পরিবহন ভাড়ায় নৈরাজ্য
বাসে ভাড়া আদায়ে স্বেচ্ছাচারিতা, লঞ্চে বেড়েছে কয়েক গুণ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৪৭
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। তবে সরকারের বেঁধে দেওয়া বর্ধিত ভাড়ার হিসাব আমলে নিচ্ছেন না কেউ। বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। লঞ্চসহ নৌযানগুলোতে ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো পণ্যবাহী গাড়িতেও লাগামহীন ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠছে।
ঢাকাসহ সব জেলা-উপজেলায় দুর্ভোগের চিত্র মিলছে। যাত্রীরা বলছেন, বর্তমান সরকারের ছয় মাসে দুবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়ায় এমন নৈরাজ্য দেখা দেয়। এবারের দুর্ভোগের মাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে দুর্ভোগের মধ্যে একমাত্র স্বস্তির বিষয় ট্রেনে আগের হিসেবেই ভাড়া আদায় হচ্ছে। সরকারি এই পরিবহনে ভাড়া বাড়ায়নি। তবে লোকসান বিবেচনায় দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় সোমবার। পরদিন মঙ্গলবার বাস ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির কথা জানায় সরকার। বুধবার লঞ্চের ভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে কিলোমিটারপ্রতি ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা করে বাড়ায় সরকার। ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়। স্পিডবোটে ১১ শতাংশ ও ফেরিতে ৮ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়।
রাজধানীর গণপরিবহনে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়
রাজধানীর গণপরিবহনে ভাড়া বেড়েছে অস্বাভাবিক। প্রতিটি বাস গন্তব্যগুলোর ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করে নিজেদের মতো আদায় করছে। গণপরিবহনের এমন স্বেচ্ছাচারিতায় যাত্রীদের সঙ্গে বাসচালক ও হেলপারদের বচসা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
রাজধানীর মিরপুর, পল্টন, গুলিস্তান, রামপুরা, মালিবাগ, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরা, মহাখালী, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র মিলেছে। সব রুটেই বাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ভাড়া ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা করে ফেলা হয়েছে। আবার ১৫ টাকার ভাড়া করা হয়েছে ২০ টাকা। এভাবে রাজধানীর সব সিটি বাস সার্ভিসগুলোতেই ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
লঞ্চে ডেক ও কেবিনের ভাড়া বেড়েছে
ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে জানা গেছে, বিভিন্ন রুটে স্বল্প দূরত্ব ও দূরপাল্লার লঞ্চ ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। সরকার কিলোমিটার প্রতি ২৩ পয়সা করে বাড়ালেও লঞ্চে ডেকের ভাড়া আগের তুলনায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কেবিন ভাড়া সিঙ্গেল ২০০ টাকা এবং ডাবল ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। ন্যূনতম ভাড়া ৩৫ টাকা করা হলেও ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল ও ভোলা রুটের সাধারণ ও বিলাসবহুল লঞ্চের সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া আগে ছিল ১০০০ ও ১২০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা। ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৮০০-২০০০ টাকার স্থলে ২২০০-২৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তৃতীয় শ্রেণির ডেকের যাত্রীদের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকার স্থলে ৩৫০ টাকা। অন্যান্য রুটের কেবিন ও ডেকের ভাড়া একই হারে বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর অভ্যন্তরীণ রুট ও দূরপাল্লার বাসগুলোতেও আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদে চলাচলকারী ব্যাংক কর্মচারী নাসির উদ্দিন জানান, আগে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত যেতে বাসে ভাড়া নেওয়া হতো ১৮ টাকা। এখন তা এক লাফে ২৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চালক-হেলপাররা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন। যাত্রীরা অসহায় হয়ে বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দূরপাল্লার বিভিন্ন বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, আগে টেকনাফগামী বিভিন্ন বাসে ভাড়া ৬৫০ টাকা করে নেওয়া হতো। এখন নেওয়া হচ্ছে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। আবার কক্সবাজার পর্যন্ত ৪৩০ টাকার স্থলে আদায় করা হচ্ছে ৪৮০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশাল-ভোলা রুটের লঞ্চের যাত্রীভাড়া ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য রুটের লঞ্চগুলোতে সর্বনিম্ন বাড়ানো হয় ২০ টাকা। বর্ধিত মূল্যে ভোলা ও মেহেন্দিগঞ্জ রুটে দেড়শ টাকার ভাড়া ১৯০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ-রংপুর রুটে ৪০০ টাকার ভাড়া ৪২০ টাকা নেওয়া হচ্ছ। পাবনা রুটে ২৫০ টাকার ভাড়া বেড়ে ২৮৫ টাকা হয়েছে।
পাবনা অফিস জানায়, রুটভিত্তিক নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশে বিলম্ব ও বিভিন্ন পরিবহনে বাড়তি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই পাবনার বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
নাটোর সংবাদদাতা জানান, বগুড়া থেকে নাটোর আসা যাত্রী মেহেদি হাসান বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর আগে ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে নাটোর আসতাম। এখন ১৫০ টাকা দিতে হয়েছে। ঢাকাগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের নাটোর কাউন্টারের মাস্টার কোরবান আলী জানান, ‘আগে নাটোর থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত কেউ ঝামেলা করেনি।’
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এতদিন কিশোরগঞ্জ-ঢাকা রুটের বাস ভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা। সরকারের বেঁধে দেওয়া বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী ২২ টাকা বেড়ে ভাড়া হওয়ার কথা ৩৭২ টাকা। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সব পরিবহনে নেওয়া হচ্ছে ৩৭০ টাকা। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।