ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা
৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বের পথে বর্তমান সংসদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নিয়মিত মেয়াদ শেষ হয়েছে গত রোববার। প্রশাসন এখনও নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেনি। এতে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের পর গঠিত ডাকসু।
নতুন নির্বাচন কখন হবে, তার কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হবে কিনা, তা সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা হবে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়। এর ছয় বছর পর ২০২৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর শিবির-সমর্থিত প্যানেল দায়িত্ব নেয়। ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের (গ) উপধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ ৩৬৫ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন দায়িত্ব পালন করা যাবে।
দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে জানতে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, তারা দায়িত্ব ছাড়তে চান। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে না।
ফরহাদ বলেন, ‘প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন না দিলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯০ দিনের দায়িত্ব আমাদের ওপর পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনকে জানালে তারা বলে, ডাকসু নির্বাচন দেবে। কিন্তু কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। তাদের আশ্বাসে আমরা সন্তুষ্ট নই।’
নির্বাচন নিয়ে যা বলছে প্রশাসন
উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হবে। এরই মধ্যে একটি সভা হয়েছে। হল প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশ আছে কিনা, সে বিষয়ে তাঁকে চিঠি দেবে।
উপাচার্য বলেন, ‘এটি বড় কর্মযজ্ঞ। তাই ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তবে আমি কোনো সময়সীমা দিতে পারছি না।’
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, সব ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সম্মতি ও সহায়তা পেলেই নির্বাচনের তারিখ দেওয়া হবে।
ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ডাকসুর বছরব্যাপী কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সম্প্রতি ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের তাঁর ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে ডাকসু ৩৫ কোটি টাকার কাজ করেছে। এই দাবির পর ডাকসুর কার্যক্রম ও ব্যয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘ডাকসু ৩৫ কোটি টাকার কী কাজ করল, আমি জানি না। রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে ভোগান্তি কমাতে কোনো ডিজিটাল পদ্ধতি আনতে পারেনি। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকর ভূমিকা নেই। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও কোনো কাজ নেই।’
নারীদের হলের গেট রাত ১০টার মধ্যে বন্ধের প্রতিবাদে ছাত্রীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে সুমাইয়া বলেন, ‘সেখানে ডাকসু ন্যূনতম সমর্থনও দেয়নি। তারা কয়েকটি গেট বানিয়েছে, এসি দিয়েছে; এসব তো শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান নয়।’
আরেক শিক্ষার্থী সিরাজুম মুনিরা বলেন, ডাকসু কিছু কল্যাণকর কাজ করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্বে এলেও তাদের ভোগান্তির জায়গাগুলো দূর করতে পারেনি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বিষয়ে সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের জানান, তারা নীতিগত জায়গায় কাজ করতে চেয়েছিলেন। রেজিস্ট্রার বিল্ডিংকে পেপারলেস করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসন তা করতে দেয়নি। নারীদের হলের গেট বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা স্মার্ট গেট প্রকল্প এনেছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের অসহযোগিতায় সেটিও হয়নি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দুর্জয় রায় বলেন, ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যার বাইরে গিয়ে ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স করেছে। প্রশাসনের ওপর দায় দিয়ে এই কাজের মাধ্যমে তারা মাদার পার্টিকে (জামায়াত) পুরোপুরিভাবে সার্ভ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব ডাকসু নির্বাচন হোক। তবে প্রশাসন আমাদের এখনও কিছু জানায়নি।’
ডাকসুর কার্যক্রমের মূল্যায়ন জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ডাকসু কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা তারা করেছে, যা ঠিক হয়নি।
উপাচার্য বলেন, ‘তারা অনুমতি না নিয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু করেছে; জুলাই স্তম্ভ স্থাপন করেছে। আমরা নিজেরাও সংশ্লিষ্ট বডির অনুমতি নিয়ে স্তম্ভ স্থাপন করেছি। এ ছাড়া শুনেছি, তারা অনেক জায়গা থেকে টাকা নিয়ে এসেছে। আমরা এখনও হিসাব পাইনি। অডিটের পর এ বিষয়ে জানা যাবে।’
পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল আগের প্রশাসন। বর্তমান প্রশাসনের সময়ে এখন পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, গত নির্বাচনের আগেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল– ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচন চায় না। এবারও একই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের এখনও মিটিংয়ের জন্য ডাকেনি। সামনে ছাত্রদলের নতুন কমিটি আসবে। কমিটি এলে নতুন করে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় আমরা সব সময় পাশে আছি।’
এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা মত আছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমার মনে হয় না, আগামী দুই বছরের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন হবে। কারণ, গত নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয় হয়েছে। আর এখন প্রশাসন তাদের।’
ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. হানিফ বলেন, ডাকসু নির্বাচন হবে। ছাত্রদল নির্বাচন চায় না বা নির্বাচন হতে দেবে না– এমন প্রচারণা সঠিক নয়। তিনি বলেন, কোনো ছাত্র সংগঠনই শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার বাইরে গিয়ে চলতে পারে না।
এখন রুটিন দায়িত্ব
উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ডাকসুর বর্তমান কমিটি অতিরিক্ত ৯০ দিন দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে বিষয়টি সিন্ডিকেটে আলোচনা হবে। সিন্ডিকেট গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপাচার্য বলেন, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখনকার কমিটির দায়িত্বটা হবে রুটিন দায়িত্ব। তারা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না।
- বিষয় :
- ডাকসু নির্বাচন
- ডাকসু
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়