিতে পাঠাচ্ছেন, তাদের অন্তত যেন ধন্যবাদটা দেওয়া হয়। নেটওয়ার্ক সদস্যদের কাছে যেন সব তথ্য থাকে, এজন্য ভালোভাবে প্রশিক্ষিত করা দরকার। যেন তারা সঠিক তথ্যটি জানে কোথায় রোগী পাঠাতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে তাৎক্ষণিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা করতে হবে। 

ডা. দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক, ইউনিসেফ

নবজাতকের মৃত্যু কমাতে হলে সবার আগে মাতৃস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ২০০৩ সাল থেকে হাসপাতালগুলোতে সমন্বিত জরুরি প্রসূতি সেবা চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত ছয়জন গাইনি বিশেষজ্ঞ ও চারজন অ্যানেস্থেটিস্ট প্রয়োজন। অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের তালিকার পাশাপাশি এএনসি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। আলোচনায় উঠে এসেছে যে আমাদের এএনসি সেবা ভালো হলেও চতুর্থ এএনসির হার অনেক কম। সে ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের যে ভাতা দেওয়া হয়, তা শুধু প্রথম এএনসি-১ দেখে না দিয়ে চতুর্থ এএনসি সম্পন্ন করার শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। তা না হলে ফোর্থ এএনসি না হলে যেন ভাতা দেওয়া বন্ধ করা হয়, এমন নিয়ম করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করার বিষয়টিও জোর দেওয়া দরকার।
এখন দুর্গম এলাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে মিডওয়াইফদের এই কেয়ার বা সেবা সার্ভিসটিকে ২৪ ঘণ্টা (২৪/৭) চালু রাখতে হবে। এজন্য সেখানে অন্তত চারজন মিডওয়াইফ লাগবে, তবে দ্রুত কাজ শুরু করতে অন্তত দুজন হলেও দরকার। আগে যে শূন্যপদ আছে, সেটা পূরণ জরুরি।

ডা. শামস আল আরেফিন
জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআর,বি

জননী প্রকল্পের উদ্ভাবনগুলো মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে অন্য এলাকাতেও পরিবর্তন আনতে পারে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। এই মডেল সম্প্রসারণে প্রধান সীমাবদ্ধতা কী হতে পারে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। এ জন্য সরকারের সঙ্গে একটি সার্বক্ষণিক ও সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। 
সরকারের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে; চাইলেই সবকিছু রাতারাতি পাওয়া যায় না; এই বাস্তবতা বুঝে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রকল্পটি সারাদেশে সম্প্রসারণ করতে হবে। নতুন সরকার এসেছে আর তারাও চাচ্ছে গ্রামে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে। এজন্য প্রকল্পটির কাজের পদ্ধতি সরকারের সঙ্গে শেয়ার করা যেতে পারে। এর আগে কিন্তু সরকারের এমন অনেক প্রকল্প ছিল, তবে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের জরুরি সংকট যদি আমরা ইউনিয়ন কিংবা উপজেলা পর্যায় থেকে সমাধান করতে পারি, তবে আমাদের টারশিয়ারি লেভেলে চাপটা কমে যাবে। এই জন্য সেবা হাব তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলছে, সেটি দ্রুত করতে পারলে সংকট কিছুটা কাটবে।
 

ডা. গোলাম মোদাব্বীর
সেক্টর লিড, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, সেভ দ্য চিলড্রেন

স্বাস্থ্য খাতে শুধু জনবল নিয়োগ করলেই হবে না; পদায়ন, স্থায়ীকরণ এবং নীতিগত সংস্কারেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার আইনি জটিলতা কমানোর পাশাপাশি শহর ও প্রান্তিক এলাকার জনবল বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা যেতে পারে। উন্নয়ন সহযোগীদের প্রকল্প এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন বছর পরও সরকারি ব্যবস্থায় তা চালু রাখা যায়। স্থানীয় সরকারের বাজেটের ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মা ও নবজাতক সেবায় সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা, সেটিও নজরদারিতে রাখা জরুরি। গত সাড়ে তিন বছরে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে বিনামূল্যে প্রায় ২০ হাজার মায়ের সফল ও নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব করানো সম্ভব হয়েছে। তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এ অগ্রযাত্রা যাতে থেমে না যায়, সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি ইউনিয়নে আলাদা সেবা না রেখে পার্শ্ববর্তী দু-তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে একটি ‘হাব’ গঠনের প্রস্তাব সময়োপযোগী। স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা ধরে রাখতে নিয়মিত মেন্টরশিপও কার্যকর। তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতে কাজের মানসিকতার পার্থক্য দূর করতে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর) বিশেষজ্ঞ, ইউএনএফপিএ

মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবায় একসময় ভালো অগ্রগতি ছিল। কিন্তু সেটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাইলে আমাদের প্রতিবছর মা ও নবজাতক মৃত্যুর হার ৭ শতাংশ করে কমাতে হবে। কিন্তু আমরা এখন সেটি সাকল্যে এক থেকে দেড় শতাংশ হারে কমাতে পারছি। আমাদের অনেক লার্নিং হয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো সবাই জানে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এখানে অনেক ধরনের সমস্যা রয়েছে। জনবল সংকট তীব্র। দুই থেকে তিন বছর ধরে মা ও শিশুর জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিগুলোর কোনো সরবরাহ নেই। আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছি কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় উদ্যোগগুলো আটকে থেকেছে। এখান থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের যে অবকাঠামো আছে, এগুলোকেই সঠিকভাবে ফাংশনাল করা দরকার, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দরকার। জনবল, ওষুধ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার। মেটারনাল স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। মাঠ পর্যায়ের অনেকেই প্রাইভেট হাসপাতালের হয়ে কাজ করেন, এটা বন্ধ করা দরকার।

আব্দুস সামাদ আজাদ জুয়েল
চেয়ারম্যান, কান্দি ইউনিয়ন পরিষদ, রংপুর

পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলেও জনবলের অভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদের কর রাজস্ব থেকে স্বাস্থ্য খাতে আইনগত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে আলাদা স্থানীয় মনিটরিং ও স্বাস্থ্য তহবিল গঠন জরুরি।  স্থানীয় সরকার বিভাগ একেবারে তৃণমূলে কাজ করে এবং আমরা আজকে মা ও নবজাতক যে শিশুকে নিয়ে চিন্তা করছি, এটা কিন্তু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়েই। একবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মা অন্তঃসত্ত্বা হওয়া থেকে ডেলিভারি-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ কাজ করছে। তবে এখানে আমরা যারা জনপ্রতিনিধি রয়েছি, আমাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা মনে করেন, আমরা ইউনিয়ন পরিষদে কেন যাব? আমার মনে হয়, আমাদের যদি কমিউনিটি লেভেল থেকে শুরু করে আমাদের ইউনিয়নে যে কমিউনিটি হাসপাতালগুলো রয়েছে, পরিবার পরিকল্পনার যে কর্মী রয়েছে– মাঠ পর্যায়ে আমরা যদি সমন্বিত প্রচেষ্টা নিতে পারি, সে ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা যে অবস্থানে এখন রয়েছি, এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। আর সেটা সম্ভব হলে গর্ভকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতক আরও ভালো সেবা পাবে।

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়
প্রকল্প পরিচালক, জননী

মূল প্রবন্ধ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ‘জননী’ প্রকল্প মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১৯ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। ‘চার বিলম্ব’ মোকাবিলায় জননীবন্ধু নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট ও বহির্বিভাগীয় সেবার মাধ্যমে সচেতনতা ও সেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় তিন-চারটি ইউনিয়নকে একটি হাবের আওতায় এনে ২৪ ঘণ্টা প্রসূতিসেবা, স্বাভাবিক প্রসব ও জরুরি সেবা নিশ্চিতের একটি মডেল আগামী অক্টোবর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। 
অন্যান্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাথমিক যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গর্ভকালীন, প্রসব-পরবর্তী ও রেফারেল সেবা দেবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা প্রসূতিসেবা, স্থানীয় সরকারভিত্তিক অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শাহেদ মুহাম্মদ আলী 
সম্পাদক, সমকাল
এই আলোচনায় আমরা একটি প্রশ্ন নিয়ে বসেছিলাম– মা ও নবজাতকের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। আলোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, একটি কার্যকর মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা ও উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত পুরো সেবা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আর এই পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে কমিউনিটিকে যুক্ত করা জরুরি– কারণ শেষ পর্যন্ত সেবাটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো– আমাদের নীতি আছে, পরিকল্পনা আছে, অভিজ্ঞতা আছে; এখন প্রয়োজন সেগুলোকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। তাই আজকের সুপারিশগুলো সরকারের ডিপিপি, বাজেট, জনবল পরিকল্পনা এবং বাস্তব কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হোক– এটাই প্রত্যাশা। একজন মায়ের নিরাপদ প্রসব এবং একটি নবজাতকের নিরাপদ আগমন অন্যতম মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কমিউনিটি ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

সুপারিশ

প্রতিটি উপজেলায় ২-৩টি ইউনিয়ন নিয়ে একটি সমন্বিত সেবা হাব প্রতিষ্ঠা।
কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা। 
জেলা হাসপাতাল ও নির্বাচিত হাব উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করা। 
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার।
কৌশলগত ক্রয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূরীকরণ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা রোগী পরিবহন সেবা চালু করা।
দক্ষ জনবল নিয়োগ ও ধরে রাখা। 
নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার তথ্য পৌঁছে দিতে তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করা।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও আলোচক ছিলেন

মো. সাইফুল ইসলাম
উপপরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা, রংপুর
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
মো. শাহজালাল
উপপরিচালক, পরিবার পরিকল্পনা, লালমনিরহাট পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

গোলটেবিল 
বৈঠকে আরও 
অংশ নেন 

নারে কিম
প্রকল্প উপদেষ্টা, জননী, সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়া
সে-ইয়ন কিম
তদারকি ও মূল্যায়ন উপদেষ্টা, জননী
সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়া
ডা. মুশাররাত জাহান
ম্যানেজার-পলিসি অ্যাডভোকেসি, জননী
সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ
ডা. গোলাম ফখরুদ্দীন (ফাহিম) 
ম্যানেজার-ফিল্ড অপারেশন্স, জননী 
সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ
জাহানারা হৃদিতা
টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট, কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন, জননী, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ

মোহাম্মদ ফরাজদুক ভূঞা
প্রকল্প সমন্বয়কারী, জননী, আরডিআরএস বাংলাদেশ

সমন্বয়

হাসান জাকির
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল

আরও পড়ুন

×