অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব
দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রাণঘাতী ও সংক্রামক অ্যানথ্রাক্স (তড়কা) রোগের বিস্তার যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মতে, সম্প্রতি আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া ৩৪-এ দাঁড়াইয়াছে, যাহা দেশের জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক গুরুতর সতর্কসংকেত প্রদান করে। জানা গিয়াছে, রুগ্ণ বা সংক্রমিত গবাদি পশু জবাই করা এবং উহার রক্ত, মাংস কিংবা চামড়ার সংস্পর্শে আসিবার কারণে এই প্রাদুর্ভাব ঘটিয়াছে। তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর রোগটি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাইলেও আক্রান্তের হার বৃদ্ধি প্রমাণ করিয়াছে যে মাঠপর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার শিথিলতা রহিয়াছে। অধিকতর আশঙ্কার বিষয় হইল, বস্তুত দেশের কোথাও জবাইয়ের পূর্বে গবাদি পশুর সুস্থতা যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নাই; ক্ষেত্রবিশেষে উহা থাকিলেও যথাযথ তদারকি নাই। তদুপরি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এবং নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের কথা দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনায় থাকিলেও গ্রাম তো দূরের কথা, কোনো শহরেও সেই ব্যবস্থা অদ্যাবধি অনুপস্থিত রহিয়াছে। অতএব উক্ত সংক্রামক রোগ যে সুন্দরগঞ্জেই আটকা থাকিবে, এই নিশ্চয়তা কেহ দিতে পারে না। ইতোপূর্বেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ বহুবার দেখা দিয়াছিল। সেই সকল অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করিবার ফলে এই রোগের পুনরাবৃত্তি ঘটিতেছে। উপরন্তু, খামারি বা পশু পালনকারীদের একটা অংশ আর্থিক ক্ষতির ভয়ে অসুস্থ পশু কম মূল্যে বিক্রয় কিংবা জবাই করিয়া থাকেন। এই ধরনের অনৈতিক প্রবণতা সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট হুমকি সৃষ্টি করিতেছে।
অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রাণীবাহিত একটি ব্যাধি। ইহা মূলত গবাদি পশুর মাধ্যমে মানুষের দেহে ছড়ায়। আক্রান্ত পশুর মাংস কাটা, নাড়াচাড়া করা কিংবা প্রক্রিয়াকরণের সহিত যুক্ত ব্যক্তিদের আক্রান্ত হইবার ঝুঁকি সর্বাধিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিমত, প্রাথমিক অবস্থায় উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করিলে এই রোগ নিরাময় সম্ভব; কিন্তু সংক্রমণ ছড়াইয়া পড়িলে তাহা ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাইতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। সর্বাগ্রে আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত শতভাগ গবাদি পশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনিবার জন্য পর্যাপ্ত টিকা ও জনবল নিশ্চিত করা আবশ্যক। সুন্দরগঞ্জে বর্তমানে আড়াই লক্ষাধিক গবাদি পশুর বিপরীতে টিকার সরবরাহ ও প্রয়োগের হার পর্যাপ্ত নহে। ফলে কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে আগাইতেছে না বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণ করিতে হইলে কেবল আক্রান্তের পর চিকিৎসা দানই যথেষ্ট নহে; বরং মূল উৎসে এই সংক্রমণের বিস্তার রুদ্ধ করিতে হইবে। তাহার অংশ হিসাবে মাঠপর্যায়ে অসুস্থ পশু জবাই ও কসাইখানায় রুগ্ণ পশুর মাংস বিক্রয় কঠোরভাবে বন্ধ করিতে হইবে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় কসাইখানা ও হাটে মনিটরিং সেল গঠন করা সমীচীন হইবে যেন কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত পশুর মাংস বাজারে প্রবেশ করিতে না পারে। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে, যাহাতে সমাজে এই ব্যাপারে কঠোর বার্তা পৌঁছিয়া যায়।
সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নাই। গ্রামপর্যায়ে উঠান বৈঠক, মাইকিং ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে খামারি ও সাধারণ মানুষকে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করিতে হইবে। তবে এই কথাও মনে রাখিতে হইবে যে দরিদ্র খামারিদের জন্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রম না থাকিলে কোনো উদ্যোগই সফল হইবে না। দরিদ্র খামারিদের জন্য ক্ষতিপূরণের সরকারি ব্যবস্থা থাকিলে গোপনে এই সকল পশু জবাই করিয়া বিক্রয় করিবার মনোভাব হ্রাস পাইবে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ কালবিলম্ব না করিয়া অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত অভিযান জোরদার করিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়