গাড়িতে বাড়তি ভাড়া, চলাফেরায় কাটছাঁট
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
অফিসে যাওয়ার জন্য রোজকার মতো রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী শর্মি জামান। ফার্মগেট যাওয়ার বাস এলো; উঠলেনও। কিন্তু ভাড়া দিতে গিয়ে হিসাবটা আর আগের মতো মিলল না। যে পথে ১০ টাকা দিয়ে এতদিন যাতায়াত করতেন, সেখানে দিতে হচ্ছে ১৫ টাকা। একলাফেই বেড়ে গেল পাঁচ টাকা! শর্মির মতো অনেকেরই এখন যাতায়াতের হিসাবটা নতুন করে কষতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাস ভাড়া বেড়েছে। এই দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে রাইড শেয়ারিং, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারেও। বাড়তি খরচ সামলাতে কেউ গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিচ্ছেন, কেউ অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত বাদ দিচ্ছেন। আবার কেউ মোটরসাইকেলের বদলে বাস বা হেঁটে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
রাজধানীর শনির আখড়া, আসাদগেট, ফার্মগেট, বাংলামটর, গুলশান, মালিবাগ ও হাজীপাড়া ঘুরে গতকাল মঙ্গলবার এমন চিত্রই দেখা গেছে। গাড়িতে বেশি ভাড়া নিয়ে যাত্রীর সঙ্গে বাসকর্মীদের কথা কাটাকাটি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায় কোথাও কোথাও। পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা ব্যক্তিদের সরকারের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়তেও দেখা যায়।
‘প্রয়োজন ছাড়া আর গাড়ি বের করা যাবে না’
বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল হকের সঙ্গে কথা হয় গুলশানের ঢাকার চাকায়। তিনি জানান, ব্যক্তিগত গাড়িতেই অফিসে যেতেন। গত কয়েক মাসের জ্বালানির দাম এত বেড়েছে মাস তিনেক ধরে তাঁর গাড়ি গ্যারেজে পড়ে আছে। শামসুল হক বলেন, আগে প্রয়োজন হলে গাড়ি নিয়ে বের হতাম। এখন বের হওয়ার আগে তেলের খরচ হিসাব করি। খুব দরকার না হলে রিকশা বা অন্য যানবাহনে চলে যাই। এখন তো দাম আরও বাড়ল। ফলে আপাতত গাড়িটা গ্যারেজেই থাক।
পুলিশ প্লাজার কাছে কথা হয় ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা রাকিব হাসানের সঙ্গে। জানালেন, নিয়মিত মোটরসাইকেলে তিনি অফিসে যান। সময় বাঁচাতে আগে অল্প দূরত্বেও বাইক নিয়ে বের হতেন। সোমবার থেকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত বাদ দিয়েছেন। কারণ তেলের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
রাইড শেয়ারিংয়েও হিসাব বদল
সময় বাঁচাতে নিয়মিত রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফারজানা রহমান। মিরপুরের শ্যাওড়া পাড়া থেকে বসুন্ধরার ক্যাম্পাসে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে যানজটের শহরে বাসের চেয়ে বাইকে যাতায়াত করেন। অকটেনের দাম বাড়ার পর থেকে এই সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। সোমবার থেকে রাইডপ্রতি ৫০-৭০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।
ফারজানা বলেন, রাইড শেয়ার নিলে সময় বাঁচে, এ কারণেই নিয়মিত নিই। কিন্তু এখন ভাড়া বেশি। প্রতিদিন নেওয়া কঠিন। আবার বাসে গেলে জ্যামে সময় বেশি লাগে। তাই খুব হিসাব করে চলতে হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালকদেরও বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। রাইড শেয়ারিং চালক আরিফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয় পল্টন মোড়ে। জানান, আগে ১৫০-২০০ টাকার তেল দুই দিন চলত। এখন ২৫০-৩০০ টাকার তেল নিতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা সেই অনুপাতে বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছেন না। রাইডও কমে গেছে।
বাসে বাড়তি ভাড়া
সরকারি নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের আগেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে কোনো কোনো বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হয়েছে। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা করা হয়েছে। কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে। আবার কোনো কোনো বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
মৌমিতা পরিবহনে শনির আখড়া থেকে চানখাঁরপুল যেতে আগে ভাড়া ছিল ২০ টাকা। গতকাল দুপুরে নেওয়া হয়েছে ২৫ টাকা। শিক্ষার্থীদের ভাড়াও ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটিও হয়। রাইসুল ইসলাম নামে এক যাত্রী প্রশ্ন তোলেন, নতুন ভাড়ার তালিকা না থাকলে কেন বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। তখন বাসের হেলপার মনির জানান, যাত্রীদের ওঠার আগেই বলেছি আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি। কারণ তেলের দাম বেড়েছে। একই বাসের যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল কাশেম জানান, গতকালও ২০ টাকা ভাড়া দিয়েছেন। আজ ২৫ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সব খরচই বাড়ছে। দুই-তিন মাস ধরে বিদ্যুতের বিল বেশি আসছে। এলপিজি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বাজারের সব পণ্যের দাম বেশি। এবার যাতায়ত খরচও বাড়লও। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে, আমাদের তো বাড়েনি। কীভাবে জীবন চলবে?
জ্বালানির বাড়তি দামে বাড়বে পরিবহন ব্যয়: আইপিডি
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংগঠনটি অবিলম্বে দর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
আইপিডির মতে, দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ডিজেল। পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে বাস ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
- বিষয় :
- গাড়ি
- ভাড়া বৃদ্ধি
- জ্বালানি তেল