ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছেলেকে গণ্ডির মধ্যে রেখে বড় করতে চাইনি, বললেন অপ্রতিমের মা

ছেলেকে গণ্ডির মধ্যে রেখে বড় করতে চাইনি, বললেন অপ্রতিমের মা
×

ছেলে অপ্রতিমের সঙ্গে খুনসুটি করছেন মা কুবির বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। ছবি: পরিবারের অ্যালবাম থেকে নেওয়া

কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৪০ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৪৪

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেছেন, ‘আমার একমাত্র সন্তান ছিল ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। তাকে প্রচলিত গণ্ডির মধ্যে রেখে বড় করতে চাইনি। আমি চেয়েছি, ছেলে নিজের মতো করে পৃথিবীকে চিনবে, নিজের কাজ নিজে করবে এবং দেশ-বিদেশ ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।’

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের সন্তান প্রতিপালনের ভাবনা তুলে ধরে নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি কখনো চাইনি, আমার বাচ্চা ফার্মের মুরগির মতো বড় হোক। একটা বাক্সের মধ্যে বড় হোক, বাইরে বের হবে, আবার বাক্সে ঢুকে যাবে—এটা আমি চাইনি।’

অপ্রতিমকে ডাক্তার বা প্রকৌশলী বানানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না জানিয়ে নাহিদা জানান, ছেলেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাতে সে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজেই করতে পারে। কোনটি সবজি, কোনটি কোন পেশা, জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানুক, এমনটাই ছিল তার প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, ‘আমি চাইছি, আমার ছেলে প্রত্যেকটা কাজে সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হবে। কোন সবজি কোনটা, কোন পেশা কোনটা—সে নিজে নিজে চিনুক। আমি চেয়েছি, আমার ছেলে সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে পৃথিবীকে চিনুক।’

অপ্রতিমকে বিভিন্ন কাজে যুক্ত রাখার কথাও জানান তার মা। ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতারের পাশাপাশি তাকে কারাতে শেখানো হয়েছে। এক বছর নাচও শিখেছিল অপ্রতিম। তার ঘরে এখনো ছেলের ব্যবহৃত হারমোনিয়াম রয়েছে বলে জানান নাহিদা।

ছেলের স্বভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, অপ্রতিম খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে আপন হয়ে যেতে পারত। বয়সের পার্থক্য দিয়ে সিনিয়র-জুনিয়রকে আলাদা করত না। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ছোটোবেলা থেকেই তাকে কোলে নিয়েছেন। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ভাইয়া বলে ডাকত অপ্রতিম।

তবে ছেলের মৃত্যুর পর নিজের সন্তান প্রতিপালনের ধরন নিয়েও আত্মসমালোচনা করেছেন নাহিদা। তিনি বলেন, ‘এটা আমার ভুল হতে পারে। আমার এই প্যারেন্টিং যদি ভুল হয়, আমি মাফ চাই।’

অভিভাবকদের প্রতি সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তার নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে, এসব বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে, অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামিদের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদা বেগম। মাইনর হিসেবে তাদের যে বয়স দেখানো হচ্ছে, সেটি প্রকৃত বয়স কি না তা যাচাইয়ের জন্য বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

নাহিদা বলেন, ‘মাইনর বলে ওদের যদি এখন সংশোধনাগারে রাখা হয়, ওরা আদতে মাইনর কি না—এটা জানতে চাই। আমাদের প্রচলিত আইনে আমরা যাদের শিশু বা মাইনর বলি, সেই বয়সটা আসলে কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়? ভোটার আইডি বা জন্মনিবন্ধন নয়, বায়োলজিক্যাল টেস্ট করা হোক। ওদের প্রকৃত বয়স কত, সেটা জানা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরকম নৃশংস চিন্তাভাবনা যারা করতে পারে, তারা আসলে মাইনর কি না—সেটাও প্রশ্ন। আমার ছেলে তো মারা গেছে। ওদের ফাঁসি হলেও আমি আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না।’

আসামিরা কয়েক বছর পর সংশোধনাগার থেকে বের হলে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন অপ্রতিমের মা। তিনি বলেন, ‘ওরা যখন পাঁচ বছর, দশ বছর পর সংশোধনাগার থেকে ফিরবে, আমি আর আমার হাজব্যান্ড কি সিকিউরড? আপনারা বলেন, আমরা সিকিউরড? যেসব ছাত্র-ছাত্রী ওর জন্য আন্দোলন করছে, তারাও কি সিকিউরড?’

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর একই ধরনের ঘটনা যাতে আর কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে না ঘটে, সেজন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান নাহিদা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে। এরপর ওরা বের হয়ে এসে আরেকটা ক্রাইম করবে এই রাস্তাগুলো যেন বন্ধ হয়ে যায়।’

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়াবাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন

×