বার্লিন শহরের প্রান্তে
বার্লিনের মিউজিয়াম আয়ল্যান্ডে ক্যাথিড্রাল
রিজওয়ানুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বার্লিনের মিউজিয়াম আয়ল্যান্ডে ক্যাথিড্রাল
কোনো শহরের ভেতরেই একটি দ্বীপ, আর সে দ্বীপে রয়েছে বেশ কয়েকটি মিউজিয়াম? হ্যাঁ, এটি বার্লিন। গুগল ম্যাপ দেখাচ্ছিল আমাদের হোটেল থেকে মিউজিয়াম আয়ল্যান্ড হেঁটে যেতে লাগবে তিরিশ মিনিট। আবহাওয়া তেমন ভালো কিছু ছিল না; মেঘলা আকাশ আর দমকা হাওয়া। তবে বৃষ্টি ছিল না। তা ছাড়া জুন মাসে জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশ রোদে পুড়ছিল। বার্লিনে তাপমাত্রা উঠেছিল ৪০ ডিগ্রি (সেলসিয়াস) পর্যন্ত। আর আমরা যখন গিয়েছি (জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে) তখন তা নেমে গিয়েছে কুড়ি-বাইশে। আমরা তাই খুশি। রওনা দিলাম হেঁটেই।
হাঁটছিলাম বার্লিনের “মিত” (জার্মান ভাষায় এখানে “ত”টিকে ত আর থ-এর মাঝামাঝি একরকম উচ্চারণ করে বলে মনে হলো) এলাকার ভেতর দিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে পথের পাশেই দেখলাম কয়েকটি বিশাল আকারের চার্চ। সামনের নিওক্লাসিক্যাল ধরনের উঁচু উঁচু কলাম আর চূড়ার গম্বুজ মিলিয়ে তারা গাম্ভীর্যের প্রতীক এবং দৃষ্টিনন্দন। একই কথা বলা যায় কনসার্ট হলটি সম্পর্কেও– যদিও সংস্কারের কাজ চলছিল বলে তার পুরো চেহারা দেখা যায়নি।
মিউজিয়াম আয়ল্যান্ড একটি ছোটখাটো শহর, অর্থাৎ শহরের মধ্যে শহর। স্প্রি নদীর মাঝখানে এই দ্বীপ। কয়েকটি ব্রিজ দিয়ে মূল শহরের সাথে এই এলাকার সংযোগ। এই দ্বীপে পাঁচটি মিউজিয়াম : অল্ট (অর্থাৎ পুরোনো) ন্যাশনাল মিউজিয়াম, নিউ ন্যাশনাল মিউজিয়াম, অল্ট ন্যাশনাল গ্যালারি, বোডে মিউজিয়াম, আর পেরগামন মিউজিয়াম (যা তখন সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ ছিল)।
আমরা যে রাস্তা দিয়ে আয়ল্যান্ডে পৌঁছেছি সেখানে প্রথমে পেলাম হুম্বোল্ট ফোরাম– আর্ট হিস্ট্রি আর বিজ্ঞানের মিউজিয়াম। সে ভবনটি প্রুশিয়ার রাজাদের এক পুরোনো প্রাসাদ। আসলে পুরো মিউজিয়াম আয়ল্যান্ডের আইডিয়া এবং পৃষ্ঠপোষকতা নাকি ওই রাজাদের। সেটা জানার পর আমার মনে হলো, রাজারা ভালো কাজও করেন।
হুমবোল্ট ফোরাম থেকে বের হতেই দূর থেকে দেখলাম বার্লিন ক্যাথিড্রাল। খুবই দৃষ্টিনন্দন এই ভবন। মাঝখানে বড় আর দুপাশে দুটি ছোট গম্বুজ সৃষ্টি করেছে চমৎকার সাযুজ্য। তামা দিয়ে তৈরি নীলচে রঙের গম্বুজ। রেনেসাঁ আর বারোক স্টাইলের সংমিশ্রণে এক অনন্য স্থাপত্যের নিদর্শন এই ভবনটি। বার্লিনের অন্যান্য স্থাপনার মতো ক্যাথিড্রালটিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বেশ। কিন্তু পরে ভালোভাবেই এর সংস্কার করা হয়েছে।
ক্যাথিড্রাল ডানে রেখে এগিয়ে গেলে বাঁ দিকে অল্ট ন্যাশনাল। গ্রেকো-রোমান কলামে শোভিত বিশাল এক ভবন। যদিও এটিই বার্লিনের প্রধান জাদুঘর, আমরা সেখানে না গিয়ে পা বাড়ালাম অল্ট ন্যাশনাল গ্যালারির দিকে, যেখানে চলছিল ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানার শিল্পকর্ম নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী। আমরা দুজনেই সেটিতে বেশি আগ্রহী।
প্রদর্শনীর শিরোনাম “কাসিরের অ্যান্ড দ্য ব্রেকথ্রু অব ইম্প্রেশনিজম”। পল কাসিরের ছিলেন একজন জার্মান আর্ট ডিলার। তিনি ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানার এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গগের শিল্পকর্ম জার্মানির শিল্প বোদ্ধাদের কাছে পরিচিত করার জন্য কাজ করেছেন অনেক। অল্ট গ্যালারি তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য আয়োজন করেছে এই প্রদর্শনী। যদিও ভ্যান গগের জীবদ্দশায় তাঁর শিল্পকর্ম বিশেষ সমাদৃত হয়নি, কাসিরের তাঁর কাজের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বার্লিন আর হামবুর্গে ভ্যান গগের কাজের বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। ১৯১৪ সালে এক শ একান্নটি কাজ নিয়ে হয়েছিল বিশাল এক প্রদর্শনী। এ ধরনের মানুষকে অবশ্যই স্মরণ করা উচিত।
প্রদর্শনীতে ঢোকার পথে সিঁড়ির একপাশে ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত দেয়ালে ঝুলছিল ক্লদ মোনের “সামার ১৮৭৪” থেকে তৈরি করা এক বিশাল দেয়াল ছবি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পকর্মকে কী রূপ দেওয়া যায়, তার একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে এটি।
প্রদর্শনীর শুরুতে ছিল এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভূমিকা। তার সাথে ভ্যান গগের শিল্পকর্মকে জনসমক্ষে, বিশেষ করে জার্মানির মানুষের কাছে পরিচিত করার জন্য কাসিরেরের অবদানের কথা।
কাসিরেরের নিজের সংগ্রহে নাকি ইম্প্রেশনিস্টদের বেশ কিছু কাজ ছিল, যা তিনি দান করেছেন এই গ্যালারিকে। স্বাভাবিকভাবেই এমন কিছু ছবি দেখলাম, যেগুলো আগে কোথাও দেখিনি। তবে এই বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য বিশ্বের অন্যান্য মিউজিয়াম থেকেও ধার করে আনা হয়েছে বেশ কিছু কাজ, যার ফলে সংখ্যা ও গুরুত্ব দুদিক থেকেই এটি হয়ে উঠেছে প্রশংসনীয়।
অল্ট ন্যাশনাল গ্যালারি
প্রথম ঘরটিতে ঢুকতেই দেখা পেলাম ভ্যান গগের একটি আত্মপ্রতিকৃতির। শিল্পীর জটিল চরিত্র সম্পর্কে ধারণা থাকলে আন্দাজ করা যায় কেন তাঁর চেহারায় একটি দুঃখী ভাব ফুটে ওঠে। দ্বিতীয় ছবিটি ছিল একেবারে ভিন্ন ধরনের : প্যারিসের মোমার্তের কাছে শহরতলি ক্লিশির একটি রাস্তা– “বুলেভার্ড দ্য ক্লিশি”। জায়গাটির সাথে শিল্পীর সম্পর্ক ছিল গভীর। কারণ তিনি সেখানকার একটি আর্ট স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন এবং তখন সেখানকার ক্যাফেগুলোতে আড্ডা দিতেন। সে আড্ডার সঙ্গী ছিলেন ক্লদ মোনে, কামিল পিসারিওর মতো প্রথম সারির শিল্পীরা। ভ্যান গগ আর তাঁর ভাই থিও একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। সেখান থেকে আড্ডার ক্যাফেতে যাওয়ার পথে বুলেভার্ড দ্য ক্লিশি। তাঁর ভালো লাগত রাস্তাটি আর তার চারপাশ। সেখান থেকেই শুরু এই ছবিটির আইডিয়া।
ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের ছবির প্রদর্শনী মানেই ক্লদ মোনে, এডুয়ার্ড মানে, এডগার দেগা, পল সেজান, কামিল পিসারিও, অগুস্ত রেনোয়া প্রমুখ একগুচ্ছ নাম। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শুরুতেই মোনে। তবে তাঁর বিখ্যাত পদ্মপুকুর বা পদ্মফুল নয়। নদীর ধারে গ্রাম, গ্রামের বাড়িঘর, বাগান, বন্দর ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের জায়গা ফুটে উঠেছে তাঁর তুলির আঁচড়ে। আর ইম্প্রেশনিজমের যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য– আলো-ছায়ার বাস্তব চিত্রায়ণ তাও রয়েছে এসব ছবিতে। বিশেষভাবে নজর কাড়ল “সামার ১৮৭৪” আর রাতের হাভ্র বন্দর। রাতের আলোতে এই বন্দরের ছবিটি মনে করিয়ে দেয় ভ্যান গগের স্টারি নাইটের কথা। এ ধরনের ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়। প্রতিবারেই মনে হয় অন্যরকম– বিশেষ করে একটু জায়গা বদল করে দাঁড়ালে। কিন্তু আমার মতো দর্শকের হাতে থাকে সংক্ষিপ্ত সময়ে দেখার দীর্ঘ তালিকা। তাই অতৃপ্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
এডুয়ার্ড মানের বিখ্যাত ছবি “পরিবারের সাথে আর্গেনতুইল বাগানে” আগেও কোথাও দেখেছি– খুব সম্ভবত নিউইয়র্কের মেটে। কয়েক বছর আগে সেখানে প্যারিসের বাগানগুলো কেন্দ্র করে একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের আঁকা বেশ কয়েকটি বাগানের ছবি ছিল। এখানেও ছিল কামিল পিসারিওর “দ্য পাবলিক গার্ডেন অ্যাট পনতোয়াজ”।
এডুয়ার্ড মানের বিখ্যাত ছবি “পরিবারের সাথে আর্গেনতুইল বাগানে”
বড় ক্যানভাসে ছবি ছিল বেশ কয়েকটি। এ ধরনের ছবিতে থাকে অনেক “ডিটেইল”, যা আমার বিশেষ পছন্দ। নজর না কেড়ে পারে না রেনোয়ার “ছাতা মাথায় লিজ”। লিজ ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রিয় সহচরী। ছাতা মাথায় তাঁর হাঁটার ভঙ্গি এতই বাস্তব আর সজীব যে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। তাঁর আরেকটি বড় ছবি “শিশুদের বিকেল”। বসবার ঘরে একটি সোফায় এক শিশু বসে বই পড়ছে। তার উল্টোদিকে মা বসে উলের কিছু কাজ করছেন– ঠিক যেমনটি আমাদের মায়েরা করতেন একসময়। মায়ের কোলের কাছে পুতুল হাতে দাঁড়িয়ে আরেকটি শিশু। কী যে বাস্তব আর জীবন্ত সে ছবি!
ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য, রাস্তা বা নগর-বন্দরের ছবিই আঁকেননি। তারা জীবন ও জীবিকার ছবিও এঁকেছেন। পল সেজানের জেলে আর দেগার সার্কাসের মেয়ে সে ধরনের ছবি। মেটে দেখেছিলাম দেহোপজীবীনীকে নিয়ে মানের বিখ্যাত শিল্পকর্ম “অলিম্পিয়া”।
প্রদর্শনীটির একটি বড় আকর্ষণ ছিল দেখাতে পারা যায়নি এমন কয়েকটি ছবির একটি ভিডিও চিত্র। সেই ভিডিওতে দেখানো হচ্ছিল পাঁচটি ছবি আর তাদের সম্পর্কে নির্বাচিত কিউরেটরদের ভূমিকা ও মন্তব্য। তাদের মধ্যে ছিল ভ্যান গগের দুটি আর মোনে, মানে, ও রেনোয়ারের একটি করে ছবি। এ রকম একটি ভিডিও চিত্র দেখা আর তার সাথে কিউরেটরদের বর্ণনা শোনা যে কোনো শিল্পপ্রেমিকের জন্য একটি বিশাল ব্যাপার। তবে আমাদের লাঞ্চের সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। তাই কিছুটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বের হয়ে গেলাম প্রদর্শনী শেষ করে। যেতে যেতে পেছনে ফিরে তাকালাম দেয়ালে ঝুলতে থাকা ক্লদ মোনের “সামার ১৮৭৪”-এর সেই বিশাল আকারের ছবিটির দিকে। আর মনে আশা– পৃথিবীর কোথাও আবার দেখা হয়ে যাবে ইম্প্রেশনিস্টদের সাথে।
- বিষয় :
- গল্প