আইনশৃঙ্খলা
রাড্ডাও কেউ ভাঙেনি
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৬
পুলিশের গাড়ি ছিল। নাম্বারপ্লেটসহ ‘অভিদের’ সেই সাদা গাড়িও ছিল; কিন্তু পুলিশ কোনো সুলুক পাচ্ছে না। বন্ধু আলতাফ পারভেজ ঠিকই লিখেছেন– ‘কিছু অস্পষ্ট নেই, কিছু গোপন নেই আর। মিরপুরের ঘটনায় সংবাদ মাধ্যম দায়িত্ব পালন করেছে। বাকি করণীয় দেশের মানুষের।’ শেষে না কেউ বলে বসে– কেউ ভাঙেনি রাড্ডা; ওটা এমনি এমনি গোল্লায় গেছে। যেমন বলা হয়– ভারতের সিস্টার অভয়াকে বা আমাদের সাগর-রুনিকে কেউ খুন করেনি।
সত্তরের মহাপ্লাবন গোর্কি যখন ভোলা, মনপুরা, হাতিয়ার জনপদ থেকে লাখো মানুষ আর গবাদি প্রাণী ভাসিয়ে নেয়, আমরা তখন পাকিস্তান ভূখণ্ডে। পাকিস্তান সরকারের কোনো খবর ছিল না। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠন তখন ছুটছে চিড়া গুড় মুড়ি চাল আর পুরোনো কাপড় নিয়ে ভোলা মনপুরা হাতিয়া সন্দ্বীপ বরিশালে। চার্চের পাদ্রি নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার টিম সবাই শামিল সেই ত্রাণ মিছিলে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন কোনো এনজিও কাজ করত না। সেই অভূতপূর্ব অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে এ দেশে এসেছিল সেভ দ্য চিলড্রেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংস্থাটি শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে কাজ করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় অন্যান্য সেভ দ্য চিলড্রেন। সেভ দ্য চিলড্রেনকে সুইডিশ ভাষায় বলে রাড্ডা বারনেন। উচ্চারণ মোটামুটি ‘রেদ্দা বার্নেন’।
সেই সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেন ১৯৭৪ সালে মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এটা শুধু সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষকে সেবা দিত না। এর সেবার মান সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল। মোট কথা, কেন্দ্রটি ছিল সব শিশুর। মিরপুরের অনেক পরিবার আছে যাদের তিন পুরুষ জীবনের প্রথম টিকা নিয়েছেন এই কেন্দ্র থেকেই। গত ৫০ বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দক্ষতার সাক্ষী অন্য এক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি গত সপ্তাহেই রাড্ডা অফিসে একটা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সভা ও মতবিনিময় করে এলাম। ওদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যতিক্রমী, সাফল্য ঈর্ষণীয়; কর্মীদের উদ্দীপনা ও কর্মস্পৃহা সাড়া জাগানো..!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘দেশের সরকার যেখানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না, সেখানে রাড্ডার মতো একটি প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে প্রান্তিক জনগণের বিশেষত মা, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে আসছে।’
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার বর্তমানে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত।
মিরপুরের এই সেন্টারে বৃহস্পতিবার যে হামলা হয়েছে, তাকে তার প্রকৃত নামেই অভিহিত করতে হবে: এটি ছিল নৈতিক অধঃপতনের চরম নিম্নস্তরে নেমে যাওয়া এক জঘন্য কর্মকাণ্ড। ভঙ্গুর আইনি কাঠামো, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধানে বিমুখতা, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও ধ্বংসপ্রায় মানবিক মূল্যবোধ এক শ্রেণির মানুষ বা গোষ্ঠীকে অপরিণামদর্শী, ধ্বংসাত্মক ও অপরাজেয় করে তুলছে।
রাতের আঁধারে দুই শতাধিক ‘মুখোশধারী’ লোক হাতুড়ি, লাঠি ও ভারী খননযন্ত্র নিয়ে সেখানে হামলা চালায়। লুটপাটের সঙ্গে তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যে কেন্দ্রটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল, সেখানেই এমন লুটপাট প্রমাণ করে– এটি শুধু একটি বেআইনি জমি দখলের ঘটনা নয়; এটি ছিল বর্বর ও কাপুরুষোচিত আগ্রাসন, যা আমাদের সবার জন্য গভীর জাতীয় লজ্জার কারণ।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে মধ্যরাতে হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার সাহস পেয়েছে– এ ঘটনা এ ধরনের অপরাধীরা কতটা দায়মুক্তি বা আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ ভোগ করছে, তার ভয়াবহ মাত্রা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেও উপহাসে পরিণত করেছে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ও শূন্য-সহনশীলতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো অজুহাত, আমলাতান্ত্রিক গড়িমসি কিংবা রাজনৈতিক দোষারোপ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
মুখোশ পরে হাতুড়ি হাতে হামলা চালানো ব্যক্তিদের কাছ থেকে শুরু করে স্থানীয় সংগঠনের আড়ালে জমি দখলের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
দ্রুততার সঙ্গে দায়ীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হলে তা রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার বার্তা দেবে এবং ভবিষ্যতে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করবে।
আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা করি, তারা কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করবে– এ ধরনের বর্বরতায় যারা জড়িত, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং তারা কঠোর আইনি বিচারের মুখোমুখি হবে। এর চেয়ে কম কিছু হলে তা হবে বিশ্বাসভঙ্গ।
পুনশ্চ: রাড্ডা প্রাঙ্গণে আজ (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে গিয়ে যেটা দেখলাম, সেটাও কাম্য নয়। একটি রাজনৈতিক দল সেখানে মারমুখী মিছিল করছে। ভয় হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি না জানি কোনো রাজনৈতিক ক্রসফায়ারের বলি হয়! খোলা জায়গায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা শিশুদের সেবা দিচ্ছে। এই পরিবেশটা নষ্ট করবেন না। মুরোদ থাকলে যারা অপকর্মটি করেছে তাদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করুন।
গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, শিশু অধিকারকর্মী
wahragawher@gmail.com
- বিষয় :
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
- গওহার নঈম ওয়ারা