অর্থনীতি
কর্মসংস্থানই ঘুরেফিরে মূল চ্যালেঞ্জ
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডিজেলসহ চারটি জ্বালানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোয় এর প্রভাব নিয়েই এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে। জনজীবনের কোথায় কী প্রভাব পড়বে, সেটা ইতোমধ্যে অনেকের কাছে স্পষ্টও বটে। অটোরিকশায় ওঠার সময় হালকা চালে বলছিলাম– ‘আপনার তো খরচ বাড়েনি।’ অটোচালক বললেন, ‘রিকশায় খরচ না বাড়লেও বাজার করতে গেলে বাড়ব!’ পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজার চড়ে যাওয়ার কথা তিনি বলছিলেন।
যেতে যেতে তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল রাজধানীতে অটোরিকশা বাড়তে থাকা নিয়ে। নির্বাচিত সরকারও কিছু করতে পারছে না এ ক্ষেত্রে। তিনি বললেন, ‘কীভাবে পারব! সরকার তো কাজ দিতে পারতাছে না।’ বললেন, ‘আমি ২৪ বছর ধইরা রিকশা চালাই। কিন্তু এমুন অনেকে আছে, যারা আগে চাকরি করত। অহন অটো চালায়।’ এ পর্যবেক্ষণও তুলে ধরলেন– ‘তারাই বেশি অ্যাক্সিডেন্ট করে।’
কর্মসংস্থানে সংকটের কথা কার না জানা! এও ঠিক, কৃষির মতো ক্ষেত্রে ‘পিক সিজনে’ শ্রমিক মেলে না। এ খাত থেকেও অনেকে নাকি অটোরিকশা চালাতে এসেছে। কাজটা কম শ্রমসাধ্য; রোজগার বেশি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজধানীতেও এদের সংখ্যা বেড়েছে। পায়ে টানা রিকশাকে তারা হটিয়ে দিয়েছে, বলা যায়।
রাজধানীসহ বড় নগরীর ফুটপাতেও বেড়েছে হকার। তাদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে কোথাও কোথাও সরকারি কর্মচারীরা আক্রান্ত হচ্ছে। উচ্ছেদের পর নতুন করে হকার বসে যাওয়ার ঘটনাও কম নেই। তাদের জন্য ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয়। আর রাস্তায় গাড়িচালকরা পেরেশান অটোরিকশা সামলাতে গিয়ে। মহাসড়কেও উঠে আসছে অটোরিকশা। এদিকে, রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজের ওপর সেদিন দেখি, দুপাশে হকার। মানুষও কেনাকাটা করছে ‘ফেস্টিভ মুড’ নিয়ে।
সংকটে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা রয়েছে আমাদের মধ্যে। দুর্ভোগ সামলে চলতেও আমরা অভ্যস্ত। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে যেমন চাহিদা কাটছাঁট করি। মাঝে এক রিকশাচালক বলছিলেন, অল্প দূরত্বে হেঁটে যেতে অভ্যস্ত হচ্ছে অনেকে। এভাবে বাঁচানো অর্থ হয়তো অন্য কাজে ব্যয় করবে। কিন্তু যাত্রী কমে গেলে তো রিকশাচালকের ক্ষতি। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন বাসের ভাড়া বাড়বে। তারপরও সিএনজি স্কুটারে চড়া অনেকে চেষ্টা করবে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে বাসে যেতে। তাতে কিছুটা খরচ বাঁচবে। শহরাঞ্চলে বাসা ভাড়ার মতোই পরিবহন ব্যয় যন্ত্রণার বিষয়। মেট্রোরেল এ ক্ষেত্রে অনেককে স্বস্তি দিয়েছে। তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও পরিবহন নিয়ে সংকটে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সময়টায় বেসরকারি খাতের বিপুল জনগোষ্ঠী টানা মূল্যস্ফীতিতে নাস্তানাবুদ– এমনটি বলাবলি করছে মানুষ। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়েছে কিনা, সেই আলোচনাও হবে। সরকার কি এটা জানে না? তারপরও তারা কেন ওই সিদ্ধান্ত নিল, সেটাও কমবেশি জানা। মানুষ বিচারবুদ্ধিহীন নয়। তবে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত, বিপন্ন মানুষ কোনো ‘ব্যাখ্যা’ শুনতে চাইছে না।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো কিছু করা হলে সঙ্গে সঙ্গে বলা উচিত, সরকার বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় কী করবে। সেই কবে থেকে প্রাইভেটকারে সিএনজির ব্যবহার চলছে। এটা বন্ধের সময় ফুরিয়ে গেছে অনেক আগে। তবু দেরিতে হলেও এটা করা প্রয়োজন। এখন তো দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এখানেই ওঠে ‘ভর্তুকি দামের পণ্য’ কে পাবে– সেই প্রশ্ন। এটা পেতে পারেন সিএনজি স্কুটারচালক। এখন যেমন বিশেষ ছাড়ে পেট্রোল-অকটেন পেতে পারেন তিনি; বাইকে যাত্রী পরিবহন করে যিনি সংসার চালান।
আরেক অটোরিকশা চালকের কথা বলি। তাঁকে বলেছিলাম, ‘আপনি তো রাস্তায় চলার ট্যাক্স দেন না!’ তিনি বলেছিলেন, ‘এই রিকশার পার্টস আনার সময় ট্যাক্স দেওয়া হইছে। আমি আপনাগো থিকা যা পাই, তা দিয়া কিছু কিনতে গেলেও ট্যাক্স দেই। সরকার আমাগো ট্যাকায় চলে।’ আশ্চর্য হয়েছিলাম তাঁর বক্তব্য শুনে। অবশ্য জানতে চাইনি, তিনি কোত্থেকে শিখেছেন এভাবে যুক্তি দিয়ে কথা বলা। জানতে চাওয়াটা অনেক সময় সীমা লঙ্ঘন হয়ে যায় কিনা, সেটা ভেবে সংকুচিত থাকি।
ন্যায্যতার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়া ইতিবাচক বটে। গণঅভ্যুত্থানের পর এটা বেড়েছে বলেই মনে হয়। নেতৃত্বে যারাই থাকুক; গণঅভ্যুত্থানে খেটে খাওয়া মানুষের বিরাট অংশগ্রহণ ছিল। তাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে চলা সামনে আরও কঠিন হবে। তাদের কাজের সুযোগ আছে, এমন সব খাতেই বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এখানে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ নেই। অন্তর্বর্তী শাসনামলে অর্থনীতিতে সংকট বাড়লেও এর সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে কম। ক্ষমতাসীন বিএনপি অবশ্য অঙ্গীকার করেছিল ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির। তার কোনো লক্ষণ নেই বলেই সরকার নৈতিক জোর পাচ্ছে না হকার কিংবা অটোরিকশাচালক নিয়ন্ত্রণের। এটাই হলো মূল কথা।
কাজের সুযোগ যেটুকু ছিল, সেটুকু থাকলেও সমাজে এত অস্থিরতার সৃষ্টি হতো না। তাই বলে কি বলা ঠিক হবে, ‘আগেই ভালো ছিলাম?’ স্বাধীনতার পরও কিছু মানুষ হতাশ হয়ে বলত, পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম! এত দিনে অবশ্য ওইভাবে বলা লোকের সংখ্যা কমেছে। কারণ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো অবস্থানে আছি আমরা। গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছরের মতো সময় অতিক্রান্ত। ইত্যবসরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলেও অবাক হওয়া যেত না। কাছাকাছি সময়ে কিছু দেশে সেটি ঘটেছে বৈ কি। বিপরীতে আমরা পেয়েছি একটি নির্বাচিত সরকার। আর কোনো ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলেও শুধু এই অর্জন ধরেই এগোনো যাবে।
সরকারের প্রথম কাজ মানুষকে নিরাপত্তা জোগানো; বিশেষত ক্ষমতাহীন মানুষকে। দ্বিতীয় কাজ, তার কাজের সুযোগ করে দেওয়া। সেই পরিবেশ না পেলে তাদের অনেকেই কিন্তু বেপরোয়া হয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে। হালে আইনশৃঙ্খলার গুরুতর অবনতিতে এই উপাদান অস্বীকার করা যাবে না। এ অবস্থায় এখনও মনোবলহীন পুলিশকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। নবগঠিত ‘এসআরবি’ সক্রিয় হোক। কিন্তু অপরাধ কমবে না, যদি সমাজে থেকে যায় কর্মহীনতার বিরাট চাপ। যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একই কথা। ব্যবসায়ও লোকে যেন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ পায়। নইলে উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। ‘দরবেশ’ তৈরি হবে। আর দরবেশরা যথারীতি ডোবাবে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এসব নির্বাচন করতেও যেন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি না ওঠে। বিরোধী দল লংমার্চ করছে, করুক। তাদের ছয় দফা দাবি ইতোমধ্যে আট দফায় গড়িয়েছে। এগুলো না মানলে নাকি ‘এক দফা’ তথা সরকার পতনের আন্দোলন! সরকার তো এসেছে পাঁচ বছরের জন্য। মূল কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারলে পরবর্তী মেয়াদেও তাদের চাইতে পারে জনগণ। এর লক্ষণ কতটা দেখা যাচ্ছে, সেটাই এখন বেশি করে আলোচনার বিষয়।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন