মালয়েশিয়া
শ্রমবাজার খোলার আগেই প্রতারণা
চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে এজেন্সি, হাজার মানুষের ভিড়
মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার দিতে আসা ‘ট্রিপল এ ওভারসিজ’ এজেন্সির সামনে ভিড় করে হাজারো মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনের চায়না টাউন থেকে তোলা সমকাল
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৭ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কর্মী নিয়োগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করলেও দেশটির শ্রমবাজার এখনও উন্মুক্ত হয়নি। কবে থেকে কোন পদ্ধতিতে কর্মী যাবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এর আগেই চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সাক্ষাৎকার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিচ্ছে।
একাধিক এজেন্সি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ট্রিপল এ ওভারসিজ নামে একটি এজেন্সির সামনে ভিড় করে হাজারো মানুষ। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের কাছে পল্টন চায়না টাউনের একাদশ তলায় ট্রিপল এ ওভারসিজে সাক্ষাৎকার দিতে এসেছিলেন তারা। তাদের বলা হয়েছিল, মালয়েশিয়া পাঠাতে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে।
হাজারো মানুষের ভিড়ের খবরে প্রথমে পুলিশ আসে। জানাজানি হওয়ার পর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালায় ট্রিপল এ ওভারসিজ কার্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এসকে মনির প্রথমে দাবি করেন, কর্মী নিয়োগে মালয়েশিয়া থেকে চাহিদাপত্র পেয়েছেন। কিন্তু তা দেখাতে পারেননি। পরে আদালত তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ট্রিপল এ ওভারসিজের কার্যালয় সিলগালা করে দেন।
২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বন্ধ রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। গত ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়ে তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস। ২৮ আগস্ট সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলসহ আরও ৩১৩টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে। বোয়েসেলের সাব-এজেন্ট হিসেবে ৬২ প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। এর সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান ট্রিপল এ।
২০১৬ সালে ১০ এজেন্সি এবং ২০২২ সালে ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। যারা পরবর্তী সময় সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। এবারের ২৫ এজেন্সিকেও সিন্ডিকেট বলা হচ্ছে।
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত সোয়া পাঁচ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়া যেতে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে চার লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন যেতে পেরেছিলেন। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও সেই সময় ১৭ হাজার কর্মী যেতে পারেননি। তখন কর্মীপ্রতি ৭৯ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, এবার ছয় থেকে সাত লাখ টাকা লাগতে পারে। সমকাল একটি অডিও হাতে পেয়েছে, যা অনুযায়ী এজেন্সিগুলোকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে জনপ্রতি ‘৫ প্লাস’ হাজার রিঙ্গিত দিতে হবে। প্রতি কর্মীর ভিসাপ্রতি নিয়োগকারীকে দিতে হবে ‘৬ প্লাস’। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্লাসের অর্থ ৫০০। এর মানে ১২ হাজার রিঙ্গিত দিতে হবে, যা চার লাখ ৮০ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এর সঙ্গে যোগ হবে উড়োজাহাজের ভাড়া, এজেন্সির মুনাফা, সরকারি বিভিন্ন ফি।
গতকাল ট্রিপল এ ওভারসিজে আসা মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা বলেছেন, তাদের সাক্ষাৎকারে আসার আগে ধারণা দেওয়া হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা করে লাগতে পারে। বিদেশ যেতে সমস্যা হবে আশঙ্কায় তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। কুষ্টিয়া থেকে আসা একজন সমকালকে বলেছেন, পাঁচ-ছয় লাখ টাকার কথা বলেছে। কেন কীভাবে এসেছেন– প্রশ্নে তারা জানান, তাদের গ্রামে এজেন্সির যে প্রতিনিধি রয়েছেন, তিনি বলেছেন, ঢাকায় গিয়ে সাক্ষাৎকার দিলে চাকরি হবে।
শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, নামে-বেনামে বিভিন্ন এজেন্সি সামাজিক মাধ্যম এবং তাদের দালালদের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রচার চালাচ্ছে। ট্রিপল এ ওভারসিজের মালিক এসকে মনির অবশ্য দাবি করেন, তিনি এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি দেননি। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাওয়ায় বিপণনের অংশ হিসেবে দেশটিতে চাকরি করতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ডাকা হয়েছিল। আর কিছুই নয়।
তবে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের তিন বাক্স পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শামসুল তাবরিজ সমকালকে বলেছেন, যে শ্রমবাজার এখনও খোলেনি, এর জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া যায় না। কাউকে পাঠানোর জন্য প্রলুব্ধ করা যায় না। তারা কাগজপত্র দেখাতে না পারায় জরিমানা এবং প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কোনো অবস্থাতেই কোনো অসাধু বা অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করতে দেওয়া হবে না। যারা নিয়ম অমান্য করবে এবং প্রবাসীদের জিম্মি করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।