বোয়িং-এয়ারবাসের বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চলছে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর নিয়ে। এই বহর ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে ৪৭টিতে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে। আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি বাংলাদেশের সময় বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটায় নিউইয়র্কে সই হওয়ার কথা। পাশাপাশি ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রস্তাবও যাচাই করছে বিমান। সব মিলিয়ে নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা এগোচ্ছে।
এতে বিমানের বহর আধুনিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দুই বড় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রেও এসেছে বাংলাদেশ। এখন প্রশ্ন শুধু কোন প্রতিষ্ঠানের উড়োজাহাজ কেনা হবে, তা নয়। অর্থায়নের শর্ত, মোট ক্রয়মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, বোয়িং কেনার পর এয়ারবাসের পক্ষ থেকে, অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও চাপ আসতে পারে। বাংলাদেশকে ভাবতে হবে, কীভাবে এই চাপ সামলানো যায়। দুই পক্ষের সঙ্গেই বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপ বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় তাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এত উড়োজাহাজ কেনার আগে বিমানের অবকাঠামো ও জনবলগত সক্ষমতা নিয়েও সমীক্ষা করা দরকার।
শুরু এয়ারবাস দিয়ে
বিমানের নতুন বহর নিয়ে বড় পরিসরের পরিকল্পনার শুরু এয়ারবাসকে ঘিরে। ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকারের সময়ে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা সামনে আসে। এ নিয়ে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা এগোয়। একই সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বাংলাদেশ সফরেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
২০২৩ সালের ৩ মে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ এয়ারবাসের প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য দুটি কমিটিও গঠন করা হয়। পরে প্রস্তাবটি নিয়ে আরও মূল্যায়ন ও আলোচনা চলে। তবে তখন কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিমানের উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে বোয়িংয়ের প্রস্তাব এগিয়ে যায়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বোয়িংয়ের প্রস্তাব ও সংশোধিত চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা করে বিমান। ৩০ ডিসেম্বর বিমানের পরিচালনা পর্ষদ ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।
১৪ বোয়িংয়ের চুক্তি
২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করে বিমান। চুক্তির তালিকামূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ও চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। প্রথম উড়োজাহাজ ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং শেষটি ২০৩৫ সালের অক্টোবরে সরবরাহের কথা।
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের অর্থায়নে হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে ঋণের সুদহার, মেয়াদ ও পুরো অর্থায়ন কাঠামোর বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি। এ কারণে তালিকামূল্য ও প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
আরও ১১ বোয়িং
১৪টির পর আরও ১১টি বোয়িং কেনার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্ক সময় বুধবার বিকেলে চুক্তিটি সই হওয়ার কথা। এ চুক্তি হলে বোয়িং থেকে বিমানের পরিকল্পিত সংগ্রহ বেড়ে দাঁড়াবে ২৫টিতে। তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের মডেল, দাম, অর্থায়ন ব্যবস্থা ও সরবরাহ সূচি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এই চুক্তির মোট আর্থিক দায় এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের সমীকরণ
বোয়িং কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তর বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার পরিকল্পনার কথা জানায়।
প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তা ২০ শতাংশে নামানো হয়। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিতে হার আরও কমে ১৯ শতাংশ হয়। একই চুক্তির যৌথ বিবৃতিতে উড়োজাহাজ সংগ্রহের বিষয়টিও বাণিজ্যিক চুক্তির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সমান সুযোগ চায় ইউরোপ
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তির পরও এয়ারবাসের আলোচনা বন্ধ হয়নি। নতুন করে ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রস্তাবে রয়েছে চারটি এ৩৫০-৯০০ ও ছয়টি এ৩২১নিও। এয়ারবাসের প্রস্তাবটি বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটি যাচাই করছে।
ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এয়ারবাসের প্রস্তাব প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিবেচনার কথা বলেছেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শারলেটও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশের কথা বলেছেন।
মঙ্গলবার ঢাকায় এক আলোচনায় তিনি বলেন, বিমানের জন্য এয়ারবাস কেনা বর্তমান সরকারের একটি ভালো পরীক্ষা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্রান্স কোনো পক্ষ বেছে নিতে চাপ দিচ্ছে না; তারা সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ চায়। এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিবেচনাতেই হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৪৮ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়। এ কারণে এয়ারবাসের বিষয়টি বাংলাদেশ-ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত।
কতটা প্রস্তুত বিমান
বিমানের বর্তমান বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। ১৪টি নতুন বোয়িং যুক্ত হলে সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৩। এরপর আরও ১১টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে মোট সংখ্যা ৫৪-তে পৌঁছাতে পারে। পুরোনো উড়োজাহাজ বসিয়ে রাখা হলে বাস্তবে সংখ্যা এর চেয়ে কম হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজ রহমান বলেন, নতুন বিমান কেনা ও পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতার বিষয়টিও দেখতে হবে। বহর বাড়ানোর সঙ্গে পার্কিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোন উড়োজাহাজ কোন রুটে চলবে, আয়-ব্যয় কত হবে এবং যাত্রী ও কার্গোর সম্ভাবনা কেমন– সেটিও হিসাব করা প্রয়োজন।
মিশ্র বহরে বাড়বে প্রস্তুতির চাপ
বিমান পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় বহর পরিচালনার পাশাপাশি বোয়িং ও এয়ারবাস– দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ একসঙ্গে পরিচালনা করলে বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং কারিগরি সহায়তার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হতে পারে।
তবে বিশ্বের অনেক বড় বিমান সংস্থা একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনা করে। এতে বিভিন্ন রুট ও যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে দুই ধরনের বহর পরিচালনার নিজস্ব প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, বিমান বর্তমানে মূলত বোয়িংনির্ভর। এর সঙ্গে এয়ারবাস যুক্ত হলে বহর পরিচালনায় বৈচিত্র্য আসবে। তবে প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় আলাদা সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
স্বচ্ছতার প্রশ্ন
বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তিতে তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও প্রকৃত ক্রয়মূল্য, ছাড়, ঋণের সুদহার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যয়ের পুরো কাঠামো এখনও জনসমক্ষে বিস্তারিত প্রকাশ হয়নি। আরও ১১টি বোয়িংয়ের ক্ষেত্রেও মডেল, দাম ও অর্থায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এখনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজ রহমান বলেন, বিমান কেনার মতো বড় চুক্তিতে আর্থিক স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। ক্রয়মূল্য, অর্থায়ন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি দায় পরিষ্কার না হলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিমানের বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা তাই এখন শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নয়। একই সঙ্গে বোয়িং ও এয়ারবাসের প্রস্তাবের তুলনা, অর্থায়ন, রুটভিত্তিক আয়-ব্যয়, অবকাঠামো ও জনবল প্রস্তুতির হিসাবও সামনে রাখতে হবে।
- বিষয় :
- বোয়িং বিমান