ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার : আনু মুহাম্মদ

প্রয়োজনে আবারও জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বন্দর নিয়ে কর্মসূচি আসবে

প্রয়োজনে আবারও জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বন্দর নিয়ে কর্মসূচি আসবে
×

আনু মুহাম্মদ

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

লেখক ও গবেষক আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বর্তমানে ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক এবং নাগরিক সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৪-৯৩) এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব (২০০৫-২০) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমকালের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন।

সমকাল: উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীর কয়লা তোলা নিয়ে অর্থমন্ত্রী ১৬ আগস্ট ঢাকায় অ্যামচ্যামের সভায় বক্তব্য দিলেন। তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

আনু মুহাম্মদ: এ রকম অঙ্গীকার ভঙ্গ বিস্ময়কর। ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দেশের কোথাও কয়লা তোলা হবে না; এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে– এ রকম মোট ছয় দফা দাবি মেনে নিয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী জনগণের সঙ্গে এসব দাবি মেনে চুক্তি করা হয়েছিল একটা গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। সেই গণঅভ্যুত্থানে তিনজন শহীদ হয়েছিলেন। এরপর ওই সরকারের আমলে বুয়েটের অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে গঠিত পাটোয়ারি কমিটি জনবসতি ও বিপুল উর্বর জমি হারানোর পাশাপাশি পানিসম্পদসহ পরিবেশ-প্রকৃতির ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার ব্যাপারে নেতিবাচক মত দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলেও মোশাররফ কমিটি নামে একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। সেটিও উন্মুক্ত পদ্ধতির ভয়াবহতা এবং অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। এগুলো সব দিক থেকে মীমাংসিত বিষয়। এরপরও এ আলোচনা তোলা হয় কীভাবে?

সমকাল: এর নেপথ্যে কী কারণ আছে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: সম্ভবত এশিয়া এনার্জির, ২০০৬ সালে বিতাড়িত হওয়ার পর যেটার নাম হয়েছে জিসিএম, ফাটকা ব্যবসার টানে এ রকম অতি উৎসাহ। এশিয়া এনার্জির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি ২০০৬ সালের পর। তারপরও কোম্পানিটি লন্ডনে মেইনস্ট্রিম শেয়ার মার্কেটের বাইরে অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে এখনও তৎপর। ‘অল্টারনেটিভ মার্কেট’ তাদেরই জন্য, যাদের প্রকল্পে সমস্যা আছে। ক্ষমতাসীন মহল ওই কয়লা তোলা হবে ধরনের কিছু কথা বললে তাদের ফাটকা তৎপরতায় সুবিধা হয়। যেমন আওয়ামী লীগ আমলে মাঝেমধ্যে ইংরেজি এক অখ্যাত পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে দেওয়া হতো– সরকার ফুলবাড়ীর কয়লা তোলার ব্যাপারে চিন্তা করছে। ২০১২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ফুলবাড়ীতে হঠাৎ ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ দিয়ে ‘জিসিএম’ কোম্পানিকে ঢোকানোর চেষ্টা করেন। তখনও কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রতিরোধে কোম্পানির ঢোকার চক্রান্ত ভেস্তে যায়। 
শেখ হাসিনা সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘এশিয়া এনার্জি বা জিসিএমের কোনো লাইসেন্স নেই’। তাহলে কীভাবে তারা খনি দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন, ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু ব্যবস্থা নেননি। উল্টো কিছুদিন পর ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে চীনা কোম্পানির সঙ্গে জিসিএমের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তখনও লন্ডনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, ওই ফাটকা শেয়ার ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তারই একটা অংশ এদেশে আলোচনা তোলার পেছনেও খরচ হয়।

সমকাল: বর্তমান সরকার কি বিষয়টি জানে না?

আনু মুহাম্মদ: না জানার কোনো কারণ নেই। একটা লাইসেন্সবিহীন কোম্পানি বাংলাদেশের খনি দেখিয়ে লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করলেও সরকার এখনও কিছু বলছে না। উল্টো ক্ষমতায় আসার মাত্র কদিনের মধ্যে রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তি, একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটির মত উপেক্ষা করে তাদের কেন বলতে হয় যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই?

সমকাল: এত আন্দোলন ও রক্তপাতের পরও কেন এশিয়া এনার্জিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা থামছে না?

আনু মুহাম্মদ: ওদের হয়তো ধারণা, ফুলবাড়ীর লোকজন ক্লান্ত হয়ে গেছে। বাস্তবে সেখানকার মানুষের প্রতিরোধ চেতনা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। সম্প্রতি সেখানে ফুলবাড়ী কর্মসূচি পালন করতে গিয়েও সেটা দেখেছি। ২০০৬ সালের আন্দোলনের সময় বিএনপি ক্ষমতায়। কিন্তু বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা আন্দোলনে ছিলেন। সেখানকার এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগের; তিনি কোম্পানির সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু লীগ সমর্থক-কর্মীরা ছিলেন আন্দোলনে। দলগুলোর কেন্দ্রীয় নির্দেশনা সেখানে খাটেনি। এখনও উন্মুক্ত খনির চক্রান্তের বিরুদ্ধে অবস্থানে সবাই ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ।

সমকাল: হ্যাঁ, আপনারা তো প্রচার যাত্রা নামে ঢাকা-ফুলবাড়ী একটা রোডমার্চ করলেন।

আনু মুহাম্মদ: আমাদের কর্মসূচি ছিল মূলত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে, যেটাকে বলা হচ্ছে এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি। আসলে এটি ট্রাম্পের আদেশনামা। ভয়াবহ এ চুক্তিতে জ্বালানির বিষয়ও আছে। আমরা দেখলাম, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে ড. ইউনূস চুক্তি করলেন। কিন্তু সংসদে নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক দল এর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কিছু বলল না। অথচ পুরো বাতিল না করলে বা অন্তত মূল দিক থেকে সংশোধিত না হলে চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ বিপদ শুধু আনবে না; দেশের সার্বভৌমত্বও বিপন্ন করবে। তাই গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়। যেহেতু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মসূচি এবং ২০০৬ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণে ফুলবাড়ী হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের প্রতীক, তাই আমরা ফুলবাড়ীতে সমাপনী কর্মসূচি করেছি। আর ২৬ আগস্ট প্রতিবছর ফুলবাড়ী দিবস পালিত হয়। সেই কর্মসূচি এবার খুবই শক্তিশালী আহ্বান দিয়ে পালিত হয়েছে সেখানে।  

সমকাল: একবার উন্মুক্ত পদ্ধতির বদলে ফুলবাড়ীতে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিংয়ের কথা শোনা গিয়েছিল, যদিও পার্শ্ববর্তী বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এ পদ্ধতি অনেক দুর্ভোগ ও বিপর্যয় তৈরি করেছে। আপনাদের বক্তব্য কী?

আনু মুহাম্মদ: ফুলবাড়ী খনি এলাকার তুলনায় বড় পুকুরিয়ার খনি অনেক ছোট। কিন্তু সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড পদ্ধতিতে যত ধরনের এবং যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, যদিও উন্মুক্ত পদ্ধতির তুলনায় তা বেশ কম, তা স্থানীয় মানুষদের মধ্যে খনির খনন নিয়ে বিরূপ ধারণা তৈরি করেছে। বড়পুকুরিয়ায় ভূমিধস, পানির সংকট, ফসলহানি ইত্যাদি অভিজ্ঞতায় মানুষ ক্ষুব্ধ। আমাদের মতো জনঘন দেশে, যেখানে আবাদি জমি ও পানি সবচেয়ে বড় অবলম্বন, সেখানে এগুলোর ক্ষতির সামাল দিয়ে কয়লা খনি ব্যবস্থাপনা অসম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে আমরা বিভিন্ন সরকারকে বারবার বিকল্প খুঁজতে বলেছি; নিজেরাও তা অন্বেষণ করেছি।

সমকাল: জ্বালানির বিকল্প উৎস কী হতে পারে?

আনু মুহাম্মদ: গত ১০-১২ বছরে বৈশ্বিক পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ এতটা ঘটেছে যে কয়লা, তেল বা পারমাণবিকের মতো জ্বালানির দিকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি অনেক বিকশিত; ক্রমে আরও বিকাশ হচ্ছে, খরচও অনেক কমে যাচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নে তো এর সঙ্গে অন্য কোনো উৎসের তুলনা হয় না। অন্যদিকে কয়লা প্রযুক্তি এখন একটা বাতিল বিষয়। এটা অতীতের প্রযুক্তি; এর কোনো উন্নতিরও সম্ভাবনা নেই। এসব কারণে সে সময় থেকে আমরা কয়লা তোলার কোনো পদ্ধতির মধ্যে আলোচনায় যাই না। ২০১৭ সালে দুই বছরের গবেষণা শেষে আমরা একটি মহাপরিকল্পনা দিই। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশে সম্পদ ও সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছি। আমরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেছি, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লা, পারমাণবিক তো নয়ই; এলএনজি আমদানিরও দরকার নেই। আমরা দেখিয়েছি, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মিশ্রণ আমাদের জন্য সর্বোত্তম। এতে সুলভ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা ভারত, চীন, ভিয়েতনামের উদাহরণ আলোচনা করেছি, যে দেশগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি-নির্ভরতা ব্যাপক হারে বেড়েছে অল্প কয়েক বছরে। এমনকি পাকিস্তানের মতো ভাঙাচোরা একটি দেশেরও ২৫ শতাংশ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। চোখের সামনে এত উপায় থাকার পরও অর্থমন্ত্রী বলে দিলেন– কয়লা ছাড়া কোনো উপায় তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।

সমকাল: তারা ক্ষমতায় এসেছেন মাত্র সাত মাস। এত অল্প সময়ে কি আপনাদের প্রস্তাবিত বিকল্পের ব্যবস্থা করা সম্ভব?

আনু মুহাম্মদ: সরকার তো বিকল্পের দিকে তাকাচ্ছেই না। গত ছয় মাসে তারা ইচ্ছা করলে অনেক ভালো উপায় নিয়ে কাজ শুরু করতে পারত। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে এবং কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তারা বরং আগের মতো চলমান জ্বালানি সংকটকে বিশেষ কিছু মহলের মুনাফা লুটার ব্যবস্থা করার কাজে লাগাতে চাচ্ছে। সংকটকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখছে, তাই সমাধানের দিকে যাচ্ছে না। তাদের পছন্দের পথ আরও বেশি এলএনজি আমদানি, কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি কিছু গোষ্ঠীর পকেট ভরাবে। কিন্তু দেশের জন্য কোনো সমাধান আনবে না; বরং সংকট আরও বাড়াবে।

সমকাল: এলএনজি আমদানি ছাড়া আর কী করতে পারত তারা?

আনু মুহাম্মদ: শেখ হাসিনার সময় জাইকা একটা মহাপরিকল্পনা বানিয়ে দিয়েছিল, যেখানে এলএনজি আমদানি, কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের কথা বলা আছে; নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা দেশীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে গ্যাস উত্তোলনের কথা বলা হয়নি। এরপর তো আমরা দেখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, ওই পথে সংকট কাটেনি। অতএব প্রয়োজন ছিল সেই মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে ওই পথ থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি এ সরকার। আমরা দেখেছি তাদের উৎসাহ অন্যদিকে। অন্তর্বর্তী সরকার এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছে, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাই জানত না। বর্তমান সরকারও খুঁজে বেড়াচ্ছে কীভাবে নতুন এলএনজি টার্মিনাল বানানো যায়, কোথা থেকে বেশি বেশি এবং অত্যধিক দামে এলএনজি আমদানি করা যায়। বাপেক্সকে এক টাকা দিলে যে গ্যাস সে দিতে পারে, একই পরিমাণ গ্যাস আমদানির জন্য ৫০-৬০ গুণ টাকা খরচ করা হচ্ছে।

সমকাল: সরকার তো বলছে, তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানিরও উদ্যোগ নিচ্ছে? আপনার পর্যবেক্ষণ কী এ বিষয়ে?

আনু মুহাম্মদ: এ নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের শেষ দিকেও কিছু কথা বলা হয়েছিল। কিছু উদ্যোগ নেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু মূল মনোযোগ ছিল এলএনজি, কয়লা ইত্যাদির দিকে। আমরা মনে করি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব। এ জন্য সময়ও অনেক বেশি লাগবে না। ভিয়েতনাম মাত্র এক বছরে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আমাদের মোট চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। তার মানে, গত ছয় মাসেও এ বিষয়ে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেত। প্রকৃতপক্ষে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে শেখ হাসিনার আমল থেকে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মহলকে শোনানো, প্রকৃত কাজ অন্যরকম। এখনও কিন্তু কয়লার ওপর শুল্ক শূন্য। অন্যদিকে বর্তমান সরকার বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ওপর শুল্ক কিছু কমালেও এখনও তা কম নয়, অশুল্ক বাধাও অনেক। সবচেয়ে বড় বিষয়, একটা কম্প্রিহেনসিভ বা সার্বিক নীতি এ বিষয়ে নেই। কোনো একটা বেসরকারি কোম্পানি বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা হয়তো এ বিষয়ে একটু আগ্রহ দেখাল। তখন সরকার একটু ছাড় দিল। এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২-৩ শতাংশের বেশি হচ্ছে না। উপরন্তু যেখানে এলএনজির ব্যাপারে একের পর এক চুক্তি করা হচ্ছে; পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটার জায়গায় আরেকটা করার পরিকল্পনা চলছে; সেখানে তুলনামূলক অনেক সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মনোযোগ পাবে কীভাবে? ইতোমধ্যে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৬-২৭ হাজার মেগাওয়াট। প্রয়োজন ১৭ হাজার হওয়ায় বসিয়ে বসিয়ে অনেক কেন্দ্রকে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। সরকার বলছে, আরও কয়লা-এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাবে। তাহলে নবায়নযোগ্য বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হবে কোথায়?

সমকাল: আপনারা তো বহু বছর ধরে বিশেষত তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ব্যানারে আন্দোলন করে আসছেন। এখন কি এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে?

আনু মুহাম্মদ: আমি জাতীয় কমিটিতে আছি। তবে মূল দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছি ২০২০ সালে। এর শরিক দলগুলো এখন বিভিন্ন জোটে এই অভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। জাতীয় কমিটির ব্যানারে কাজ হচ্ছে ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে। প্রয়োজনে জাতীয়ভাবে আবারও জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বন্দর ইত্যাদি নিয়ে জোরদার কর্মসূচি আসবে নিশ্চয়। বিভিন্ন ব্যানারে বহু সংগঠন এবং আগ্রহী ব্যক্তিরা কাজ করছেন। সরকার যদি জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বা তৎপরতায় লিপ্ত হয়, তা প্রতিরোধ করা জনগণের দায়িত্ব এবং সাংবিধানিক অধিকার। 

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আনু মুহাম্মদ: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
 

আরও পড়ুন

×