ক্যানভাসে ঋতুর সুর ও রেখা
শিল্পকর্ম:: শাম্মী ইয়াসমিন
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রং ও রেখা যখন শিল্পীর আত্মানুভূতির এক গভীর নির্জন মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন ক্যানভাস কেবল বাইরের কোনো দৃশ্যকে হুবহু ধারণ করে না; তা হয়ে ওঠে ভেতরের জীবন, সময় ও প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক রূপচিত্র। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের নীরব সাধনা ও রূপচেতনার এক সংবেদনশীল মেলবন্ধন ঘটেছে চিত্রশিল্পী শাম্মী ইয়াসমিনের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী ‘ঋতু রঙে আঁকা’। ধানমন্ডির সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রর্দশনী চলবে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই চিত্রমালার ক্যানভাসগুলোর দিকে তাকালে কোনো কৃত্রিম বর্ণনার প্রয়োজন পড়ে না; ছবিগুলোতে ব্যবহৃত মাধ্যম, রেখার টান এবং রঙের পরশ নিজেই নিজের কথা বলে ওঠে। প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে এখানে উন্মোচিত হয়েছে প্রাচ্যকলার ধ্রুপদী স্নিগ্ধতা, এক্রেলিকের প্রখর রূপময়তা এবং কাঠের ব্লকে খোদাই করা ছান্দসিক গতির এক অনন্য জগত।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হলো প্রাচ্যরীতির জলরঙে নারীর নান্দনিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ। ‘সখী’ চিত্রকর্মটিতে পাশাপাশি দুটি নারীর অবস্থান কেবল দুটি অবয়ব নয়, নারীর মনস্তাত্ত্বিক আদান-প্রদানের চিত্র আঁকে। সামনের অবয়বটির ওপর ছড়িয়ে থাকা নীল আলো-ছায়ার আস্তরণ অন্তর্জগতের বিষাদের প্রতীক, আর পেছনের নরম আলো ও চুলে গোঁজা গোলাপি ফুলটি পারস্পরিক নৈকট্যের বার্তা বহন করে। আবার ‘অপ্সরী’ ক্যানভাসে প্রাচ্যকলার ধ্রুপদী লাবণ্য পরিস্ফুট; যেখানে জলপূর্ণ কলসির ওপর মাথা রেখে বিশ্রামরত নারীর বন্ধ চোখ ও অবয়বের ছান্দসিক বাঁক প্রাচ্যরীতির অলংকারময় স্নিগ্ধতা সৃষ্টি করে। হাটঁতে হাটঁতে যখন ‘মুখ ও মুখোশ’ এবং ‘অভিনেত্রী’ কাজ দুটির সামনে দাড়ানো হয়- যেন সমাজ ও ব্যক্তির মধ্যকার এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের এক গভীর সামাজিক ও রূপক বিশ্লেষণ ফুটে ওঠে। প্রজাপতির আকৃতির রঙিন মুখোশের নিচে ঢাকা পড়া মুখ বা ফুল হাতে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা নারী অবয়বটি দেখায়, কীভাবে মানুষ প্রতিদিন সামাজিক ভূমিকার প্রয়োজনে বাইরের মুখোশ পরিধান করে এবং তার আড়ালে মূল মনস্তাত্ত্বিক সত্তাকে লুকিয়ে রাখে।
জলরঙের স্নিগ্ধ ধোঁয়াটে আবহের পাশাপাশি এক্রেলিক মাধ্যমে আঁকা ক্যানভাসগুলোতে ধরা দিয়েছে প্রকৃতির প্রখর ও সম্পৃক্ত রঙের উদ্ভাস।সেরকমই একটি ছবি ‘প্রকৃতি ও নারী’। ক্যানভাসটিতে নীল শাড়ি পরিহিত রমনীকে গ্রামীণ কুটির, গাছের ডালে বসা হলুদ পাখি এবং বুকের কাছে রাখা প্রজাপতির সাথে একীভূত করে প্রকৃতি ও নারীকে একই মহাজাগতিক প্রাণসত্তার দুটি রূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘ফুলের বাগান’, ‘বসন্ত’ কিংবা ‘মুগ্ধতায় সাদা ফুল’ শীর্ষক কাজগুলোতে প্রখর লাল, হলুদ, নীল ও সাদার বিচ্ছুরণ বসন্তের জীবনাবেগকে ফুটিয়ে তোলে। ‘প্রজাপতি ও ফুল’ কিংবা ‘পাখী যুগল’ ক্যানভাসে উড্ডয়নমুখী প্রাণগুলো বস্তুত মুক্ত অনুভূতির ও স্বাধীন জীবেনচ্ছার চাক্ষুষ প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রাচ্যকলার পাশাপাশি কাঠখোদাই ছাপচিত্রে শিল্পীর শৈশব-কৈশোরের নৃত্যভাবনা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। ‘নৃত্যরত রমণী’ ছবিতে গাঢ় কালো পটভূমির বিপরীতে কাঠ কেটে বের করা হলদে ও সাদা রেখার আলো নৃত্যরতার দেহের গতিকে ক্যানভাসে ধরে রেখেছে। ঠিক একইভাবে ‘শাহজাদী’ উডকাটে ওড়না, অলংকার ও প্রদীপের আলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর বিষাদময় টানা চোখ কাঠের খসখসে টেক্সচারের সাথে মিলে প্রাচ্যীয় আভিজাত্য ও একাকীত্বের এক অনন্য দৃশ্যপট তৈরি করেছে।
উল্লেখয়, এই চিত্রভাষার অভ্যন্তরীণ ব্যাকরণ গড়ে উঠেছে শিল্পীর জীবনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার রূপান্তর থেকে। শৈশবে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা) নাচের তালে যে শারীরিক গতি ও ছন্দের সৃষ্টি হয়েছিল এবং কাদামাটি ও ড্রয়িংয়ের প্রাথমিক অনুভূতির জন্ম হয়েছিল, পরবর্তীতে চারুকলার প্রাচ্যকলা বিভাগে অধ্যয়নকালে (১৯৭৩–১৯৭৮) তা জলরঙের ‘ওয়াশ’ ও ‘গোয়াশ’ পদ্ধতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বিসিকের নকশা কেন্দ্রে দীর্ঘ ৩২ বছরের নকশাবিদ হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রূপের জ্যামিতিক বিন্যাস ও নকশাগত ভারসাম্যকে পরিশীলিত করলেও, ক্যানভাসে ছবি আঁকার সময়ে শিল্পী নিজেকে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক বাঁধন থেকে মুক্ত রেখে কেবল আত্মার টানে তুলি চালিয়েছেন।
- বিষয় :
- গল্প