ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে সাংস্কৃতিক জাগরণের আহ্বান

গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে সাংস্কৃতিক জাগরণের আহ্বান
×

শোষণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে জাতীয় কনভেনশন করেছে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য। গতকাল শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের আগে অনুষ্ঠিত হয় শোভাযাত্রা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য সাংস্কৃতিক জাগরণকে আরও সংগঠিত করে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পরও কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় নানা বাধা এসেছে। সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা, কর্মকাণ্ডের প্রভাব কমেনি। এসবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। 
গতকাল শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় এক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’ প্রতিপাদ্যে এ কনভেনশন বা সম্মেলনে দেশের ৪৫ জেলা থেকে প্রায় ৫৫০ জন লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরাও যোগ দেন। বক্তারা বলেন, এই সংকটকালে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে মানুষের মনে প্রত্যয় জাগানো এবং একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের পথ তৈরি করা জাতীয় কনভেনশনের মূল লক্ষ্য।

সকালে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে কনভেনশনের উদ্বোধন করেন লেখক ও সাংবাদিক নূরুল কবীর। পরে সংস্কৃতিকর্মীদের একটি শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। 
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় শুরু হয় প্রথম অধিবেশন। গণসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পাহাড়ি নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।

কনভেনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে নূরুল কবীর বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা বারবার হাতছাড়া হয়েছে। ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতার মধ্যে একই ধারাবাহিকতা রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও এতে আশ্চর্যের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নূরুল কবীরের মতে, ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়ে তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পাটাতন তৈরির কাজ আরও গভীরভাবে করতে হবে। সারাদেশ থেকে আসা সংস্কৃতিকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও সংহত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাঁরও আকাঙ্ক্ষার মিল রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের লড়াইয়ের তাগিদে এই কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করছে। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক লড়াই সব ধরনের লড়াইয়ের ভিত্তি। এই লড়াই শুধু মাঠ-ময়দানে হয় না; চায়ের দোকান, পত্রিকা ও ফেসবুকেও তা চলছে। এটি মূলত চিন্তা ও চৈতন্যের লড়াই।
আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অংশ উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, নারীর ঘরে থাকা উচিত, নাচ ভালো নয়, অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ কিংবা অন্য জাতির মানুষ নিম্নমানের–এ ধরনের চিন্তা সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই প্রয়োজন। 
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গ্রাফিতি, গানসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, গণঅভ্যুত্থানে সংস্কৃতির শক্তি প্রকাশ পেয়েছিল। অথচ পরে একটি অংশ শিল্প ও সৃষ্টিশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ লেখক-শিল্পীদের দমন করেছে এবং তাঁদের সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাউলশিল্পী আবুল সরকার বলেন, সবাই এক পথে একসঙ্গে চলতে পারলে চলার পথ সহজ হয়। গান করার কারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে পাঁচ মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে বলে জানান তিনি। 

জেল থেকে মুক্ত হলেও নিজেকে এখনও বন্দি মনে করেন উল্লেখ করে আবুল সরকার বলেন, যেদিন স্বাধীনভাবে গান, নাচ ও বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারবেন, সেদিনই তাঁর প্রকৃত মুক্তি হবে। 
লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, শিল্প-সাহিত্যে প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল–দুই ধরনের ধারা রয়েছে। তাঁর মতে, জনগণের কথা বলে প্রগতিশীল সংস্কৃতি এবং জনগণের জীবনসংগ্রাম থেকে তার শক্তি সংগ্রহ করতে হয়। 

জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৭ বছর ধরে চলে আসা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংস্কৃতিকর্মীরা কলম ধরেছেন। বর্তমান সরকার যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে দলদাসে পরিণত করতে চায় কিংবা ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য তা রুখে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, এই কনভেনশন তাঁকে এমন একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখাচ্ছে, যেখানে সাংস্কৃতিক শক্তি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে। 
নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ নাচের বিরুদ্ধে সামাজিক ও ধর্মীয় বাধার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। স্বাধীনভাবে কথা বলা, গান ও নাচের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নির্বাচিত সরকার পাওয়ার পর বিষয়টি সবার জন্য ভালো হবে বলে আশা করা হলেও দেশ যেভাবে চলছে, তাতে গণমানুষের কথাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত।
সভাপতির বক্তব্যে জামশেদ আনোয়ার বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়ে গেছে। দেশে আইনের শাসনের পরিবর্তে মাজার, ভাস্কর্য ভাঙা, মব-সন্ত্রাস, কবিগান, বাউলগান, যাত্রাপালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের যেভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রয়েছে। তারা স্বাধীন মতপ্রকাশ, মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির ওপর সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করছে। এই পরিস্থিতিতে গণমানুষের পক্ষে সৃজনশীলতার চর্চা ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য ব্যাপক ঐক্যের প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই এই কনভেনশন আয়োজন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×