ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিবেশ-প্রতিবেশ

উষ্ণতম বছরের পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি

উষ্ণতম বছরের পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি
×

ইন্মানুয়েল চয়ন বিশ্বাস

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জেনেভায় সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি এল নিনো ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা প্রায় শতভাগ। আর প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি– ১৯৫০ সালের পর রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, পৃথিবী এখন এক অজানা জলসীমায়। আর সেই জল ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের মেট অফিসও বলছে, ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হওয়ার আশঙ্কা প্রবল– এল নিনোর প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন আর মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সংযোগে ২০২৪ সালের রেকর্ড আরেকবার ভাঙতে পারে।

প্রশ্ন হলো, এই পূর্বাভাসের মুখে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত; যে দেশ ইতোমধ্যে গত পাঁচ-সাত বছরে তাপের ভয়াবহতম রূপ প্রত্যক্ষ করেছে? ২০২৪ সালকে বিশ্বের উষ্ণতম বছর হিসেবে নিশ্চিত করার পর জাতিসংঘ মহাসচিব নিজেই বলেছিলেন, এই দশকই ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ দশক। এখন ২০২৭ সালের সম্ভাব্য নতুন রেকর্ডের আশঙ্কা বাংলাদেশের মতো নিচু, ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশের জন্য কেবল আবহাওয়ার খবর নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রশ্ন। আর প্রশ্নটি যখন দেশের বর্তমান তুলনামূলক সংকটময় পরিস্থিতিতে, তখন প্রশ্নটি আরও কঠিনভাবেই সামনে আসছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার ক্ষতি প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার; জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। কৃষিতেও ক্ষত গভীর। ২০২১ সালে শুধু এপ্রিলেই তাপজনিত কারণে প্রায় ৭০০ বর্গকিলোমিটার জমির ফসল নষ্ট হয়েছে; ক্ষতি ২৭ মিলিয়ন ডলার। ২০৫০ সাল নাগাদ ধানের উৎপাদন ৮ শতাংশ ও গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ কমতে পারে বলে আশঙ্কা, এমন এক দেশে, যার জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ ইতোমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীন।

জার্মানওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ত্রয়োদশ; ২০০০-২০১৯ সময়ে ছিল সপ্তম, তখন ১৮৫টি চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষ। ক্ষতি প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনার সাফল্যে গত চার দশকে সেই মৃত্যুহার শতভাগ কমলেও তাপে আমরা সেই পর্যায়ের প্রস্তুতি গড়তে পারিনি। জনসংখ্যার তাপ-উন্মুক্ততায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়, যার পেছনে চারটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে: বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি, কৃষি-রিকশা-নির্মাণ-পোশাকশিল্পে বিপুল খোলা পরিবেশে শ্রমশক্তি, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণে জলাশয়-সবুজ হ্রাস, এবং নিচু-সমতল-আর্দ্র ভূপ্রকৃতি যেখানে আর্দ্রতাসহ তাপ শরীরের সহনসীমা দ্রুত ছাড়িয়ে যায়।

তুলনামূলক চিত্র আরও স্পষ্ট করে দেয় সংকটের গভীরতা। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের গবেষণা বলছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যু দ্বিগুণ, শ্রীলঙ্কায় প্রায় চার গুণ হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতে সরকারি হিসাবে ২১৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হলেও বাংলাদেশে একই বছরে মৃত্যু ছিল তার চেয়ে বেশি বলে অনুমান করে বেশ কিছু মাধ্যম। অথচ ভারতের জনসংখ্যা-আয়তন বহুগুণ বড়। মাথাপিছু ও আয়তনভিত্তিক বিচারে এই ব্যবধানই বাংলাদেশের ঝুঁকির প্রকৃত তীব্রতা বুঝিয়ে দেয়। ইউরোপের মতো উন্নত অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশে তাপ-সতর্কতা ব্যবস্থা ও শীতাতপ আশ্রয়কেন্দ্রের অবকাঠামো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।

প্রচলিত সুপারিশ– সবুজায়ন বা সচেতনতা বৃদ্ধি, জরুরি হলেও যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কৌশল। প্রথমত, তাপকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় আনুষ্ঠানিক ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে নির্দিষ্ট বাজেট ও জরুরি তহবিলের বিধান রাখা। দ্বিতীয়ত, আগামী গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় হিট ইনডেক্স চালু করে অঞ্চল নির্দিষ্ট করে ৪৮ ঘণ্টা আগে মোবাইল বার্তায় সতর্কতা পৌঁছানো, বিশেষত অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কাছে। তৃতীয়ত, খোলা পরিবেশে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য আইনি সুরক্ষা, নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ঊর্ধ্বে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, পানি বিরতি ও তাপজনিত কর্মদিবস ক্ষতির সামাজিক বীমা। চতুর্থত, নতুন ভবনে প্রতিফলক ছাদ ও সবুজ নকশা বাধ্যতামূলক করা এবং ঢাকার বাইরে সেকেন্ডারি/উপশহরেও এখনই পরিকল্পনা নেওয়া। পঞ্চমত, উপজেলা পর্যায়ে হিটস্ট্রোক প্রস্তুতি সংবলিত স্বাস্থ্য ইউনিট ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি। ষষ্ঠত, তাপ-সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ ও সৌরচালিত সেচের প্রসার, যাতে তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ ঘাটতি কৃষি ও নগরজীবন একসঙ্গে বিপর্যস্ত না করে। জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্য বিমূর্ত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং পরিচিত এক বাস্তবতার আরও তীব্র পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছে প্রস্তুতি কীভাবে জীবন বাঁচায়। তাপের ক্ষেত্রে একই দৃঢ়তা এখন সময়ের দাবি। 

ইন্মানুয়েল চয়ন বিশ্বাস: উন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন

×