ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফুটপাতে যুবককে গাড়িচাপা

৯ লাখ টাকায় আপস, সেই কিশোর সংশোধনাগারে

৯ লাখ টাকায় আপস, সেই কিশোর সংশোধনাগারে
×

অভিযুক্ত কিশোরকে আদালতে তোলা হয়। ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৩৫ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৩৬

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা যুবককে গাড়িচাপা দেওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার কিশোরকে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার শিশু আদালত–৮-এর বিচারক আব্দুল মোক্তাদির এই আদেশ দেন। অন্যদিকে, কিশোরের আইনজীবী জানিয়েছেন- ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে নিহত যুবকের পরিবারের সঙ্গে আপস রফা হয়েছে। তবে আগামী রোববারের শুনানিতে কিশোর জামিন পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলছেন, সড়ক পরিবহন আইনের মামলায় সমঝোতার সুযোগ নেই।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন সমকালকে বলেন, বাদী–বিবাদীর আপসের বিষয়ে পুলিশের কিছু জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, এতে তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। আমরা নিয়মমাফিক তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেব। এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি গাড়িচালক আকাশ মারাককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মঙ্গলবার বারিধারা ১ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর নির্মাণাধীন ভবনের বিপরীত পাশের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী হাসান (২৪)। তিনি ওই এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিকেল ৫টার দিকে হঠাৎ বেপরোয়া গতিতে আসা কালো রঙের একটি প্রাইভেটকার ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

এ ঘটনায় নিহতের ভাই মুক্তাদির ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় সড়ক পরিবহন আইনে একটি মামলা করেন। সেখানে গাড়িচালক হিসেবে আকাশ মারাকের নাম উল্লেখ করেন তাকে আসামি করা হয়। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় এক কিশোর গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। পরে তাকে আটকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। 

এদিকে, পুলিশ তখন কিশোরকে হেফাজতে নিলেও পরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরমধ্যেই বুধবার বিকেলে পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কিশোরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ‘ও’ লেভেল পড়ুয়া ওই কিশোর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন ক্যাপ্টেনের ছেলে। দুর্ঘটনায় দায়ী গাড়িটি তার মায়ের নামে নিবন্ধিত।

কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসেন সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার কিশোর দুর্ঘটনার সময় গাড়ি চালাচ্ছিল না। তাকে চালকের আসনের দিক থেকে নামতে দেখে লোকজন ভুল ধারণা করেছেন। মূল চালক পলাতক। বিষয়টি বুঝতে পেরে বাদীপক্ষ আপস করতে সম্মত হয়। তারা জানিয়েছেন, কিশোর মামলা থেকে অব্যাহতি পেলে তাদের আপত্তি নেই। অবশ্য মামলায় তারা কিশোরকে আসামি করেননি। তারপরও ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগীর পরিবারকে মোট ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অধীনে মেহেদী কাজ করতেন, তারাও বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দেবেন। আপস হওয়ায় মামলাটি এখন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যাবে বলেও জানান এ আইনজীবী। 

আপসনামায় বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি গ্রেপ্তার কিশোর ও তাদের গাড়িচালক আহত হন। এমনকি গাড়িটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও নিহতের অসহায় পরিবারের বিষয়ে জানতে পেরে মানবিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে উদ্যোগী হয় কিশোরের পরিবার। তাদের মধ্যে পূর্ব শত্রুতা ছিল না এবং ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত একটি দুর্ঘটনা। তাই, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আটটি সিদ্ধান্তের আলোকে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি ও আপস–মীমাংসা করা হল।

আপসনামার আটিট পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে, অঙ্গীকার অনুযায়ী বাদীপক্ষ মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। এজন্য ওই কিশোর ও গাড়িচালক আকাশ মারাকের জামিনে অনাপত্তি জানাতে বাদীপক্ষ আদালতে উপস্থিত থাকবে। 

এ বিষয়ে জানতে নিহতের ভাই ও মামলার বাদী মুক্তাদির ইসলামের মোবাইল ফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে আদালত প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপস হয়েছে, তবে কত টাকায় তা জানি না। 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন–অর–রশীদ বলেন, বাদী বা আসামিপক্ষের মধ্যে আপস হলে আদালত সেটা গ্রহণ করতে বাধ্য না। মানুষ মারা গেছে, সেই মামলায় আপস হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

এর আগে, গ্রেপ্তার কিশোরকে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে তাকে সংশোধনাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে তার পক্ষে অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন জামিনের আবেদন করেন। জামিন আবেদনে বলা হয়, নিহত মেহেদী শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। হর্ন বাজানো সত্ত্বেও তিনি দ্রুত সরে যেতে না পারায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বর্ণনায় মনে হতে পারে, গাড়িটি সড়ক দিয়ে চলার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। প্রকৃতপক্ষে নিহত যুবক ফুটপাতে বসেছিলেন এবং গাড়িটি ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। 

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনার পরপরই প্রাইভেটকারের ডান পাশের (গাড়িচালকের আসন) দরজা খুলে কিশোর বের হয়। তদন্তকালে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। 

স্বজনের আপত্তি

নিহতের বাবা–ভাই ঢাকায় এসে টাকা নিয়ে সমঝোতা করেছেন বলে আইনজীবী জানালেও অপর স্বজনরা এতে আপত্তি তুলেছেন। নিহতের ভগিনীপতি মুফতি মুজিবুল ইসলাম নীলফামারীতে সাংবাদিকদের জানান, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তারা বুঝতে পেরেছেন, নিরীহ এক চালককে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। 
ভাই আল–আমিন বলেন, টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসা করলে চলবে না। প্রকৃত দোষীর শাস্তি হতে হবে। 

চাচা রাকিবুল ইসলাম জানান, মামলার বাদী মুক্তাদির ইসলাম নিহতের সৎভাই। তিনি তার বাবা-মাকে ভরণপোষণ দিতেন না। মেহেদীর আয়েই চলত পরিবার।

আরও পড়ুন

×