ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ঢাকার সৌন্দর্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থান

ঢাকার সৌন্দর্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থান
×

বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা

মোছা. নূরজাহান খাতুন

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৩৮

একটি দেশের সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার নির্দেশক সে দেশের পর্যটনশিল্প। বিশ্বের বহু দেশে জিডিপির একটি বড় অংশ আসে পর্যটনশিল্প থেকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ হার ১২ শতাংশ, নেপালে ১৬, শ্রীলঙ্কায় ১২, পাকিস্তানে ১১, ভুটানের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৪, অস্ট্রেলিয়ায় ৩০.২, আমেরিকায় ২৭ এবং বাংলাদেশে ৭ শতাংশ। আমাদের দেশের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও প্রতিবেশী দেশগুলোর থেকেও লক্ষণীয়ভাবে কম।
বিশ্বের প্রধান প্রধান শহর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। নদীর তীরে শহর গড়ে উঠছে কারণ নদীগুলো মানুষের বেঁচে থাকা, যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহজ সুযোগ তৈরি করে। বিশ্বের বিভিন্ন শহর যেমন– প্যারিস সিন নদীর তীরে, লন্ডন টেমস নদীর তীরে, রোম টাইবার নদীর তীরে, জার্মানির বার্লিন স্প্রি নদীর তীরে, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা দানিউব নদীর তীরে, মস্কো মস্কভা নদীর তীরে, কলকাতা হুগলি নদীর তীরে, টোকিও সুমিদা নদীর তীরে, নিউইয়র্ক হাডসন নদীর তীরে, ওয়াশিংটন ডিসি পোটোম্যাক নদীর তীরে, কায়রো নীল নদের তীরে, ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। বুড়িগঙ্গা ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো নদী এভাবে দূষিত হয়নি। আমাদের দেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে বুড়িগঙ্গা নদী দূষিত করা হয়েছে। অথচ এই বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে ঢাকার পর্যটনশিল্প আকর্ষণীয় করা সম্ভব।
ঢাকার চারপাশে রয়েছে চারটি নদনদী– বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু এবং সঙ্গে ছিল অর্ধশতাধিক খাল। এসব নদী ও খাল মিলে ঢাকা ছিল অপূর্ণা। অনেক খাল আজ নেই। যেগুলো আছে সেগুলোও ময়লা আবর্জনার ভাগাড় এবং নদীগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। দখল-দূষণে অন্তিম দশা নদীর। মাঝেমধ্যে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়, কিছুদিনের মধ্যে আবার সেগুলো দখল হয়ে যায়। নদী ভরাটে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা। নদীগুলোতে চার শতাধিক পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত পড়ছে কঠিন বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য।

বুড়িগঙ্গা ঢাকা শহরের লাইফলাইন বা প্রধান ধমনি। ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের নৌ যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু এই নদী। প্রতিদিন হাজার হাজার টন পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা হয়, যা দেশের অর্থনীতি সচল রাখে। নদী বাঁচালে পরিবহন খরচ ও সময় দুই-ই কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অপরিশোধিত বর্জ্য এবং ট্যানারির কারণে পানি ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে, যা ঢাকার সামগ্রিক জীবনমানকে নিচু স্তরে নামিয়েছে– যা বিশ্বের অন্য কোনো রাজধানীতে পরিলক্ষিত হয় না। ঢাকার আশপাশে নদী ও জীবন নিয়ে সম্ভাব্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার:
নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ কর্মক্রম এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান: প্রথমে শহরের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদ দখল ও দূষণমুক্ত করতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে যুক্ত করে নদীর ময়লা পরিষ্কার ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা দরকার। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখলমুক্ত এবং নান্দনিক বিনোদন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। নদীর জীবন নিয়ে ডকুমেন্টারি বা গবেষণা; নদীপারের জেলে, মাঝি বা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী বা ছোট কোনো ডকুমেন্টারি বানানোর পরিকল্পনা করতে হবে। শিক্ষা সফর, নদীভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম এবং ভ্রমণের সময় স্থানীয় মাঝিদের নৌকা ভাড়া করে তাদের জীবন-জীবিকায় সরাসরি সহায়তা করতে হবে।

দূষণের উৎসমুখ বন্ধ করা এবং কার্যকর ইটিপি নিশ্চিত করা: ট্যানারি ও টেক্সটাইল কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। আইন অমান্যকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানা আদায় বাধ্যতামূলক করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার সব সুয়ারেজ লাইন যেন নদীতে না পড়ে, তার জন্য প্রতিটি এলাকায় ছোট-বড় সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি করতে হবে।

নাব্য বৃদ্ধি ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত ড্রেজিং: বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের তলদেশে জমে থাকা পলিখণ্ড ও বিষাক্ত পলির স্তর অপসারণে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঢাকার ভেতরের প্রায় দুই শতাধিক সংযোগ খাল ও জলাশয় উদ্ধার করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে।

পরিবেশবান্ধব নৌ ভ্রমণ এবং শীতলক্ষ্যা ও জামদানি পল্লি পরিদর্শন: ৩০০ ফিট রাস্তা দিয়ে কাঞ্চন ব্রিজ ঘাটে গিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা করা যায়। পাশাপাশি রূপগঞ্জের বিখ্যাত জামদানি তাঁতিশিল্প পরিদর্শন ও নদীতীরের মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখার দারুণ সুযোগ রয়েছে।

তুরাগ ও আশুলিয়া: ঢাকার খুব কাছে নিরিবিলি পরিবেশের জন্য তুরাগ নদ আদর্শ। এখানে ট্রলার বা ছোট ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে সারাদিনের জন্য ঘুরে আসা যায়। এ ছাড়া তুরাগ তীরবর্তী বিভিন্ন রিসোর্টেও সময় কাটানো যায়। বুড়িগঙ্গা ও সদরঘাটে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আবহ পেতে সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গায় নৌকায় ভ্রমণের পর্যাপ্ত সুযোগ রাখতে হবে, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভ্রমণে আগ্রহী হবে। আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লার ভ্রমণের সঙ্গে মিলিয়ে নদীপথে একটি দুর্দান্ত দিন কাটানোর পরিকল্পনা করতে হবে।

ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ: বিশেষ কোনো উৎসব বা ছুটির দিনে স্থানীয়দের দ্বারা তুরাগ বা শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে।

নদী দখলমুক্ত ও সীমানা নির্ধারণ স্থায়ী, সীমানা পিলার ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ: নদী রক্ষা কমিশনের মাধ্যমে নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করে স্থায়ী পিলার স্থাপন করতে হবে। দখল ঠেকাতে নদীর দুই পারে হাঁটার পথ ও সবুজ বেষ্টনী তৈরি করতে হবে।

জনসচেতনতা ও সমাজভিত্তিক মনিটরিং: স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে প্রতিটি নদীর জন্য ‘নদী পাহারাদার’ কমিটি গঠন করতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে সভা-সেমিনার ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও নৌ যোগাযোগের সম্প্রসারণ: রাজধানীর যানজট নিরসনে সড়কপথের পাশাপাশি বৃত্তাকার নৌপথ চালু করতে হবে। নদীর পার ঘিরে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলে স্থানীয় জেলে ও মাঝি সম্প্রদায়কে ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ওয়াটার বাস বা নৌযান চালুর মাধ্যমে যাতায়াত সহজ করাসহ নদীর পারে নান্দনিক বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দর্শনার্থীদের জন্য দৃষ্টিনন্দন বসার জায়গা, ছাঁটা বা ছাউনি এবং রাতের নিরাপত্তার জন্য সৌরবিদ্যুৎ চালিত পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে নদীর তীরে সুসজ্জিত ঘাট, ভাসমান রেস্তোরাঁ ও ফুড কোর্ট স্থাপন করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান অনুযায়ী শহরের জলাধার ও নদীতীরবর্তী অঞ্চল সংরক্ষণের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ঢাকার সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে যেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে–
পর্যটন খাতের বিকাশ: ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক স্থান, পার্ক ও নান্দনিক এলাকাগুলো সুন্দর হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় বাড়বে। এতে গাইড, হোটেল, মোটেল ও পর্যটনভিত্তিক ব্যবসায় কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
খাদ্য ও আতিথেয়তা শিল্প: সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে নতুন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও ফুড কোর্ট গড়ে উঠবে। এসব প্রতিষ্ঠানে রাঁধুনি, ওয়েটার ও ব্যবস্থাপক পদে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ইভেন্ট ও বিনোদন: লেকপাড়, চত্বর বা ফাঁকা জায়গাগুলো সাজানো হলে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও মেলা আয়োজন সহজ হবে। এর ফলে শিল্পী, কারিগর ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কর্মীদের কর্মসংস্থান হবে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও উদ্যান পালন: গাছপালা লাগাতে, ফুলের টব সাজাতে এবং পার্ক পরিষ্কার রাখতে মালি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রয়োজন হবে। এতে দিনমজুর ও পেশাদার কর্মীরা নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাবেন।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প: দর্শনার্থীদের আকর্ষণের জন্য হস্তশিল্প, সুভেনির ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দোকান বাড়াতে হবে। এতে স্থানীয় কারিগর ও বিক্রেতারা লাভবান হবেন। ঢাকা পরিচ্ছন্ন হলে পরিচ্ছন্ন ঢাকার ব্র্যান্ডিং হবে এবং বিদেশি পর্যটক আসবে– যা দেশের সুনাম বাড়িয়ে দেবে।

মোছা. নূরজাহান খাতুন: অতিরিক্ত সচিব (অব.)

আরও পড়ুন

×