ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতির পুত্র দ্বিজেন শর্মা

প্রকৃতির পুত্র দ্বিজেন শর্মা
×

দ্বিজেন শর্মা [২৯ মে ১৯২৯–১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭]

শরীফ খান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ ও অনুবাদক দ্বিজেন দা (দ্বিজেন শর্মা) আমার চেয়ে বয়সে জ্যেষ্ঠ হলেও তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও হৃদ্যতাপূর্ণ। তাঁকে আমি মুরব্বি বলে মানতাম। দ্বিজেন দা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, সব সময় ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি বেঁচে থাকাকালে আমার প্রেরণা ছিলেন তো বটেই, এখনও তাঁর কাজ আমার জন্য, আমাদের জন্য প্রেরণা হয়ে আছে। 
আজ থেকে প্রায় ২০ বছরেরও বেশি আগে রমনা পার্কে গাছ চেনানোর এক আসরে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। মোকাররম হোসেন সেখানে গাছ দেখাতেন, তাঁর সঙ্গেই সেখানে অন্যদের পাশাপাশি দ্বিজেন দাও ছিলেন। তখন দ্বিজেন দার বয়স ষাট বা তার কাছাকাছি, আর আমার বয়সও কম ছিল না।
দ্বিজেন দা যে কত বড় মনের মানুষ ছিলেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। একটা ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে। ১৯৯৫ সালের দিকে জাতীয় পরিবেশ পদকের জন্য দ্বিজেন দা নিজে আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। তিনি নিজে প্রবীণ ও গুণী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সেই পুরস্কার নিজে নেননি; বলেছিলেন, “না, শরীফ মাঠে কাজ করে, পদকটা শরীফকেই দেন।” অথচ তিনি নিজে তখনও এই পুরস্কার পাননি! তাঁর মতো উদার ও মহান মানুষের পক্ষেই এমনটা সম্ভব।
পরে ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে একটি প্রজেক্টেও আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। সেখানে দ্বিজেন দা ছিলেন শিক্ষক, আর আমি কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকে গাছপালা, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ে অনেক কিছু শিখেছি। তিনি কখনও আমার সঙ্গে আমার পৈতৃক জেলা বাগেরহাটে যাননি। তিনি যেতে পারলে অনেক আনন্দ হতো সন্দেহ নেই। জানার তালিকায় আরও অনেক কিছুই যুক্ত হতে পারত। দ্বিজেন দার কাছ থেকে হয়তো আরও অনেক কিছুই জানতে পারতাম যদি আরও আগে পরিচয় ঘটত। তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়া পর্ব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে তেমন আলোচনা হয়নি বললেই চলে।
দ্বিজেন দার বিপুল রচনা প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের পাথেয় হতে পারে বলে আমি মনে করি। আমার পাখি এবং প্রকৃতিবিষয়ক কাজকর্ম নিয়েও দ্বিজেন দার চমৎকার মূল্যায়ন ছিল। তিনি সব সময় আমার কাজের প্রশংসা করতেন, উৎসাহ দিতেন।
আজ দ্বিজেন দা নেই, আর আমরা প্রতিদিন পদে পদে তাঁর অভাব অনুভব করি। তিনি বেঁচে থাকলে পরিবেশ নিয়ে আরও অনেক কাজ হতো, অনেক নতুন নতুন লেখালেখি হতো এবং আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির অনেক বড় উন্নতি হতো। মানুষ এখনও যেভাবে পরিবেশ ধ্বংস করছে, সেভাবে করে যেতে পারত না। আঘাত পেত। এখন মৃত্যুঞ্জয় রায় ও মোকাররম হোসেনের মতো অনেকে দারুণ লিখছেন। আমি মনে করি, এসব লেখার পাঠক বাড়াতে হবে। 
ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, এখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর নতুন করে কোনো গবেষণা বা লেখালেখির কাজ করতে পারছি না, নীরব বিশ্রামেই আছি। এ পর্যন্ত আমার প্রায় ৫২টি বই বের হয়েছে। এখন জীবনে একটা আক্ষেপ রয়ে যায়– আমাদের দেশে সাধারণ মানুষকে গাছ চেনানো এবং প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার অনেক কাজ এখনও বাকি। অধিকাংশ মানুষই তো গাছ চেনে না! যেমন পাহাড়ের একটা গাছ হঠাৎ আমাদের বাড়ির পাশে হয়ে গেছে, কিন্তু মানুষ সেটির নাম জানে না। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে গাছ চিনতে ও ভালোবাসতে পারে, সেই শনাক্তকরণের কাজগুলো করা খুব দরকার। দ্বিজেন শর্মা চাইতেন বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের অপরিচয়ের ব্যবধান কাটুক। সাধারণ মানুষ যদি প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে লেখাপত্রের পাঠ বাড়ায় তবে প্রকৃতির সাথে তাদের একটা সুন্দর আত্মিক বন্ধন তৈরি হবে। আর সেই টান থেকেই তারা প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসত। পরিবেশের এই কাজগুলো এখন তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে হবে। ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিজেন শর্মার নবম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। 

আরও পড়ুন

×